অক্টোবর ১০, ২০২৬, ১১:৫৮ এএম
যুগ যুগ ধরে হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের অটুট সম্প্রীতির অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে একই উঠোনে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে রয়েছে একটি মন্দির ও একটি মসজিদ। উত্তরাঞ্চলের জেলা লালমনিরহাট শহরের প্রাণকেন্দ্র কালীবাড়ী এলাকায় পৃথক দুটি ধর্মের এই পবিত্র উপাসনালয়ের অবস্থান মাত্র ছয় ফুটের ব্যবধানে।
এক পাশে উলুধ্বনি বাজে, অন্য পাশে চলে মহান আল্লাহর জিকির।
এক উঠোনে অবস্থিত এই দুই ঐতিহাসিক প্রতিষ্ঠানের একটি হলো কেন্দ্রীয় কালীবাড়ী শ্রীশ্রী দুর্গা ও কালীমন্দির এবং অপরটি পুরান বাজার জামে মসজিদ। একই সময়ে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা মন্দিরে পূজার্চনা করেন এবং মুসলিম মুসল্লিরা মসজিদে জামাতে নামাজ আদায় করেন। তবে নামাজের সময় শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মন্দিরের ঢাকঢোল ও যাবতীয় বাদ্যযন্ত্র সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়। এক পাশে বাতাসে ভাসে ধূপকাঠির সুবাস, অন্য পাশে আতরের সুঘ্রাণ। কোনো ধরনের বিবাদ বা অপ্রীতিকর ঘটনা ছাড়াই প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলছে এই ধর্মচর্চা।
স্থানীয় বাসিন্দা এবং মসজিদ ও মন্দির কমিটির সূত্রে জানা গেছে, পুরান বাজারে ১৮৩৬ সালে প্রথম কালীমন্দিরটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ওই মন্দির প্রতিষ্ঠার পরই এলাকাটির নাম হয়ে যায় কালীবাড়ী। পরবর্তী সময়ে ১৯১৫ সালের দিকে স্থানীয় মুসলিমরা নামাজ আদায়ের সুবিধার জন্য মন্দিরের পাশে একই আঙিনায় একটি ওয়াক্তিয়া মসজিদ নির্মাণ করেন। কালক্রমে সেটি জুমার মসজিদে রূপ নেয় এবং পুরান বাজার জামে মসজিদ হিসেবে পরিচিতি পায়। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর কালীমন্দিরের পাশেই স্থাপন করা হয় দুর্গামন্দির।
এই অভূতপূর্ব দৃশ্য দেখতে প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে সাধারণ মানুষ ছুটে আসেন। এমনকি কয়েকটি বন্ধুভাবাপন্ন বিদেশি রাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূতও ঐতিহাসিক এই চত্বর পরিদর্শন করেছেন।
পুরান ঢাকা থেকে এই সম্প্রীতি দেখতে আসা দর্শনার্থী আরিফ সাবেরী, মনোয়ার হোসেন ও কমল চন্দ্র রায় জানান, একই আঙিনায় মসজিদ ও মন্দিরের কথা শুনে তারা সরাসরি দেখতে এসেছেন। দীর্ঘ কয়েক যুগ ধরে পাশাপাশি অবস্থানের পরও কোনো বিরোধ তৈরি না হওয়াকে তারা বাংলাদেশের ইতিহাসে এক বিরল ঘটনা হিসেবে উল্লেখ করেন।
স্থানীয়দের তথ্য মতে, আজানের সূচনা থেকে শুরু করে নামাজের জামাত শেষ হওয়া পর্যন্ত মন্দিরে সব ধরনের শব্দযন্ত্র বন্ধ থাকে। নামাজ শেষ হলে পূজার কার্যক্রম আবার স্বাভাবিক নিয়মে চলে। নামাজ শেষে মসজিদ থেকে বের হতেই মুসল্লিদের চোখে পড়ে প্রতিমা, তেমনি মন্দিরে দাঁড়িয়ে পূজারিরাও নামাজ আদায়ের দৃশ্য দেখতে পান।
পূজারি দিলীপ চন্দ্র রায় বলেন, "লালমনিরহাটে ধর্মীয় সম্প্রীতির এটি একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। কোনো বিশৃঙ্খলা ছাড়াই যুগ যুগ ধরে এই সম্প্রীতির বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে ধর্মীয় উৎসব পালন করছি আমরা। সত্যি এটি আমাদের জন্য অনেক বড় গর্বের বিষয়।"
কালীবাড়ী এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা আমিরুল হায়াত মুকুল জানান, ১৮৩৬ সালে মন্দির প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এক উঠোনে দুই উপাসনালয় চলছে শান্তিতে। কালীবাড়ী মসজিদ কমিটির সাধারণ সম্পাদক খোরশেদ আলম দুলাল বলেন, "হিন্দু সম্প্রদায়ের লোকজনকে মন্দিরে নির্বিঘ্নে ধর্মচর্চা করতে আমরা সব সময়ই সহযোগিতা দিয়ে থাকি। একই আঙিনায় মন্দির-মসজিদ শুধু লালমনিরহাটের জন্য ধর্মীয় সম্প্রীতির উদাহরণ নয়, এটি সমগ্র বাংলাদেশের মানুষের জন্য ধর্মীয় সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।"
কমিটির তথ্য বলছে, মন্দির ও মসজিদ একই সীমানায় থাকলেও আঙিনাটির মালিকানা অন্য এক ব্যক্তির। পুরো আঙিনার জমির পরিমাণ ১২ শতক, যার মধ্যে মন্দির রয়েছে ৮ শতক এবং মসজিদ রয়েছে ৫ শতক জায়গার ওপর।
পুরান বাজার জামে মসজিদের ইমাম আলাউদ্দিন আল আজাদ জানান, এখানে মসজিদের আগে মন্দিরটি স্থাপিত হয়েছিল। তবুও জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে মানুষ এখানে স্বাধীনভাবে ঘুরে দেখেন এবং পরস্পরের কাজে আন্তরিক সহযোগিতা করেন।
এদিকে চলতি বছর লালমনিরহাট জেলায় মোট ৪৭৬টি পূজামণ্ডপে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা উদযাপিত হতে যাচ্ছে। আগামী ১৬ অক্টোবর মহাষষ্ঠীর মধ্য দিয়ে দেবীর আরাধনা শুরু হয়ে ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মাধ্যমে সমাপ্তি ঘটবে পাঁচ দিনব্যাপী এই উৎসবের।
জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি হীরালাল রায় জানিয়েছেন, পূজামণ্ডপের উন্নয়ন ও সার্বিক ব্যবস্থাপনায় জেলা প্রশাসনের ত্রাণ তহবিল থেকে প্রতিটি মণ্ডপে ৬০০ কেজি করে চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ফলে জেলার ৪৭৬টি মণ্ডপের জন্য মোট ২ লাখ ৮৫ হাজার ৬০০ কেজি চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
উপজেলাওয়ারী হিসাবে জেলা সদরে ১৬২টি, আদিতমারীতে ১১৭টি, কালীগঞ্জে ৯৩টি, হাতীবান্ধায় ৭৩টি এবং পাটগ্রামে ৩১টি পূজামণ্ডপ প্রস্তুত করা হচ্ছে।
জেলা সদরের শ্রী গৌরিশংকর গোশালা সোসাইটি দুর্গামন্দির, কালীবাড়ী সর্বজনীন দুর্গামন্দির, কাচারীবাড়ি সর্বজনীন দুর্গামন্দির, আদিতমারীর মহিষখোঁচা ইউনিয়নের কামারপাড়া দুর্গামন্দির, কালীগঞ্জের তুষভাণ্ডার রাজবাড়ী সর্বজনীন শ্রীশ্রী দুর্গামন্দির, হাতীবান্ধা কেন্দ্রীয় শ্রীশ্রী রাধাগোবিন্দ মন্দির ও সর্বজনীন দুর্গামণ্ডপ এবং পাটগ্রামের শ্রীশ্রী পাটেশ্বরী কেন্দ্রীয় দুর্গামন্দিরে চলছে সাজসজ্জার শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি।
বড়বাড়ী বাজার শিবকালী ও দুর্গামন্দিরের সভাপতি নিমাই চন্দ্র পাল জানান, প্রশাসনের সহায়তায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশে পূজার প্রস্তুতি এগোচ্ছে। হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান কল্যাণ ফ্রন্টের সভাপতি বাবু গুরুচরণ রায়ও উৎসবমুখর পরিবেশে উৎসব সম্পন্ন হওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
পুলিশ সুপার মো. আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, মণ্ডপগুলোতে সার্বক্ষণিক নজরদারি থাকবে এবং পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিতে কাজ করবে। জেলা প্রশাসক মুহা. রাশেদুল হক প্রধান নিশ্চিত করেন, আসন্ন শারদীয় দুর্গোৎসব সুষ্ঠু ও উৎসবমুখর করতে পুরো জেলায় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা কার্যকর করা হয়েছে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন