সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬, ১১:২৪ এএম
দেশের কর ও মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) অনুপাত বর্তমানের ৬ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে ২০৩৫ সালের মধ্যে ১৫ শতাংশে উন্নীত করার লক্ষ্যে বিস্তৃত সংস্কার ও সক্ষমতা বৃদ্ধির মহাপরিকল্পনা নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়নে করের আওতা বৃদ্ধি, কর পরিপালন জোরদারকরণ, স্বয়ংক্রিয় ডিজিটাল ব্যবস্থা শক্তিশালী করা এবং আয়কর, মূল্যসংযোজন কর (ভ্যাট) ও শুল্ক প্রশাসনকে একক ব্যবস্থাপনায় এনে `ওয়ান এনবিআর` কাঠামো গড়ে তোলার উদ্যোগ শুরু হয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, আয়কর, ভ্যাট ও কাস্টমস বিভাগ আলাদা প্রশাসনিক কাঠামোর পরিবর্তে সমন্বিতভাবে করদাতা ব্যবস্থাপনার কাজ পরিচালনা করবে। এর ফলে করদাতার বিস্তারিত তথ্যভান্ডার, সমন্বিত ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, কর পরিশোধ ও বকেয়া রাজস্ব সংক্রান্ত উপাত্ত একটি সার্বিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে সংযুক্ত হবে। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত অর্থ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির দ্বিতীয় বৈঠকে এনবিআরের সংস্কার ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধির এই সামগ্রিক রূপরেখা উপস্থাপন করা হয়।
উপস্থাপনায় সরকারি ব্যয়ের ক্রমাগত বৃদ্ধির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে রাজস্ব আহরণের সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বৈঠকে সরকারি আর্থিক চাহিদা মেটাতে এনবিআরের বিদ্যমান সক্ষমতা, কর-জিডিপি অনুপাতের ঘাটতি হ্রাসের কৌশল, সংস্থার সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাস ও প্রয়োজনীয় সংস্কার প্রস্তাব বিশদভাবে তুলে ধরা হয়। এনবিআর স্পষ্ট করেছে যে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা পূরণ ও কর-জিডিপি অনুপাত টেকসই করতে কেবল বিদ্যমান করের হার বাড়ালে কাঙ্ক্ষিত ফল আসবে না। এর জন্য করজালের বিস্তৃতি ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করা, উন্নত প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং করদাতাদের কর পরিপালন নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
এনবিআরের রূপরেখা অনুযায়ী, স্বল্পমেয়াদে দেশের কর-জিডিপি অনুপাত ৮ দশমিক ৮ শতাংশ এবং মধ্যমেয়াদে ১০ শতাংশে উন্নীত করার প্রাথমিক লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। চূড়ান্ত ধাপে ২০৩৫ সালের মধ্যে এই অনুপাতকে ১৫ শতাংশে নিয়ে যাওয়ার সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হবে। রাজস্ব প্রশাসনে আধুনিক বিনিয়োগ, পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি, প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন তথ্য বিনিময় সক্ষমতা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা জোরদার এবং করদাতা সেবার মানোন্নয়নকে অভ্যন্তরীণ রাজস্ব আয়ের মূল চালিকাশক্তি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশ সরকারের মোট রাজস্ব আয়ের প্রায় ৮৬ শতাংশ একাই জোগান দেয় এনবিআর।
রাজস্ব আহরণের প্রাতিষ্ঠানিক ও পরিচালন সক্ষমতা বৃদ্ধির কার্যক্রম অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন এনবিআরের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা। অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বৃদ্ধি এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার ভারসাম্য রক্ষার স্বার্থে এই সংস্কার এখন গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারে পরিণত হয়েছে।
এনবিআরের ঐতিহাসিক উপাত্ত পর্যালোচনায় দেখা গেছে, গত ২৫ বছর ধরে দেশের কর-জিডিপি অনুপাত মূলত ৭ থেকে ৮ শতাংশের বৃত্তেই সীমাবদ্ধ ছিল। ২০১১-১২ থেকে ২০১৪-১৫ অর্থবছরের মধ্যে তা সাময়িকভাবে বেড়ে প্রায় ১০ শতাংশে পৌঁছালেও পরবর্তীকালে তা আবার নিম্নমুখী ধারায় ফেরে। সর্বশেষ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এ অনুপাত ছিল ৬ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৮ শতাংশে। দক্ষিণ এশিয়া ও প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের কর-জিডিপি অনুপাত এখনো তলানিতে রয়েছে। এই বৈশ্বিক বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘমেয়াদে ২০৩৫ সালের মধ্যে অনুপাত ১৫ শতাংশে পৌঁছানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে রাজস্ব প্রশাসন।
