অক্টোবর ১০, ২০২৬, ০৮:৩২ পিএম
রাজনৈতিক আন্দোলনের কঠিন পথে নিজের চেয়ে পরিবারের সদস্যদের অনেক বেশি দুর্ভোগ ও মানসিক যন্ত্রণা পোহাতে হয়েছে বলে মন্তব্য করেছিলেন ভারতের ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকে।
শুক্রবার (৯ অক্টোবর) মুম্বাইয়ে মারাঠি সংবাদপত্র ‘লোকসত্তা’ আয়োজিত ‘লোকসংবাদ’ শীর্ষক এক আলোচনা অনুষ্ঠানে তিনি নিজের ব্যক্তিজীবন ও সংগ্রামের এই কথাগুলো তুলে ধরেন। কিন্তু সেই বক্তব্যের ২৪ ঘণ্টা পার হওয়ার আগেই মহারাষ্ট্রের হিঙ্গোলি জেলার গ্রামের বাড়িতে মারা যান তার ৮৫ বছর বয়সী দাদি সাবিত্রীবাই শঙ্কর দীপকে। অন্যদিকে শনিবার সকালে দিল্লিতে পূর্বঘোষিত রাজনৈতিক কর্মসূচিতে যোগ দিতে গিয়ে ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে অবতরণ করা উড়োজাহাজের ভেতর থেকেই আটক হন অভিজিৎ।
মুম্বাইয়ের ওই মতবিনিময় সভায় অভিজিৎ প্রকাশ করেন, গত জুলাই মাসে দিল্লির ঐতিহাসিক যন্তর মন্তরে সিজেপির প্রথম বড় বিক্ষোভ কর্মসূচি চলাকালে তার বাবা ও মা দুজনকেই শারীরিক অসুস্থতার কারণে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়েছিল। তবে আন্দোলনের গুরুত্ব ধরে রাখতে এবং জনসহানুভূতি নেওয়ার চেষ্টা হিসেবে কেউ যেন বিষয়টিকে চিহ্নিত না করে, সেজন্য তখন তিনি ঘটনাটি সম্পূর্ণ গোপন রেখেছিলেন। পাশাপাশি অসুস্থ বাবা-মাকে দেখতে বাড়ি ফিরে গেলে আন্দোলন থেকে পিছু হটার অপবাদ উঠতে পারে—এমন গভীর আশঙ্কাও কাজ করেছিল তার ভেতরে।
শনিবার হিঙ্গোলি জেলার সান্তুক পিম্পরি গ্রামে বার্ধক্যজনিত কারণে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তার দাদি সাবিত্রীবাই শঙ্কর দীপকে। মৃত্যুর সংবাদ নিশ্চিত হওয়ার পরপরই অভিজিতের বাবা ভগবান দীপকে ও মা অনিতা দীপকে শেষকৃত্যে অংশ নিতে গ্রামের উদ্দেশে রওনা দেন। তবে দিল্লিতে উড়োজাহাজ থেকেই অভিজিৎকে পুলিশি হেফাজতে নেওয়ার কারণে তিনি দাদির শেষকৃত্যে যোগ দেওয়ার আনুষ্ঠানিক অনুমতি পাবেন কি না, সে বিষয়ে কোনো নিশ্চয়তা পাওয়া যায়নি।
নিজের শিকড় ও গ্রামীণ জীবনের প্রসঙ্গে সান্তুক পিম্পরি গ্রামের বাস্তব চিত্র সবসময়ই সামনে আনেন এই তরুণ রাজনৈতিক নেতা।
তিনি জানান, তার বাবা পড়াশোনা শেষ করে প্রকৌশলী হওয়ার পর পরিবার নিয়ে ছত্রপতি সম্ভাজিনগরে চলে যান। সেখানে একটি কনভেন্ট স্কুলে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন অভিজিৎ। পরবর্তীতে পুনেতে উচ্চমাধ্যমিক ও কারিগরি শিক্ষা শেষে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রে।
তবে পরিবারের মূল ধারার উন্নতি হলেও গ্রামের অন্য আত্মীয়স্বজনদের অর্থনৈতিক ভাগ্য সামান্যতম বদলায়নি। সান্তুক পিম্পরি গ্রামে বসবাসরত তার স্বজনদের কেউ দিনমজুর নির্মাণশ্রমিক, কেউ কৃষিজমিতে অন্যের মজুরি করেন, আবার কেউ সাধারণ গাড়িচালক হিসেবে জীবিকা নির্বাহ করেন। এমনকি তার এক আপন ফুফু এখনো মাঠে দিনমজুরের কাজ করে দিনাতিপাত করছেন।
রক্তের সম্পর্কের মানুষদের ভেতরে এমন বৈষম্য তাকে আলোড়িত করেছিল। অভিজিতের ভাষায়, তার বাবা প্রকৌশলী হয়েছেন এবং তিনি নিজে যুক্তরাষ্ট্র থেকে পড়াশোনা করে ফিরেছেন ঠিকই, কিন্তু গ্রামের সাধারণ মানুষের বাস্তব জীবনের কঠিন লড়াই আগের মতোই অপরিবর্তিত রয়ে গেছে।
ছুটির দিনগুলো সবসময় গ্রামে কাটাতেন অভিজিৎ। গ্রামের মানুষ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর বেঁচে থাকার দৈনন্দিন লড়াই প্রত্যক্ষ করার অভিজ্ঞতাই তাকে গ্রামীণ বিদ্যালয় এবং আদিবাসী জনপদের শিক্ষাব্যবস্থার আধুনিকায়নে কাজ করতে পথ দেখায়। পরবর্তীতে সিজেপির গণআন্দোলন গড়ে তোলার পেছনেও প্রান্তিক জীবনের এই অবিচার অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে।
সক্রিয় রাজনীতিতে আসার আগে নিজের আকাঙ্ক্ষা অনেক সীমিত ছিল বলেও জানান তিনি। একসময় স্বজনদের কাছে নিজের ইচ্ছার কথা জানিয়ে বলেছিলেন, তিনি গ্রামের সরপঞ্চ বা পঞ্চায়েতপ্রধান হয়ে সেবা করতে চান। তবে তার এমন ইচ্ছার কথা শুনে পরিবারের প্রবীণরা দীর্ঘ নীরবতা বজায় রাখতেন এবং রাজনীতিতে না গিয়ে সাধারণ জীবন বেছে নেওয়ার পরামর্শ দিতেন।
কারাগারে যাওয়ার নিশ্চিত আশঙ্কা নিয়েই গত জুলাইয়ে সিজেপির প্রথম বিক্ষোভের আগে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ভারতে ফিরেছিলেন অভিজিৎ। যেকোনো সময় গ্রেপ্তার হতে পারেন—এমন স্পষ্ট মানসিক প্রস্তুতি থাকায় তিনি যুক্তরাষ্ট্র থেকে মাত্র একটি ছোট ব্যাকপ্যাক সঙ্গে নিয়ে দেশে ফেরেন। তিনি ভেবেছিলেন, কারাগারে দীর্ঘ সময় কাটাতে হলে বড় লাগেজ বা পোশাকের প্রয়োজন হবে না। তার বাকি তিনটি বড় ব্যাগ এখনো যুক্তরাষ্ট্রে আগের মতোই পড়ে রয়েছে।
শনিবার সকালে দিল্লিগামী বিমানের ভেতরে ধারণ করা এক ভিডিওতে তাকে দায়িত্বপ্রাপ্ত পুলিশ কর্মকর্তাদের বলতে শোনা যায় যে, গ্রেপ্তার হওয়ার পূর্ণ প্রস্তুতি নিয়েই তিনি দিল্লিতে এসেছেন এবং প্রয়োজনে পুলিশ তাকে সরাসরি আটক করতে পারে।
এদিকে ছেলেকে আটকের ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে তার বাবা ভগবান দীপকে প্রশ্ন তুলেছেন, কোনো সুনির্দিষ্ট পরোয়ানা ছাড়া কোন আইনের অধীনে বিমানে প্রবেশ করে অভিজিৎকে আটক রাখা হয়েছে। একই সাথে তার মা অনিতাও পুত্রের সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থানের প্রতি পুরো পরিবারের নিঃশর্ত সমর্থনের কথা ব্যক্ত করেছেন।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন