অক্টোবর ১০, ২০২৬, ০৯:৪৯ পিএম
ভারতে নির্বাচনি স্বচ্ছতা ও গণতান্ত্রিক অধিকারের দাবিতে রাজপথে নামা বিক্ষোভকারীদের ওপর প্রশাসনিক দমনপীড়নের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে তাদের প্রতি সংহতি জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। শনিবার (১০ অক্টোবর) গণমাধ্যমে পাঠানো এক আনুষ্ঠানিক বিবৃতিতে তিনি ভারতের আন্দোলনরত তরুণ ও গণতান্ত্রিক শক্তিগুলোর পাশে থাকার সুস্পষ্ট অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
বিবৃতিতে নাহিদ ইসলাম উল্লেখ করেন, নির্বাচনি জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং সাংবিধানিক গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার দাবিতে আন্দোলনরত ভারতের তরুণ সমাজের সঙ্গে তারা দৃঢ় সংহতি প্রকাশ করছেন। নয়াদিল্লিতে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারী, রাজনৈতিক সংগঠক ও সাংবাদিকদের নির্বিচারে আটক করা, মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া এবং ঐতিহাসিক যন্তর মন্তরে সভা-সমাবেশের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা জনগণের মৌলিক স্বাধীনতার ওপর সরাসরি আঘাত। তিনি স্পষ্ট করেন, নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা ও সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিরপেক্ষতা নিয়ে জনমনে ওঠা প্রশ্নের যৌক্তিক ও স্বচ্ছ জবাব দেওয়া প্রয়োজন, ব্যারিকেড ও সেন্সরশিপ চাপিয়ে তা দমন করা যায় না।
দিল্লির এই লড়াইকে শুধু তাদের একার নয় বলে অভিহিত করেন এই তরুণ রাজনৈতিক নেতা।
তিনি বলেন, জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান রক্ষা এবং মানবিক মর্যাদার অভিন্ন দাবিতে একে অপরের সুহৃদ হিসেবে ঢাকা থেকে তারা ভারতীয় আন্দোলনকারীদের পাশে রয়েছেন।
এই আন্দোলনের প্রেক্ষাপটকে বাংলাদেশের ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে তুলনা করে নাহিদ ইসলাম বলেন, এই ধরনের গণতান্ত্রিক লড়াইয়ের গভীরতা তারা পুরোপুরি অনুধাবন করতে পারেন, কারণ বাংলাদেশও একই ধরনের বাস্তবতার মধ্য দিয়ে গেছে। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের সূচিত আন্দোলন দ্রুত ১৫ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী গণঅভ্যুত্থানে রূপ নেয়। ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রযন্ত্র সেই আন্দোলন দমনে প্রাণঘাতী গুলি ব্যবহার করেছিল। পরবর্তীতে জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী, ওই অভ্যুত্থান ও দমনপীড়নের ঘটনায় প্রায় এক হাজার ৪০০ মানুষের প্রাণহানি ঘটে। বাংলাদেশের সেই সংকটকালে ভারতীয় শিক্ষার্থী, মুক্তমনা লেখক ও স্বাধীন কণ্ঠের মানুষ যেভাবে সংহতি জানিয়েছিলেন, তা বাংলাদেশ শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করে।
ভারতের অতীত গণতান্ত্রিক প্রতিরোধের ইতিহাস স্মরণ করে তিনি শাহিনবাগের নারীদের নাগরিকত্ব রক্ষার আন্দোলন, জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় ও যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের দীর্ঘ ধারাবাহিক প্রতিবাদের ঐতিহ্য তুলে ধরেন। তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের জুলাই অভ্যুত্থানে যেমন নারীরা সামনের কাতারে ছিলেন, তেমনি ভারতের রাজপথেও আজ তরুণীদের সাহসী ভূমিকা গণতান্ত্রিক প্রতিরোধের অমূল্য প্রতীক হয়ে উঠেছে।
বিবৃতিতে হিন্দুত্ববাদী সংখ্যাগরিষ্ঠতাবাদ, ফ্যাসিবাদ ও যেকোনো ধরনের ধর্মীয় আধিপত্যবাদের তীব্র বিরোধিতা করেন জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক।
নাহিদ ইসলাম মন্তব্য করেন, উগ্র ধর্মীয় আধিপত্যবাদ কোনোভাবেই দক্ষিণ এশিয়ার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে পারে না। বাংলাদেশে যেভাবে কর্তৃত্ববাদ, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ ও রাজনৈতিক অসহিষ্ণুতা বর্জন করা হয়েছে, ভারতেও সেগুলোর অবসান হওয়া জরুরি। ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ কিংবা শ্রেণিভেদ ভুলে অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও সামাজিক সুবিচারের ভিত্তিতেই একটি সার্বজনীন ভবিষ্যৎ গড়ে তোলা সম্ভব। সমাজে সংখ্যালঘুরা আতঙ্কে থাকলে, ভিন্নমতকে অপরাধ সাব্যস্ত করা হলে এবং পরিচয়ের ভিত্তিতে নাগরিক অধিকার নির্ধারিত হলে কোনো রাষ্ট্র প্রকৃত গণতান্ত্রিক হতে পারে না।
দিল্লি প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, শান্তিপূর্ণ সমাবেশের গণতান্ত্রিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে, আটক আন্দোলনকারীদের সুনির্দিষ্ট অবস্থান ও তাদের আটকের আইনি কারণ স্পষ্ট করতে হবে এবং তাদের অবিলম্বে মুক্তি দিতে হবে। পাশাপাশি সাংবাদিকদের কোনো ভয়ভীতি বা যন্ত্রপাতি জব্দের আশঙ্কা ছাড়াই বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ সংগ্রহের পূর্ণ স্বাধীনতা দিতে হবে। তিনি ভারতের কারাবন্দি তরুণ নেতা শারজিল ইমাম ও উমর খালিদের দীর্ঘ কারাবাসের প্রসঙ্গ টেনে তাদের মুক্তি দাবি করেন এবং ভারতের সব আন্দোলনকারীকে দক্ষিণ এশিয়ার তরুণদের অনুপ্রেরণা হিসেবে উল্লেখ করেন।
দুই প্রতিবেশী দেশের জনগণের অধিকার সুরক্ষার বিষয়টি পরস্পরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত বলে মন্তব্য করেন নাহিদ। সীমান্তে হত্যাকাণ্ড বন্ধ, অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন, পরিবেশ রক্ষা ও জাতীয় সার্বভৌমত্ব রক্ষার অমীমাংসিত সংকট নিরসনে উভয় দেশের সমমর্যাদা এবং পারস্পরিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
বিবৃতির সমাপ্তি টেনে নাহিদ ইসলাম দৃঢ় থাকার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ঢাকা থেকে এবং জুলাই প্রজন্মের অপ্রাপ্ত গণতান্ত্রিক প্রত্যাশার জায়গা থেকে তারা সবসময় এই লড়াইয়ের পাশে আছেন।
উল্লেখ্য, ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে ককরোচ জনতা পার্টির আহ্বানে ডাকা বিক্ষোভে বাধা দিয়ে শনিবার দিনভর দিল্লিতে সাত হাজারের বেশি মানুষকে আটক করেছে পুলিশ। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর প্রক্রিয়া এবং নতুন ফরম-৬ সংক্রান্ত বিধিমালার মাধ্যমে লাখ লাখ ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার প্রতিবাদেই এই আন্দোলন দানা বাঁধে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন