অক্টোবর ২০, ২০২৬, ১১:৩১ এএম
দিনাজপুরে মন্দির ও মসজিদ পাশাপাশি দাঁড়িয়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে চলেছে। জেলার মন্ডলপাড়া গ্রামের একটি সীমানা প্রাচীরের এপাশে ভক্তদের আরাধনায় মুখরিত থাকে প্রাচীন মন্দির, আর ঠিক ওপাশেই জামাতে আদায় হয় নিয়মিত নামাজ।
স্থানীয়দের বিবরণ অনুযায়ী, মন্ডলপাড়ার সার্বজনীন বিষ্ণু মন্দিরটির ইতিহাস প্রায় তিনশত বছরের পুরনো। দীর্ঘকাল ধরেই সনাতন ধর্মাবলম্বী নারীরা প্রতিদিন সকালে মন্দিরে পূজা-অর্চনা করতে আসেন। ঠিক একই চত্বরের লাগোয়া অংশে ২০১১ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় দামাই ক্ষেত্র জামে মসজিদ, যেখানে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করতে সমবেত হন ধর্মপ্রাণ মুসলিম মুসল্লিরা।
মন্দিরের ঠিক পেছনেই বাড়ি স্থানীয় বাসিন্দা সালমান আহমেদের। শৈশব থেকেই এই পরিবেশ দেখে বড় হয়েছেন তিনি।
সালমান আহমেদ জানান, সকালবেলা আশপাশের সনাতন ধর্মাবলম্বী নারীরা মন্দিরে পূজা দিতে আসেন এবং পুরুষ মুসল্লিরা মসজিদে নামাজ আদায় করেন। বাইরে থেকে আসা মানুষের কাছে এই দৃশ্য ভিন্ন কিংবা ব্যতিক্রমী মনে হলেও স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে এটি একেবারেই প্রাত্যহিক ও স্বাভাবিক একটি জীবনচিত্র।
মন্দিরের নিয়মিত সেবা ও আরাধনায় যুক্ত সুভদ্রা রানী ও পূর্ণিমা রানী জানান, তাদের শাশুড়ির শাশুড়ির আমল থেকেই এই মন্দিরে পূজা-অর্চনা চলে আসছে।
তারা সকালে এসে মন্দির চত্বর পরিষ্কার করেন, ঠাকুরের চরণে এবং তুলসী তলায় জল দেন। আবার সন্ধ্যায় এসে প্রদীপ প্রজ্বলন, শঙ্খধ্বনি ও উলুধ্বনির মাধ্যমে সান্ধ্যকালীন প্রার্থনা সম্পন্ন করেন। এই পাড়ায় বিশ থেকে পঁচিশটি সনাতন ধর্মাবলম্বী পরিবার বসবাস করছে।
উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ পরস্পরের ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি শ্রদ্ধাশীল।
সুভদ্রা রানী বলেন, যখন মসজিদে আজান ও নামাজের সময় হয়, তখন তারা নিজেরাই শ্রদ্ধাবশত মন্দিরের বাইরে চলাফেরা সীমিত রাখেন এবং নামাজে যেন কোনো ব্যাঘাত না ঘটে সেদিকে খেয়াল রাখেন। আবার সনাতন ধর্মাবলম্বীদের পূজা বা উৎসবের সময় মুসলিম প্রতিবেশীরাও একইভাবে সহযোগিতা করেন এবং আনন্দ ভাগাভাগি করে নেন।
মসজিদের খতিব ও ইমাম জানান, কর্মস্থলে যোগ দেওয়ার শুরুতে একই প্রাচীরের দুই পাশে মন্দির ও মসজিদ দেখে তিনি কিছুটা অবাক হয়েছিলেন। তবে ইসলাম ধর্মে ফিতনা-ফ্যাসাদ সৃষ্টি কঠোরভাবে নিষিদ্ধ এবং ভিন্ন ধর্মাবলম্বী প্রতিবেশীদের সঙ্গে উত্তম আচরণ ও সদাচরণের সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে।
তিনি জানান, বিগত ছয় মাস ধরে দায়িত্ব পালনকালে তিনি দেখেছেন স্থানীয় সব সম্প্রদায়ের মানুষ তাকে নিজের সন্তানের মতো স্নেহ ও ভালোবাসায় গ্রহণ করেছেন।
মন্দির ও মসজিদের মাঝে একটি ইটের দেয়াল থাকলেও এই দুই ধর্মাবলম্বী মানুষের দৈনন্দিন সহাবস্থান ও পারস্পরিক সৌহার্দ্য কোনো সীমানা প্রাচীর দিয়ে আটকে রাখা যায়নি।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন