রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,
জীবনসঙ্গিনীর মেলা

দিনাজপুরে ‍‍`ঐতিহাসিক আদিবাসী মিলন মেলা

শাহিন ইসলাম

অক্টোবর ৩, ২০২৫, ০৫:২৭ পিএম

দিনাজপুরে ‍‍`ঐতিহাসিক আদিবাসী মিলন মেলা

দিনাজপুর টিভি

একবার ভাবুন তো, প্রেম নেই, ঘটক নয়, সম্পূর্ণ উন্মুক্ত পরিবেশে পছন্দের জীবনসঙ্গী খোঁজা—আজ সেই নজিরবিহীন ঘটনাটি দেখল উত্তরবঙ্গের দিনাজপুরে। যে মেলা একসময় 'বিয়ের মেলা' নামে ভাইরাল হয়েছিল, আজ শুক্রবার দুপুর ২টা ৩০ মিনিট থেকে শুরু হয়ে সন্ধ্যা ৬টায় শেষ হলো সেই 'ঐতিহাসিক আদিবাসী মিলন মেলা'। এই জনসমাগম কেন এত বিতর্কের জন্ম দিচ্ছে? আর এই মঞ্চে বিএনপি'র প্রধান নেতৃত্ব ও স্থানীয় আদিবাসী নেতারা ভিন্ন ভিন্ন বার্তা নিয়ে যে বক্তব্য রেখেছেন, তার রাজনৈতিক তাৎপর্য কী? আদিবাসী সংস্কৃতির এই বিশেষ আয়োজন কীভাবে সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন হলো—বিস্তারিত থাকছে আজকের বিশেষ প্রতিবেদনে।

বাংলাদেশের সামাজিক ইতিহাসে নজিরবিহীন বিতর্ক ও আগ্রহের জন্ম দেওয়া ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী আদিবাসীদের ঐতিহ্যবাহী বা বিবর্তিত সামাজিক চর্চার প্রতিচ্ছবি 'ঐতিহাসিক আদিবাসী মিলন মেলা' আজ শুক্রবার, ৩ অক্টোবর, ২০২৫ তারিখে দিনাজপুরে সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে। মেলার পূর্বের বিতর্ক এড়াতে আয়োজক কমিটি কৌশলগতভাবে নাম পরিবর্তন করলেও, এর মূল লক্ষ্য ছিল আদিবাসী সম্প্রদায়ের যুবক-যুবতীদের জন্য স্বাধীন জীবনসঙ্গী নির্বাচনের সুযোগ তৈরি করা। আজ দুপুর ২টা ৩০ মিনিট থেকে শুরু হয়ে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত এই মিলন মেলা অনুষ্ঠিত হয়। এই মেলা প্রমাণ করেছে যে, আদিবাসী সম্প্রদায়ের নিজস্ব প্রথাগত বিবাহ পদ্ধতির প্রতি আগ্রহ থাকলেও, বৃহত্তর সমাজের সমালোচনা এড়াতে তারা একটি কৌশলগত পদক্ষেপ নিয়েছেন। এই মেলা একদিকে যেমন আদিবাসী সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি, তেমনই এটি বৃহত্তর সমাজের সঙ্গে তাদের সাংস্কৃতিক সংঘাত ও সমঝোতার একটি দলিল। আদিবাসী সমাজের এই বিশেষ প্রথাগত বিবাহ পদ্ধতির কারণে, এই মেলাটি বৃহত্তর বাঙালি সমাজে উন্মুক্ত বিবাহ প্রথার এক বিরল উদাহরণ হিসেবে আলোচিত হচ্ছে। এই মেলা মূলত সেই সমস্ত মানুষের জন্য একটি স্বতঃস্ফূর্ত প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করে, যারা সনাতন রীতিনীতি এড়িয়ে গিয়ে সরাসরি তাদের পছন্দের মানুষকে খুঁজে নিতে আগ্রহী।

দিনের এই সফল জনসমাগম চলাকালীন সময়ে মঞ্চ থেকে আসা রাজনৈতিক ও সামাজিক বার্তা বিশেষভাবে গুরুত্ব বহন করে। মেলার মঞ্চে বাংলাদেশের প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি'র নেতৃত্ব হিসেবে উপস্থিত হয়ে বক্তব্য রেখেছেন দিনাজপুর জেলা বিএনপি'র সহ-সভাপতি, উপজেলা সভাপতি এবং কেন্দ্রীয় কৃষক দল নেতা মনজুরুল ইসলাম। এছাড়াও, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি হিসেবে ১০ নং মোহনপুর ইউনিয়ন চেয়ারম্যান শাহীন চৌধুরী এবং মরিচা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আনিসুর রহমানও মেলায় বক্তব্য রাখেন। এই রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের পাশাপাশি স্থানীয় আদিবাসী নেতারাও বক্তব্য দেন। আদিবাসী নেতারা তাদের বক্তব্যে ঐক্যবদ্ধ হয়ে দেশের সরকারকে সহযোগিতা করার মাধ্যমে একটি সুন্দর দেশ গঠনে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান। একই মঞ্চে বিএনপি'র মতো প্রধান রাজনৈতিক দলের নেতৃত্ব এবং স্থানীয় আদিবাসী নেতাদের পক্ষ থেকে সরকার-সহযোগিতার বার্তা—এই দুটি বিপরীতমুখী বক্তব্য মেলাটিকে কেবল সামাজিক নয়, বরং স্থানীয় রাজনীতির প্রেক্ষাপটেও একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে পরিণত করেছে। দুপুর আড়াইটা থেকে শুরু হয়ে সন্ধ্যা ছয়টায় সমাপ্ত হওয়া এই মিলন মেলাটি সম্পূর্ণ শান্তিপূর্ণ ছিল। বিপুল জনসমাগম সত্ত্বেও, স্থানীয় প্রশাসন, পুলিশ, আনসার বাহিনী এবং গ্রাম পুলিশ—এই সম্মিলিত নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে মেলায় কোনো প্রকার বিশৃঙ্খলা, গোপনীয়তা লঙ্ঘন বা হাতাহাতির মতো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি। এটি প্রমাণ করেছে যে, যথাযথ নিরাপত্তা ব্যবস্থার মাধ্যমে সামাজিক সংবেদনশীল জনসমাগমও সফলভাবে পরিচালনা করা সম্ভব। এই মেলা কেবল জীবনসঙ্গী খোঁজার একটি প্ল্যাটফর্ম নয়, বরং এটি সেই লক্ষ লক্ষ আদিবাসী যুবক-যুবতীর নীরব আকাঙ্ক্ষার প্রতিধ্বনি, যারা প্রথাগত সামাজিক চাপ থেকে মুক্তি চান। দিনাজপুরের এই মেলাটি সফলভাবে সম্পন্ন হওয়ার মধ্য দিয়ে আদিবাসী সংস্কৃতি এবং দেশের বিবাহ পদ্ধতির ইতিহাসে একটি ব্যতিক্রমী অধ্যায় রচিত হলো।