মে ১, ২০২৬, ১০:৫৯ পিএম
২০২৬ সালের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার এবং রাজ্য সরকারের মধ্যে সংঘাত এক নতুন মাত্রা নিয়েছে। এবারের নির্বাচনে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা ‘এসআইআর’-এর মাধ্যমে প্রায় ৯০ লাখ ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে। শুক্রবার (১ মে) বিভিন্ন সূত্র ও বিশ্লেষকদের বরাতে এই তথ্য উঠে এসেছে।
নির্বাচন কমিশন এই প্রক্রিয়াকে শুদ্ধিকরণ বললেও পশ্চিমবঙ্গ থেকে মোট ভোটারের ১২ শতাংশ নাম বাদ পড়া নিয়ে রাজনৈতিক মহলে বিতর্ক শুরু হয়েছে। বাদ পড়া ভোটারদের মধ্যে ৬০ লাখ মানুষকে মৃত বা অনুপস্থিত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বাকি ২৭ লাখ ভোটারের ভাগ্য ট্রাইব্যুনালের রায়ের ওপর ঝুলে রয়েছে।
এই তালিকায় সংখ্যালঘু মুসলিম এবং তফশিলি জাতিভুক্ত মতুয়া সম্প্রদায়ের বড় অংশ রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ব্যাপক হস্তক্ষেপ দেখা গেছে।
ভারতের ইতিহাসে সম্ভবত জরুরি অবস্থার পর এই প্রথম কোনো রাজ্যের নির্বাচনে এতোটা প্রশাসনিক ও সামরিক নিয়ন্ত্রণ লক্ষ করা যাচ্ছে। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা, কেন্দ্রীয় বাহিনী এবং নির্বাচন কমিশনের কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পশ্চিমবঙ্গ সরকার। বিশেষ করে ভোটার তালিকা থেকে নাম কাটার ক্ষেত্রে ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি’ বা যুক্তিনির্ভর অসঙ্গতির মতো অজুহাত ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।প্রতিনিধিত্বমূলক আইন বা আরপিএ-তে ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ বলে কোনো সুনির্দিষ্ট শব্দের উল্লেখ নেই।
আইনের ধারা অনুযায়ী এ ধরনের সংশোধন কোনো নির্দিষ্ট কেন্দ্রের জন্য হতে পারে, তবে সমগ্র রাজ্যের জন্য নয়। ভোটারদের নাগরিকত্ব পরীক্ষার এই মহড়াকে অনেকে অঘোষিত এনআরসি হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। বিস্ময়কর বিষয় হলো, যখন লাখ লাখ নাম কাটা হচ্ছিল, তখন ভোটের ঠিক আগে কোনো জনতাত্ত্বিক তথ্য ছাড়াই নিঃশব্দে সাত লাখ নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এবারের নির্বাচনে প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার কেন্দ্রীয় বাহিনীর জওয়ান মোতায়েন করা হয়েছে, যা ২০২১ সালের তুলনায় তিনগুণ বেশি। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ এক জনসভায় ঘোষণা করেছেন যে, নির্বাচনের ফলাফল যাই হোক না কেন, কেন্দ্রীয় বাহিনী আরও ৬০ দিন রাজ্যে অবস্থান করবে। এই ঘোষণাটি প্রশাসনিক মহলে ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছে, কারণ এটি রাজ্য সরকারের ওপর কেন্দ্রীয় দীর্ঘস্থায়ী নিয়ন্ত্রণের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
নির্বাচনের আগে তৃণমূলের প্রায় ১ হাজার ৩০০ কর্মী ও জনপ্রতিনিধিকে নিবর্তনমূলক গ্রেপ্তারের নির্দেশ দেয় নির্বাচন কমিশন। কলকাতা হাইকোর্ট এই নির্দেশের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেও আদর্শ আচরণবিধির সময়ে কমিশনের ওপর বিচারবিভাগীয় নিয়ন্ত্রণ কার্যত সীমাবদ্ধ থাকে। বিজেপি এই নির্বাচনে ‘অনুপ্রবেশকারী’ ইস্যুটিকে তাদের প্রচারের মূল ভিত্তি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই লড়াই এখন শুধুমাত্র ব্যালট বক্সের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই, এটি একটি রাজ্যের প্রাতিষ্ঠানিক অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ে পরিণত হয়েছে।


দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন