বৃহস্পতিবার, ০৮ অক্টোবর, ২০২৬,

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের কঠিন শর্তের ঋণ অনুমোদন

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

অক্টোবর ৭, ২০২৬, ১০:৫৫ পিএম

বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের কঠিন শর্তের ঋণ অনুমোদন

দেশের বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং আন্তর্জাতিক বাজার থেকে জ্বালানি তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি অব্যাহত রাখতে মোট ৩ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলারের অনমনীয় বা কঠিন শর্তের বৈদেশিক ঋণ প্রস্তাব অনুমোদন করেছে সরকার। বুধবার (৭ অক্টোবর) সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত স্ট্যান্ডিং কমিটি অন নন-কনসেশনাল লোন (এসসিএনসিএল) কমিটির বিশেষ সভায় এসব ঋণ প্রস্তাবের নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়।

অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ (ইআরডি) সূত্রে জানা গেছে, অনুমোদিত মোট অর্থের মধ্যে বিদ্যুৎ খাতের একটি নতুন অবকাঠামোগত প্রকল্পের জন্য ২০০ মিলিয়ন ডলার এবং জ্বালানি তেল ও এলএনজি আমদানির জরুরি ব্যয় মেটাতে ভূতাপেক্ষ হিসেবে ৩ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

বিদ্যুৎ বিভাগের অধীনে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (বিআরইবি) বাস্তবায়নাধীন ‘পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন নেটওয়ার্ক এনহান্সমেন্ট প্রজেক্ট’-এর জন্য এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) থেকে ২০০ মিলিয়ন ডলার ঋণ গ্রহণের প্রস্তাব অনুমোদন করেছে কমিটি।

ইআরডির কার্যপত্র অনুযায়ী, এ ঋণের সুদের হার সিকিউর্ড ওভারনাইট ফাইন্যান্সিং রেটের (এসওএফআর) সঙ্গে শূন্য দশমিক ৫০ শতাংশ স্প্রেড যুক্ত করে নির্ধারণ করা হয়েছে।

ঋণের পরিশোধের মেয়াদকাল ধরা হয়েছে ২৫ বছর, যার মধ্যে পাঁচ বছর থাকবে গ্রেস পিরিয়ড।

এছাড়া এই চুক্তিতে শূন্য দশমিক ১০ শতাংশ ম্যাচিউরিটি প্রিমিয়াম এবং শূন্য দশমিক ১৫ শতাংশ কমিটমেন্ট চার্জ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

খসড়া ঋণ চুক্তির আর্থিক শর্তাদি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এ ঋণের গ্রান্ট এলিমেন্ট দাঁড়িয়েছে মাত্র ৫ দশমিক ৭০ শতাংশ। অর্থনৈতিক মানদণ্ডে অনুদান উপাদান ২৫ শতাংশের নিচে নেমে আসায় আন্তর্জাতিকভাবে এটি কঠিন শর্তের বা অনমনীয় ঋণ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

এই ঋণের অর্থ ব্যয় করে ঢাকা শহরের আশপাশের ১৩টি পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি (পিবিএস) আওতাভুক্ত এলাকায় বিদ্যুৎ সঞ্চালন ও সরবরাহ ব্যবস্থার স্থিতিশীলতা বাড়ানো হবে।

একই সঙ্গে পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির ব্যবহার ও জলবায়ু সহনশীল অবকাঠামো নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

প্রকল্পটির বাস্তবায়ন সময়কাল ধরা হয়েছে ২০২৬ সালের অক্টোবর থেকে ২০৩১ সালের জুলাই পর্যন্ত।

পরিকল্পনার আওতায় নতুন ও বিদ্যমান বৈদ্যুতিক উপকেন্দ্র সম্প্রসারণ, মাটির নিচে আন্ডারগ্রাউন্ড ক্যাবল ও মাথার ওপরে ওভারহেড লাইন নির্মাণ, ইনসুলেটেড কন্ডাক্টর স্থাপন এবং দ্রুত ত্রুটি শনাক্তে ডিজিটাল মনিটরিং ও ফল্ট লোকেটর প্রযুক্তি যুক্ত করা হবে।

এর ফলে বিদ্যুৎ বিতরণে বিদ্যমান কারিগরি লোকসান বা সিস্টেম লস উল্লেখযোগ্য হারে কমার পাশাপাশি সার্বিক সেবার মান উন্নত হবে।

অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরে সংকট এড়াতে জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিতের লক্ষ্যে সৌদি আরবের জেদ্দাভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ট্রেড ফাইন্যান্স করপোরেশন (আইটিএফসি) থেকে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য ৩ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারের স্বল্পমেয়াদি কঠিন শর্তের ঋণের ভূতাপেক্ষ অনুমোদন দিয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়ের কমিটি।

এই বরাদ্দের সিংহভাগ অর্থাৎ ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করবে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) আন্তর্জাতিক বাজার থেকে পরিশোধিত ও অপরিশোধিত জ্বালানি তেল ক্রয়ে।

বাকি ৬০০ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করবে বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজসম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) আন্তর্জাতিক স্পট মার্কেট ও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তি থেকে তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানিতে।

ছয় মাস মেয়াদি এই জরুরি বাণিজ্যিক ঋণের সুদের হার নির্ধারণ করা হয়েছে ছয় মাসের টার্ম এসওএফআরের সাথে ১ দশমিক ৭০ শতাংশ অতিরিক্ত যোগ করে।

অনুমোদিত ৩ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারের ঋণ সুবিধার মধ্যে আইটিএফসি নিজস্ব তহবিল থেকে সংস্থান করবে ৬০০ মিলিয়ন ডলার।

বাকি ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের জোগান নিশ্চিত করা হবে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও প্রাতিষ্ঠানিক কো-ফাইন্যান্সিং প্রক্রিয়ার মাধ্যমে।

জাতীয় অর্থনীতিকে গতিশীল রাখতে জরুরি ভিত্তিতে নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ শৃঙ্খল কার্যকর রাখতেই এই ঋণ নেওয়া হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সরকারি নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

তবে অনমনীয় বা চড়া সুদের বৈদেশিক ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে সরকারের নিজস্ব কিছু আইনি ও অর্থনৈতিক সীমা বহাল রাখার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

ইআরডির নীতিমালায় বলা হয়েছে, যেকোনো অর্থবছরে বৈদেশিক অনমনীয় ঋণের বার্ষিক দায় পরিশোধের মোট ব্যয় ওই অর্থবছরের জাতীয় রপ্তানি আয়ের ১০ শতাংশ কিংবা মোট রাজস্ব আয়ের ১৫ শতাংশের সীমা অতিক্রম করতে পারবে না।

একই সাথে দেশের সার্বিক বৈদেশিক ঋণের সামগ্রিক স্থিতি মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১০ শতাংশের মধ্যে সীমিত রাখার শর্ত রয়েছে।

বিদ্যমান সামষ্টিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি, ঋণগ্রহীতা সংস্থাগুলোর নিজস্ব আয় থেকে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা এবং জাতীয় বিদ্যুৎ-জ্বালানি খাতের অপরিহার্য অগ্রাধিকার মূল্যায়ন করেই এই বিশাল অঙ্কের ঋণ প্রস্তাবে চূড়ান্ত সম্মতি দিয়েছে সরকার।