এপ্রিল ১, ২০২৬, ০৬:০৪ পিএম
"তুমি আর আমার বোন নও"—ভাইয়ের এই একটি কঠোর উচ্চারণ কেবল একটি ক্ষণিকের রাগ নয়, বরং ইরানের বর্তমান অস্থির পরিস্থিতিতে যুদ্ধের ক্ষত কত গভীরে পৌঁছাতে পারে তারই প্রতিচ্ছবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তেহরানের নিকটবর্তী এক শহরে সম্প্রতি এক পরিবারের সদস্যদের মাঝে এই তিক্ত বাদানুবাদ হয়, যা প্রত্যক্ষ করেছেন তাদেরই এক নিকটাত্মীয়।
ইরানে চলমান মার্কিন ও ইসরায়েলি বিমান হামলার প্রেক্ষাপটে কেবল রাজনৈতিক অঙ্গন বা রাজপথ নয়, বরং খোদ সাধারণ মানুষের ড্রয়িংরুমও এখন এক অদৃশ্য রণক্ষেত্রে পরিণত হয়েছে। দীর্ঘদিনের পারিবারিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের মাঝে তৈরি হচ্ছে বিশাল আদর্শিক ফাটল।
সিনা নামের এক তরুণ জানান, সম্প্রতি পারস্য নববর্ষ বা নওরোজ উপলক্ষে তার দাদির বাড়িতে পরিবারের সবাই একত্রিত হয়েছিলেন। উৎসবের সেই মিলনমেলায় আনন্দের বদলে শোক আর বিভক্তিই ছিল মুখ্য। সিনার এক চাচা কট্টর বাসিজ বাহিনীর সদস্য, যারা মূলত সরকারের হয়ে যেকোনো বিক্ষোভ দমনে কাজ করে।
সেই চাচা তার নিজের বোনের সঙ্গে কুশল বিনিময় করতেও অস্বীকার করেন, কারণ তার বোন বর্তমান শাসকগোষ্ঠীর ঘোর বিরোধী। এক পর্যায়ে বাদানুবাদ এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে, তারা একে অপরের সঙ্গে চিরতরে সম্পর্ক ছিন্নের ঘোষণা দেন। সিনা জানান, ২০২২ সালে মাহসা আমিনির মৃত্যুর পর শুরু হওয়া বিক্ষোভের সময় থেকেই তাদের পরিবারের এই বিভক্তি চরমে পৌঁছাতে শুরু করে।ইরানে বর্তমানে কঠোর ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট বা সংযোগ বিচ্ছিন্নতা চললেও কিছু মানুষ বিকল্প পথে বহির্বিশ্বের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছেন।
তাদের দেওয়া তথ্যমতে, চলমান যুদ্ধে কয়েক হাজার মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। আন্তর্জাতিক রেড ক্রস ও রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির মতে, এই সংখ্যা প্রায় ১ হাজার ৯০০ জন। তবে মানবাধিকার সংগঠন এইচআরএএনএ দাবি করেছে যে, নিহতের সংখ্যা ৩ হাজার ৪০০ ছাড়িয়েছে, যার মধ্যে ১ হাজার ৫০০ জনেরও বেশি সাধারণ নাগরিক। এই মৃত্যু আর ধ্বংসযজ্ঞের মাঝেও মানুষের রাজনৈতিক অবস্থান তাদের ব্যক্তিগত ও রক্তের সম্পর্কের চেয়ে বড় হয়ে দেখা দিচ্ছে।তেহরানের বাসিন্দা কাভে নামের এক যুবক জানান, তার নিজের বোন একজন বাসিজ সদস্য। ২০২২ সালের আন্দোলনে কাভে অংশ নেওয়ার পর থেকেই বোনের সঙ্গে তার সম্পর্ক তিক্ত হতে শুরু করে।
গত জানুয়ারিতে কাভোর এক বন্ধুর মৃত্যুতে তার বোন কোনো প্রকার সমবেদনা পর্যন্ত প্রকাশ করেনি। সম্প্রতি নওরোজের ছুটিতে বাড়ি গিয়ে তিনি দেখেন তার বোন তার ব্যক্তিগত স্টারলিঙ্ক ডিভাইসটি বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছেন। এই নিয়ে দীর্ঘ ঝগড়ার পর কাভে একাই বাড়ি ফিরে আসেন। ইরানের আইন অনুযায়ী স্টারলিঙ্ক ব্যবহার করা অত্যন্ত বিপজ্জনক এবং এর জন্য জেল পর্যন্ত হতে পারে, যা এই পারিবারিক দ্বন্দ্বকে আরও ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
সরকার বিরোধীদের মধ্যেও এই যুদ্ধ নিয়ে মতপার্থক্য প্রকট হয়ে উঠছে। রাশত শহরের শিক্ষার্থী মারাল জানান, তার বাবা ইরানের সাবেক যুবরাজ রেজা পাহলভির অন্ধ ভক্ত। পাহলভি বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে বাস করেন এবং ইরানের ওপর বিদেশি বিমান হামলাকে `মানবিক হস্তক্ষেপ` হিসেবে সমর্থন দিচ্ছেন। মারালের বাবা বিশ্বাস করেন এই যুদ্ধের মাধ্যমেই ইরানের সীমান্ত খুলে যাবে এবং অদূর ভবিষ্যতে দেশ পুনর্গঠিত হবে। তবে মারাল নিজে মনে করেন, এই বোমা হামলায় কেবল সাধারণ মানুষই প্রাণ হারাচ্ছে এবং এতে দেশের কোনো ভালো হবে না। বাবার এমন অন্ধ রাজনৈতিক সমর্থন মারালকে প্রতিনিয়ত হতাশ ও ক্ষুব্ধ করছে।
তেহরানের আরেক তরুণী তারা জানান, শুরুতে তার মা ও বোন বিদেশি হামলার ঘোর সমর্থক ছিলেন। তাদের ধারণা ছিল কেবল হামলার মাধ্যমেই বর্তমান ব্যবস্থার পতন সম্ভব। তারা তারাকে বিদ্রুপ করে বলতেন যে, প্রিয়জন হারানো হয়নি বলেই তিনি যুদ্ধের বিরোধিতা করছেন। তবে দিন যত গড়াচ্ছে এবং তাদের আবাসিক এলাকার কাছাকাছি বোমা পড়তে শুরু করেছে, তাদের সেই অবস্থানের পরিবর্তন আসছে। তারার বোন এখন কেবলই প্রার্থনা করেন যেন এই রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ দ্রুত শেষ হয়।
তবুও তারা পরিবারটি এখন সব সময় একসাথেই থাকার চেষ্টা করে। তারার ভাষায়, যদি মরতেই হয় তবে যেন আমরা সবাই একসাথেই মারা যাই। এই এক বাক্যেই ফুটে উঠেছে যুদ্ধের ভয়াবহতা আর অনিশ্চয়তার মাঝে বর্তমান ইরানি পরিবারগুলোর টিকে থাকার করুণ আকুতি। যুদ্ধ কেবল সীমান্ত বা স্থাপনা নয়, বরং মানুষের মনের ভেতরে থাকা ভালোবাসার দেয়ালগুলোকেও ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছে।



দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন