বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

কোন হৃদরোগে মৃত্যুর ঝুঁকি বেশি

স্বাস্থ্য ডেস্ক

সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২৬, ০৬:৪৬ পিএম

কোন হৃদরোগে মৃত্যুর ঝুঁকি বেশি

ছবি: Ai

বাংলাদেশে অসংক্রামক ব্যাধিগুলোর মধ্যে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি মানুষের মৃত্যু ঘটছে হৃদরোগে, যার মধ্যে এককভাবে শীর্ষে রয়েছে ইসকেমিক হার্ট ডিজিজ। অনেকেই হৃদরোগ বলতে কেবল হার্ট অ্যাটাক মনে করলেও চিকিৎসাবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে এটি আসলে রোগের একটি মারাত্মক পরিণতি, যার পেছনে রক্তনালির ব্লক থেকে শুরু করে হৃৎপিণ্ডের গঠনগত জটিলতাসহ বহুমুখী কারণ দায়ী থাকে।

ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল অ্যান্ড রিসার্চ ইনস্টিটিউটের রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক সোহেল রেজা চৌধুরী জানান, বাংলাদেশে মৃত্যুর এক নম্বর কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে ইসকেমিক হার্ট ডিজিজ। এর মধ্যে হার্ট অ্যাটাকের মতো তীব্র জরুরি পরিস্থিতি যেমন অন্তর্ভুক্ত, তেমনি ধমনি ধীরে ধীরে সরু হয়ে রক্তপ্রবাহ কমে যাওয়ার মতো দীর্ঘমেয়াদি জটিলতাও রয়েছে। হৃদযন্ত্রের মাংসপেশিতে পর্যাপ্ত পরিমাণে রক্ত ও অক্সিজেন পৌঁছাতে না পারার অবস্থাকে চিকিৎসাবিজ্ঞানে ইসকেমিয়া বলা হয়। 

হৃৎপিণ্ডের পেশিতে রক্ত ও অক্সিজেন সরবরাহকারী করোনারি ধমনির ভেতরের প্রাচীরে চর্বি ও কোলেস্টেরল জমে আস্তরণ বা প্লাক তৈরি হলে রক্ত চলাচলের পথ ক্রমান্বয়ে সরু হয়ে যায়। অনেক সময় এই রক্তনালির ভেতরের প্লাক হঠাৎ ফেটে বা ছুটে গিয়ে প্রধান ধমনি সম্পূর্ণ বন্ধ করে দিলে সংশ্লিষ্ট অংশের পেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে নিশ্চিত হার্ট অ্যাটাক ঘটে। হৃদরোগের বড় একটি অংশ নিঃশব্দে রক্তনালির পথ রুদ্ধ করে।

ইসকেমিক সমস্যা ছাড়াও হৃৎপিণ্ডের আরও বেশ কিছু জটিল রোগ মানবদেহে মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করে। এর মধ্যে অন্যতম হলো হার্ট ফেইলিওর, যা হৃৎপিণ্ড পুরোপুরি অচল হয়ে যাওয়া বোঝায় না, বরং শরীরের স্বাভাবিক চাহিদা অনুযায়ী রক্ত পাম্প করার ক্ষমতা কমে যাওয়াকে নির্দেশ করে। দীর্ঘদিনের অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপ, করোনারি আর্টারি ডিজিজ কিংবা পূর্বে ঘটে যাওয়া হার্ট অ্যাটাকের কারণে এই জটিলতা তৈরি হতে পারে। এর ফলে রোগী হাঁটাচলা বা সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় তীব্র শ্বাসকষ্টে ভোগেন, পা বা গোড়ালি ফুলে যায় এবং সামান্য কায়িক পরিশ্রমেই অস্বাভাবিক ক্লান্তি অনুভব করেন। ফলে এই ধরনের শ্বাসকষ্ট বা ক্লান্তিকে কেবল বার্ধক্যজনিত স্বাভাবিক উপসর্গ ভেবে এড়িয়ে যাওয়া ঝুঁকিপূর্ণ।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ জটিলতা হলো অ্যারিদমিয়া বা অনিয়মিত হৃদস্পন্দন। হৃদযন্ত্র স্বাভাবিক ছন্দে স্পন্দিত না হয়ে হঠাৎ অতিরিক্ত দ্রুত, খুব ধীর কিংবা এলোমেলো স্পন্দিত হলে এবং ঘন ঘন বুক ধড়ফড়, মাথা ঘোরা বা জ্ঞান হারানোর মতো লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। এছাড়া হৃৎপিণ্ডের ভেতরে রক্তকে একমুখী প্রবাহিত রাখার চারটি কপাটিকা ক্ষতিগ্রস্ত হলে ভালভুলার হার্ট ডিজিজ হয়, যার ফলে রক্ত বিপরীত দিকে উল্টো প্রবাহিত হতে পারে এবং হৃদযন্ত্রকে অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হয়। অন্যদিকে শিশুদের ক্ষেত্রে জন্মের সময় থেকেই হার্টের ভেতরে অস্বাভাবিক ছিদ্র বা রক্ত চলাচলের নালিতে গঠনগত সমস্যা থাকলে তাকে কনজেনিটাল হার্ট ডিজিজ বা জন্মগত হৃদরোগ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, যার কিছু ক্ষেত্রে প্রাথমিক পর্যায়ে হালকা হলেও গুরুতর ক্ষেত্রে শৈশবেই অস্ত্রোপচারের প্রয়োজন দেখা দেয়।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ২০২১ সালের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি এক লাখ মানুষের মধ্যে প্রায় ৫৯ জনের মৃত্যুর কারণ ছিল ইসকেমিক হার্ট ডিজিজ এবং প্রায় ৮০ জনের মৃত্যুর কারণ স্ট্রোক। চিকিৎসকদের মতে, উচ্চ রক্তচাপ, ধূমপান বা তামাক সেবন, রক্তে অতিরিক্ত কোলেস্টেরল, ডায়াবেটিস, অতিরিক্ত ওজন, শারীরিক কায়িক শ্রমের তীব্র ঘাটতি এবং খাদ্যে মাত্রাতিরিক্ত লবণ গ্রহণের মতো অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপনী অভ্যাসই মূলত এই প্রাণঘাতী হৃদরোগের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।