সংসদীয় স্থায়ী কমিটির উপস্থাপনায় গত ২৫ বছরের জিডিপির আকার, সরকারের বার্ষিক বাজেট, পরিচালন ও বার্ষিক উন্নয়ন ব্যয়, এনবিআরের রাজস্ব আয় ও বার্ষিক প্রবৃদ্ধি, সার্বিক সরকারি ঋণ এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর কর-জিডিপি কাঠামোর তুলনামূলক তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। প্রাপ্ত উপাত্তে দেখা যায়, আলোচিত ২৫ বছরে সরকারি ব্যয় ৪ দশমিক ৪৭ গুণ বাড়লেও এনবিআরের রাজস্ব সংগ্রহ বেড়েছে মাত্র ৩ দশমিক ৪০ গুণ। ব্যয় বৃদ্ধির সঙ্গে রাজস্ব আহরণের গতি সংগতিপূর্ণ না হওয়ায় উৎপাদনশীলতা বহুগুণ বাড়ানোর ওপর জোর দিচ্ছে সংস্থাটি।
২০০১-০২ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত রাজস্ব আয়ের গড় প্রবৃদ্ধির হার ছিল ১৩ দশমিক ৪৩ শতাংশ। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের রাজস্ব লক্ষ্য পূরণ করতে হলে সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রকৃত আয়ের তুলনায় রাজস্ব প্রবৃদ্ধির হার উল্লেখযোগ্য পরিমাণে বাড়াতে হবে। কাঠামোগত আধুনিকায়নের অংশ হিসেবে এনবিআর তাৎক্ষণিকভাবে করদাতা সেবা সম্প্রসারণ, সুশাসন নিশ্চিতকরণ, নীতি প্রণয়নের দক্ষতা বৃদ্ধি, তথ্য ব্যবস্থাপনা, তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো এবং মানবসম্পদ উন্নয়নে জোর দিয়েছে।
প্রস্তাবিত কর্মপরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে আইনি কাঠামো ও পরিবর্তনকালীন ব্যবস্থাপনা পর্যালোচনা, সমন্বিত এন্টারপ্রাইজ আর্কিটেকচার প্রণয়ন, প্রতিটি নিবন্ধিত করদাতার জন্য একক মাস্টার ডেটাবেজ এবং কেন্দ্রীয় ডেটা ডিকশনারি ও সিস্টেম ইনভেন্টরি প্রস্তুত করা। একই সঙ্গে একটি স্বাধীন রাজস্ব নীতি সচিবালয় গঠন, কর-ব্যয় বা ছাড়ের আনুষ্ঠানিক রেজিস্টার তৈরি এবং যেকোনো করনীতির আর্থিক প্রভাব মূল্যায়নে বাধ্যতামূলক আদর্শ টেমপ্লেট চালুর প্রস্তাব রাখা হয়েছে।
প্রথম তিন বছরের প্রাথমিক বাস্তবায়ন ধাপে একটি সমন্বিত করদাতা অ্যাকাউন্ট, স্বয়ংক্রিয় গ্রাহক ও মামলা ব্যবস্থাপনা প্ল্যাটফর্ম, তৃতীয় পক্ষের বিভিন্ন আর্থিক তথ্যের সাথে করদাতার নথি মিলিয়ে দেখা, সব ধরনের করের পরিপালন ঝুঁকি শনাক্তের অভিন্ন ব্যবস্থা এবং কর পরিশোধ ও বকেয়া রাজস্বের ডিজিটাল তথ্যভান্ডার পুরোপুরি চালু করা হবে।
কাস্টমস বা শুল্ক বিভাগের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সীমান্তের বিশেষায়িত নজরদারি ও কার্যক্রম অক্ষুণ্ণ রাখা হবে। তবে আমদানি ও রপ্তানিকারকদের শনাক্তকরণ নথির সঙ্গে পণ্যের শুল্ক মূল্যায়ন, ভ্যাট এবং আয়কর ঝুঁকি সংক্রান্ত তথ্য কেন্দ্রীয়ভাবে সমন্বয় করবে এনবিআর। পরবর্তী তিন থেকে পাঁচ বছরের মধ্যে প্রায় তাৎক্ষণিকভাবে কর পরিপালন বিশ্লেষণের সক্ষমতা অর্জন, আইনি বৈধতা সাপেক্ষে আগে থেকে পূরণ করা স্বয়ংক্রিয় আয়কর রিটার্নের পরিধি বৃদ্ধি, কম ঝুঁকিপূর্ণ করদাতাদের জন্য অনলাইনে স্বয়ংক্রিয় রিফান্ড প্রদান এবং বিভিন্ন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেনের নেটওয়ার্ক ও কর ফাঁকি শনাক্তে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন উন্নত বিশ্লেষণ ব্যবস্থা চালুর সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।
রাজস্ব নীতিকে অভ্যন্তরীণ শিল্পায়ন ও বৈশ্বিক রপ্তানি সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রধান হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের কথাও জানিয়েছে এনবিআর। এর আওতায় উৎপাদনমুখী কাঁচামাল ও মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানিতে শুল্ক সুবিধা প্রদান, কৃষি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্য এবং তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ভ্যাট অব্যাহতি, বিভিন্ন সম্ভাবনাময় খাতে হ্রাসকৃত আয়কর হার ও কর অবকাশ সুবিধা প্রদান, কাস্টমস ব্যবস্থার পূর্ণ স্বয়ংক্রিয়করণ এবং দ্রুততম সময়ে সিঙ্গেল-উইন্ডো সেবা কার্যকরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
রাজস্ব নীতিতে বর্তমানে সুবিধা পাচ্ছে এমন প্রধান খাতগুলোর মধ্যে রয়েছে দেশের কৃষি, তৈরি পোশাক, রেফ্রিজারেটর ও এয়ার কন্ডিশনার উৎপাদন, তথ্যপ্রযুক্তি, অটোমোবাইল ও পরিবেশবান্ধব বৈদ্যুতিক যানবাহন, মোবাইল ফোন সংযোজন, কুটির, মাইক্রো, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই), দেশের পুঁজিবাজার, চিকিৎসাসেবা ও শিক্ষা খাত, ওষুধ শিল্প এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন শিল্প।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন