সেপ্টেম্বর ২৮, ২০২৬, ০১:১৬ পিএম
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) প্রযুক্তির অবাধ বিকাশ নিয়ন্ত্রণে যুক্তরাষ্ট্রের আইনপ্রণেতা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থাগুলোকে সরাসরি অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানিয়েছেন মাইক্রোসফটের সহপ্রতিষ্ঠাতা বিল গেটস। তিনি সতর্ক করে বলেছেন, সর্বাধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি অসৎ উদ্দেশ্যসম্পন্ন মানুষের নিয়ন্ত্রণে চলে গেলে এমন চরম বিপর্যয় ঘটতে পারে যাতে এক বিলিয়ন বা ১০০ কোটি মানুষের প্রাণহানি হতে পারে। রোববার আন্তর্জাতিক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে তিনি এই কঠোর উদ্বেগের কথা জানান।
গেটস স্পষ্ট করে বলেন যে প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোর নিজস্ব অভ্যন্তরীণ নজরদারি বা স্ব-নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা কোনোভাবেই যথেষ্ট নয়। প্রযুক্তির অপব্যবহার রোধ, নিরাপত্তা বিধান ও সার্বিক ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণে সরকারকেই আইনি বাধ্যবাধকতা সংবলিত রূপরেখা প্রণয়ন করতে হবে। তিনি প্রশ্ন তোলেন, কোনো মারাত্মক সাইবার আক্রমণ বা বিধ্বংসী জৈবিক হামলার মতো ট্র্যাজেডি ঘটার আগেই কি কার্যকর প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেওয়া হবে, নাকি ক্ষয়ক্ষতির পর পদক্ষেপ খোঁজা হবে। তবে এই বক্তব্যের অর্থ এআই নিশ্চিতভাবেই শতকোটি মানুষকে হত্যা করবে এমন কোনো নির্দিষ্ট পূর্বাভাস নয়।
বরং এর মূল বার্তা হলো আধুনিক প্রযুক্তি যদি দুর্বৃত্তদের হাতে পড়ে তবে তা গোটা মানবজাতির জন্য নজিরবিহীন হুমকি ডেকে আনতে পারে। জরুরি প্রয়োজনে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার তথাকথিত কিল সুইচ ধারণাকে এই সংকট সমাধানের জন্য অপর্যাপ্ত বলে আখ্যায়িত করেন তিনি। গেটস উল্লেখ করেন, এআই এখনও নিজে থেকে পুরো কম্পিউটার নেটওয়ার্ক দখল করে বন্ধ করার ক্ষমতা অকেজো করে ফেলার স্তরে পৌঁছেনি। তবে শেষ মুহূর্তে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করার ওপর নির্ভর না করে পুরো সিস্টেমের সার্বিক আচরণ শুরু থেকেই সক্রিয়ভাবে পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করা আবশ্যক। এই নজরদারি চালু রাখলে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর কিছুটা অতিরিক্ত ব্যয় বাড়লেও সামগ্রিক উদ্ভাবনী গতি নাটকীয়ভাবে ব্যাহত হবে না।
আইন প্রণয়ন প্রসঙ্গে তিনি জোর দিয়ে বলেন যে এআই নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইন প্রণয়ন করা অবশ্যম্ভাবী একটি জাতীয় প্রয়োজন। প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর অন্ধ আস্থা রাখা উচিত নয়, বরং কোন নিরাপত্তা মানদণ্ড বাধ্যতামূলক হবে এবং ঝুঁকি তৈরি হলে কী শাস্তিমূলক ব্যবস্থা প্রয়োগ করা হবে তা সরকারকেই ঠিক করতে হবে। মার্কিন নীতিনির্ধারণী মহলে অবশ্য এআই নিয়ন্ত্রণ নিয়ে স্পষ্ট মতভেদ রয়েছে। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অতীতে এআই নিরাপত্তা নিয়ে উত্থাপিত উদ্বেগকে অতিরঞ্জিত দাবি হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন। তবে গেটস একে নিছক আতঙ্ক মনে করেন না এবং তার দাবি, নীতিনির্ধারকদের এই প্রযুক্তির প্রকৃত গভীরতা সম্পর্কে আরও সম্যক ধারণা নেওয়া প্রয়োজন।
তার উদ্বেগের মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে এআইয়ের ব্যবহারকারী মানুষের চরিত্র। তিনি ব্যাখ্যা করেন, ক্ষতিকর মানসিকতার কোনো ক্ষুদ্র দল যদি আধুনিক প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ পেয়ে যায়, তবে তারা অতীতে কেবল ক্ষমতাধর রাষ্ট্র বা বৃহৎ সংস্থার পক্ষে সম্ভব এমন ধ্বংসাত্মক কাজ একাই সম্পন্ন করতে পারবে। বিদ্যুৎ অবকাঠামো বিকল করা, ব্যাংকিং ও আর্থিক ব্যবস্থা স্তব্ধ করা কিংবা জৈবিক অস্ত্র তৈরির ঝুঁকি এখন বাস্তব হয়ে উঠছে।
কর্মসংস্থানের ভবিষ্যৎ নিয়েও তিনি সতর্কবার্তা দিয়েছেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও স্বয়ংক্রিয় রোবটের ব্যাপক বিস্তারের ফলে লাখ লাখ প্রচলিত কর্মসংস্থান বিলুপ্ত হতে পারে। এই সংকট সামাল দিতে তিনি কিছু পেশাকে মানুষের জন্য সংরক্ষিত রাখার পরামর্শ দেন, যেমন শিশু পরিচর্যা ও বিচারিক দায়িত্ব পালন। পাশাপাশি মানুষের পরিবর্তে যন্ত্র বসানোর অর্থনৈতিক প্রবণতা ঠেকাতে করব্যবস্থায় সংস্কারের প্রস্তাব দেন তিনি, যদিও তা বাস্তবায়ন করা রাজনৈতিকভাবে কঠিন।
প্রযুক্তির ইতিবাচক সম্ভাবনাকেও অস্বীকার করেননি গেটস। সঠিক ব্যবস্থাপনার অধীনে স্বাস্থ্যসেবা, আধুনিক শিক্ষা ও কৃষিক্ষেত্রে এআই ব্যাপক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে সক্ষম। বিশেষ করে অনগ্রসর জনগোষ্ঠীর কাছে নাগরিক সেবা পৌঁছে দিতে এবং স্থানীয় ভাষাগুলোর ডিজিটাইজেশনে তার দাতব্য সংস্থা বিনিয়োগ বৃদ্ধি করছে।
শীতল যুদ্ধের সময় যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যকার পারমাণবিক অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তির মতো এআই নিয়ে চীন ও ওয়াশিংটনের মধ্যে আন্তর্জাতিক সমঝোতা সম্ভব কি না জানতে চাইলে গেটস একে আরও জটিল বলে বর্ণনা করেন। পারমাণবিক অস্ত্রের মতো এআই কেবল সামরিক ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি সমন্বিত বাণিজ্যিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক শক্তির চালিকাশক্তি। ফলে কোনো দেশই প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে চাইবে না। তার মতে, বিকাশকে থামিয়ে না দিয়ে ঝুঁকি তৈরির আগেই আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব ও শক্তিশালী আইন প্রণয়নই একমাত্র কার্যকর সমাধান।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন