মার্চ ২৮, ২০২৬, ০৩:৩০ পিএম
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক পদক্ষেপের জবাবে পারস্য উপসাগরের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী কার্যত অবরোধ করেছে ইরান। বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান এই জলপথটি বন্ধ করে দেওয়ার ফলে বিশ্বজুড়ে ভয়াবহ জ্বালানি সংকট তৈরি হয়েছে। এরই মধ্যে ইরান তাদের জলসীমা দিয়ে চলাচলকারী বাণিজ্যিক জাহাজ ও ট্যাঙ্কার থেকে টোল বা যাতায়াত ফি আদায়ের জন্য একটি আইনি কাঠামো তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে।
গত ২৬ মার্চ দেশটির রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে জানানো হয়েছে যে ইরানি পার্লামেন্টের সিভিল অ্যাফেয়ার্স কমিটি এই সংক্রান্ত একটি খসড়া আইন প্রস্তুত করেছে যা শিগগিরই চূড়ান্ত অনুমোদনের জন্য পেশ করা হবে।
পার্লামেন্টের কর্মকর্তাদের দাবি অনুযায়ী হরমুজ প্রণালী দিয়ে চলাচলকারী জাহাজগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার খরচ মেটাতেই এই শুল্ক আরোপ করা হচ্ছে। ইরানের মতে এটি একটি আন্তর্জাতিক করিডর এবং সেখানে নিরাপত্তা সেবার বিনিময়ে ফি আদায় করা একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।
তবে আন্তর্জাতিক জাহাজ নজরদারি সংস্থা লয়েডস লিস্টের তথ্য অনুযায়ী পার্লামেন্টে আইন পাস হওয়ার আগেই গত দুই সপ্তাহ ধরে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস বা আইআরজিসি অনানুষ্ঠানিকভাবে একটি টোল বুথ ব্যবস্থা চালু করেছে। বর্তমানে এই প্রণালীর দুই পাশে প্রায় দুই হাজার পণ্যবাহী জাহাজ ও তেলের ট্যাঙ্কার আটকা পড়ে আছে বলে জানা গেছে।পরিসংখ্যান অনুযায়ী বিশ্বের মোট তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রায় ২০ শতাংশ এই সরু জলপথটি দিয়ে পরিবহন করা হয়।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে সংঘাত শুরু হওয়ার পর আইআরজিসি এই পথে মার্কিন ও ইসরায়েলি মালিকানাধীন বা তাদের সাথে সংশ্লিষ্ট জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেয়। এর প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেল প্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে গেছে যা যুদ্ধের আগের তুলনায় প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি। বিশেষ করে এশীয় দেশগুলোতে জ্বালানি সরবরাহে টান পড়েছে এবং শিল্প উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। ইরান তাদের ওপর আরোপিত যুদ্ধ পরিস্থিতি ও অর্থনৈতিক চাপের মোকাবিলায় এই ফি আদায়ের কৌশল নিয়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বর্তমানে চালু থাকা অনানুষ্ঠানিক পদ্ধতিতে আইআরজিসি অনুমোদিত রুট ব্যবহারের জন্য জাহাজ প্রতি ২০ লাখ ডলার পর্যন্ত ফি নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। জাহাজ মালিকদের প্রথমে আইআরজিসি সংশ্লিষ্ট মধ্যস্থতাকারীদের কাছে জাহাজের নথি, আইএমও নম্বর, মালামালের বিবরণ এবং ক্রুদের তথ্য জমা দিয়ে অনুমোদন নিতে হয়। এই যাচাই প্রক্রিয়া শেষে একটি বিশেষ কোড ও রুট প্রদান করা হয়। রেডিওর মাধ্যমে কোডটি পুনরায় নিশ্চিত হওয়ার পর ইরানি নৌবাহিনী সেই জাহাজকে স্কর্ট করে পার করে দেয়।
চীন, ভারত, মালয়েশিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ার কিছু জাহাজ ইতোমধ্যে এই পদ্ধতিতে পার হয়েছে বলে জানা গেছে। কিছু ক্ষেত্রে চীনা মুদ্রা ইউয়ানে এই ফি পরিশোধের তথ্য পাওয়া গেলেও ভারত কোনো ধরনের ফি দেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করেছে।ইরানের এই পদক্ষেপের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ পশ্চিমা বিশ্ব। আমিরাতের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানির প্রধান এই প্রক্রিয়াকে অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইনের দোহাই দিয়ে জাহাজ চলাচলের অবাধ অধিকারের কথা বলা হলেও ইরান তা মানতে নারাজ। কারণ তারা জাতিসংঘের সেই সমুদ্র আইন অনুমোদন করেনি। বর্তমানে দুই হাজারের বেশি জাহাজ বিকল্প দীর্ঘ পথ ব্যবহারের বদলে হরমুজ প্রণালীর প্রবেশমুখে অপেক্ষা করছে যা বিশ্ব বাণিজ্যে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে। এই পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে খাদ্য ও ওষুধের দামসহ সামগ্রিক বিশ্ব অর্থনীতিতে অপূরণীয় ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।


দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন