রবিবার, ০৪ অক্টোবর, ২০২৬,
শারদীয় দুর্গোৎসব

দিনাজপুরে দুর্গাপূজায় ১ হাজার ৩০৬ মণ্ডপে চলছে জোর প্রস্তুতি

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

অক্টোবর ৪, ২০২৬, ১০:৩৭ এএম

দিনাজপুরে দুর্গাপূজায় ১ হাজার ৩০৬ মণ্ডপে চলছে জোর প্রস্তুতি

ছবি: দিনাজপুর টিভি আর্কাইভ

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে দিনাজপুরের মন্দির ও মণ্ডপগুলোতে প্রতিমা তৈরির কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন কারিগররা। কাদামাটি, খড়, বাঁশ, সুতলি ও রং-তুলির নিপুণ আঁচড়ে পূর্ণাঙ্গ রূপ পেতে শুরু করেছে দেবী দুর্গাসহ অন্যান্য প্রতিমা। জেলায় এবার মোট এক হাজার ৩০৬টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে।

পঞ্জিকা অনুযায়ী আগামী ১০ অক্টোবর মহালয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হবে দেবী বন্দনার আনুষ্ঠানিকতা এবং ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীতে প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে উৎসবের সমাপ্তি ঘটবে। জেলার বিভিন্ন মন্দির ও কারখানা ঘুরে দেখা যায়, কোথাও বাঁশ ও খড় দিয়ে কাঠামো তৈরির কাজ চলছে, আবার কোথাও চলছে একাধিক স্তরে মাটির প্রলেপ দেওয়ার কাজ। অনেক মণ্ডপে মাটি শুকিয়ে যাওয়ার পর চলছে রং ও প্রতিমা সাজানোর চূড়ান্ত ধাপের কাজ।

নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সব কাজ শেষ করতে কারিগররা ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত বিরতিহীন শ্রম দিয়ে যাচ্ছেন। প্রতিমা তৈরির স্বাভাবিক নিয়মে প্রথমে বাঁশ ও খড় দিয়ে মূল কাঠামো দাঁড় করানো হয়। এরপর কয়েক দফায় এঁটেল মাটির নিখুঁত প্রলেপ দিয়ে প্রতিমার স্পষ্ট আকৃতি দেওয়া হয়। মাটি সম্পূর্ণ শুকিয়ে এলে শুরু হয় ফিনিশিং ও রঙের কাজ। প্রধান দুর্গাপ্রতিমার পাশাপাশি তৈরি করা হচ্ছে লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ, অসুর, সিংহ, মহিষ, পেঁচা, হাঁস ও সর্পের প্রতিকৃতি।

তবে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির কারণে এবার লাভ কমে যাওয়ার কথা জানাচ্ছেন কারিগররা। প্রতিমা তৈরির কারিগর জগন্নাথ জানান, এবার তিনি ১২টি মণ্ডপের প্রতিমা গড়ার কাজ নিয়েছেন। এর মধ্যে ১০টির নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে এবং বাকি দুটির কাজ চলমান রয়েছে। তিনি উল্লেখ করেন, বাজারে কাঁচামাল ও প্রয়োজনীয় সব উপকরণের দাম বেড়ে গেলেও পূজা উদযাপন কমিটিগুলো সেই অনুপাতে বাজেট বৃদ্ধি করেনি। ফলে প্রয়োজনীয় উপকরণ কিনে দিনরাত কাজ করেও প্রত্যাশিত লাভ থাকছে না।

তিনি আরও জানান, একটি পূর্ণাঙ্গ প্রতিমা তৈরি করতে প্রায় দুই মাস বা তারও বেশি সময় ব্যয় হয়। মণ্ডপের আয়তন, নকশার জটিলতা ও আয়োজকদের চাহিদার ওপর ভিত্তি করে এই সময় কম বা বেশি হয়ে থাকে। একই পরিস্থিতির কথা তুলে ধরে আরেক কারিগর সবুজ চন্দ্র সেন জানান, নিত্যপ্রয়োজনীয় প্রতিটি পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় প্রতিমা তৈরির সামগ্রিক খরচ অনেক বেড়ে গেছে। কিন্তু সেই তুলনায় মজুরির হার বাড়েনি, যার ফলে হাড়ভাঙা পরিশ্রমের পরও লাভের দেখা মিলছে না।

কারিগর নরেশ পাল অবশ্য এটিকে কেবল জীবিকা হিসেবে দেখতে নারাজ। তিনি বলেন, প্রতিমা তৈরি তাদের কাছে নিছক পেশা নয়, বরং এটি তাদের শিল্প ও পারিবারিক ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। মাটি দিয়ে তিলে তিলে প্রতিমার অবয়ব ফুটিয়ে তোলা অত্যন্ত শ্রমসাধ্য বিষয় হলেও কাজ শেষে দর্শনার্থী ও ভক্তদের মুখের নির্মল আনন্দ তাদের সব ক্লান্তি দূর করে দেয়।

দিনাজপুর জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, জেলার ১৩টি উপজেলায় এক হাজার ৩০৬টি মণ্ডপে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এর মধ্যে সদর উপজেলায় ১৭০টি, বীরগঞ্জে ১৬৬টি, কাহারোলে ১০০টি, বিরলে ৯৮টি, বোচাগঞ্জে ৮৩টি, চিরিরবন্দরে ১৫৮টি, খানসামায় ১৪৪টি, ফুলবাড়ীতে ৬২টি, পার্বতীপুরে ১৫১টি, বিরামপুরে ৪৩টি, নবাবগঞ্জে ৭৩টি, হাকিমপুরে ২২টি এবং ঘোড়াঘাটে ৩৬টি মণ্ডপ প্রস্তুত করা হচ্ছে।

শারদীয় দুর্গোৎসব শান্তিপূর্ণ ও সুশৃঙ্খল পরিবেশে আয়োজনের লক্ষ্যে গত ২৪ সেপ্টেম্বর দিনাজপুর জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এক সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত ওই প্রস্তুতিমূলক সভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক মো. রফিকুল ইসলাম। জেলা পূজা উদযাপন পরিষদের সভাপতি স্বরূপ বকসী বাচ্চু জানান, উৎসব নির্বিঘ্ন করতে জেলা প্রশাসন ও জেলা পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনা হয়েছে। জেলার প্রতিটি মণ্ডপে শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে লিখিত নির্দেশনা পাঠানো হয়েছে এবং সার্বক্ষণিক তদারকির জন্য প্রতিটি মণ্ডপেই স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক দল গঠন করা হয়েছে।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষার প্রস্তুতি সম্পর্কে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আনোয়ার হোসেন জানান, দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে যেকোনো ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি প্রতিরোধে প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয় গড়ে তোলা হচ্ছে। সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পূজা উদযাপন কমিটিসহ সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সঙ্গে সমন্বয় রেখে যাবতীয় প্রস্তুতি চূড়ান্ত করা হয়েছে। শাস্ত্রীয় বিধান অনুযায়ী এবার দেবী দুর্গার মর্ত্যে আগমন ঘটবে ঘোটকে এবং তিনি স্বর্গালোকে প্রস্থান করবেন নৌকায়। আসন্ন এই শারদীয় মহোৎসব ঘিরে সমগ্র জেলাজুড়ে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের মাঝে সৃষ্টি হয়েছে আনন্দঘন আবহ ও ধর্মীয় উদ্দীপনা।