অক্টোবর ২০, ২০২৬, ১০:৩০ এএম
শুকনা গরুর মাংস উত্তরবঙ্গের এক হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যবাহী খাবার। ঘরে ঘরে রেফ্রিজারেটর আসার আগে গ্রামাঞ্চলে কোরবানির মাংস দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করতে রোদে শুকিয়ে রাখার চল ছিল। সেই স্বাদ এখন আর সচরাচর মেলে না। উত্তরবঙ্গের সেই বহুল কাঙ্ক্ষিত স্বাদ ফিরিয়ে আনতে ব্যতিক্রমী উদ্যোগ নিয়েছেন তিন তরুণ উদ্যোক্তা।
রংপুর ও লালমনিরহাট জেলার সংযোগস্থল গঙ্গাচড়া উপজেলার মহিপুর তিস্তা সেতু সংলগ্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে মহিপুর হাঁসের বাড়ি নামের একটি রেস্তোরাঁ।
চাকরির পেছনে না ছুটে তিন বন্ধু মিলে এই খাদ্য উদ্যোগ গড়ে তুলেছেন।
রেস্তোরাঁর অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা জানান, চাকরি খোঁজার চেয়ে অন্যকে কর্মসংস্থান তৈরি করে দেওয়া অনেক বেশি আত্মমর্যাদার। সেই ভাবনা এবং পরিবারের তৈরি ঐতিহ্যবাহী মাংসের স্বাদের স্মৃতি থেকেই এই রেস্তোরাঁ শুরু করেন তারা।
এখানে গরুর মাংস বিশেষ প্রক্রিয়ায় প্রস্তুত করা হয়। মাংস কেটে প্রথমে হলুদ ও বিশেষ মসলা দিয়ে ভালোভাবে সিদ্ধ করা হয়। এরপর টানা প্রায় সাত দিন ছাদে রোদে শুকানো হয়।
রোদে শুকানোর ফলে মাংসের পানি সম্পূর্ণ শুকিয়ে যায় এবং ওজন মারাত্মকভাবে কমে আসে। উদ্যোক্তারা জানান, প্রায় ২৫ কেজি তাজা মাংস প্রক্রিয়াজাত করে রোদে শুকানোর পর তা নেমে আসে মাত্র আট থেকে নয় কেজিতে, যা সর্বোচ্চ দশ কেজি পর্যন্ত দাঁড়ায়। প্রতি কেজিতে সাধারণত ২৫ থেকে ২৬ টুকরো তাজা মাংস শুকিয়ে অনেক ছোট আকৃতি ধারণ করে।
রেস্তোরাঁয় এক বাটি শুকনা গরুর মাংস বিক্রি হয় ২৫০ টাকায়।
শুকনা মাংসের পাশাপাশি রেস্তোরাঁটির প্রধান আকর্ষণ দেশি হাঁসের মাংস। আশপাশের নদী ও প্রত্যন্ত বিল অঞ্চল থেকে দেশি হাঁস সংগ্রহ করার দায়িত্ব পালন করেন উদ্যোক্তা দলেরই একজন। শুরুতে দিনে চার থেকে পাঁচটি হাঁস রান্না হলেও বর্তমানে প্রতিদিন গড়ে ২৫ থেকে ৩৫টি হাঁস বিক্রি হচ্ছে।
১৫ থেকে ২০ বছরের অভিজ্ঞ বাবুর্চির তত্ত্বাবধানে এখানে হাঁস রান্না করা হয়।
একসঙ্গে ১৭টি হাঁসের মাংস রান্নার ক্ষেত্রে প্রায় আড়াই কেজি দেশি পেঁয়াজ ব্যবহার করা হয়। তেল ও বিভিন্ন বাটামসলা দিয়ে কষিয়ে কোনো প্রকার বাড়তি পানি ছাড়াই প্রায় ৪০ থেকে ৪৫ মিনিট ধরে রান্না সম্পন্ন হয়।
রান্নায় চিনা বাদাম, কাজু বাদাম ও পোস্তদানার বিশেষ মিশ্রণ ব্যবহার করা হয়। নামানোর আগে বাড়তি সুবাসের জন্য যুক্ত করা হয় সামান্য ঘি এবং ভাজা জিরা ও গোলমরিচের গুঁড়া।
রেস্তোরাঁয় ফুল বাটি হাঁসের মাংসে সাত টুকরো থাকে, যার মূল্য ২৫০ টাকা। চার থেকে পাঁচ টুকরোর হাফ বাটির দাম ১৫০ টাকা।
পাশের নদী থেকে আসা স্থানীয় বৈরালি মাছের আলু দিয়ে রান্না তরকারি বিক্রি হয় ১২০ টাকায়।
এ ছাড়া বিশেষ বাদাম ভর্তা প্রতি বাটি ২০ টাকা এবং লাউ-আলুর সবজি ২০ টাকায় পরিবেশন করা হয়। দশ টাকায় পাওয়া যায় যত ইচ্ছা তত খাওয়ার সুবিধাসহ বুটের ডাল। খাবারের সঙ্গে পেঁয়াজের বিশেষ সালাদ বিনামূল্যে সরবরাহ করা হয়।
তিস্তা নদীর সৌন্দর্য দেখতে আসা পর্যটক ও দূরদূরান্তের ভোজনরসিকদের উপস্থিতিতে প্রতিদিন মুখর থাকে এই গ্রামীণ খাদ্যকেন্দ্র।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন