রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

হাসিনার আমলের বিচারকদের বিচার দাবিতে সরব আইনজীবীরা

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

মে ১২, ২০২৬, ০৯:৩২ এএম

হাসিনার আমলের বিচারকদের বিচার দাবিতে সরব আইনজীবীরা

শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর জনপ্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অনেক সদস্য জবাবদিহিতার আওতায় এলেও তার সরকারের সহযোগী হিসেবে পরিচিত বিচারকরা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে রয়েছেন। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতার পরিবর্তন হলেও সাবেক সরকারের ‍‍`শপথবদ্ধ রাজনীতিবিদ‍‍` হিসেবে চিহ্নিত এসব বিচারকদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ায় পুলিশ ও বেসামরিক প্রশাসনে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ অ্যাসোসিয়েশন ও বাংলাদেশ পুলিশ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের পক্ষ থেকে বিচারকদের এই ‍‍`অঘোষিত দায়মুক্তি‍‍` নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। 

জাতীয়তাবাদী আইনজীবী ফোরামের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত দেশে চার হাজারের বেশি মানুষ বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন এবং অন্তত ৭০০ জন গুম হয়েছেন। এই সময়ে ৬০ লাখের বেশি মানুষকে আসামি করে গায়েবি মামলা দেওয়া হয়েছে। আইনজীবী নেতাদের দাবি, এসব অবিচারের পেছনে আদালতের একশ্রেণির বিচারক মূল কারিগর হিসেবে কাজ করেছেন।

বর্তমানে দেশের অধস্তন আদালতগুলোতে কর্মরত দুই হাজার ১৮৫ জন বিচারকের মধ্যে এক হাজার ৯৪১ জনই আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরে নিয়োগ পেয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, এসব নিয়োগের ক্ষেত্রে দলীয় পরিচয় ও ছাত্রলীগের ব্যাকগ্রাউন্ডকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। আইন মন্ত্রণালয় ও জুডিশিয়াল সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশনের তথ্য বলছে, আওয়ামী লীগ আমলে মোট ১৪টি নিয়োগ পরীক্ষার মাধ্যমে এই বিচারকদের নিয়োগ দেওয়া হয়।

বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের সাজা নিশ্চিত করতে বিচারকরা অনেক সময় গভীর রাত পর্যন্ত আদালতের কার্যক্রম পরিচালনা করেছেন। আইনজীবীদের ভাষ্যমতে, অনেক ক্ষেত্রে লোডশেডিংয়ের সময় এজলাসে মোমবাতি জ্বালিয়ে সাক্ষীদের জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়েছে। ২০২৩ সালের অক্টোবর মাসে রাজধানীর বিভিন্ন মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে রাত ৮টা থেকে সাড়ে ৮টা পর্যন্ত বিচার কার্যক্রম চলার রেকর্ড রয়েছে।

বিএনপি ও এর অঙ্গসংগঠনের ৪৯ লাখ ২৬ হাজারের বেশি নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে গত দেড় দশকে এক লাখ ৪১ হাজারের বেশি মামলা হয়েছে। ২০২৪ সালের একতরফা নির্বাচনের আগে তড়িঘড়ি করে সাজা নিশ্চিত করতে আইন মন্ত্রণালয় থেকে ১৫৮টি মামলার একটি তালিকা সিএমএম আদালতে পাঠানো হয়েছিল বলে আইনজীবীরা দাবি করেন। এর মধ্যে কয়েক সপ্তাহের ব্যবধানে ৭৯টি মামলার রায় দিয়ে এক হাজার ২৪৯ জন নেতাকর্মীকে সাজা দেওয়া হয়।

খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে দায়ের করা জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট মামলার রায়কে কেন্দ্র করে পাঁচজন বিচারপতির নাম বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে। তারা হলেন— বিচারপতি ইনায়েতুর রহিম, বিচারপতি মোহাম্মদ নুরুজ্জামান (ননী), বিচারপতি আবু আহমেদ জমাদার, বিচারপতি কামরুল হোসেন মোল্লা ও বিচারপতি মো. আকতারুজ্জামান। আইনজীবীদের অভিযোগ, এই পাঁচ বিচারপতি প্রচলিত আইনের লঙ্ঘন করে খালেদা জিয়াকে কারাগারে বন্দি রাখতে ভূমিকা রেখেছেন এবং পরবর্তীতে তারা বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন।

একইভাবে তারেক রহমান ও জুবাইদা রহমানকে সাজা দেওয়ার ক্ষেত্রে তৎকালীন মহানগর দায়রা জজ মো. আসাদুজ্জামানের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন আইনজীবীরা। অভিযোগ রয়েছে, হাইকোর্টের বিচারপতি হওয়ার প্রলোভনে তিনি টানা সাক্ষ্য গ্রহণ করে এই রায় দিয়েছিলেন।

সার্বিক বিষয়ে আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামান জানিয়েছেন, বিচার বিভাগে আর কোনো ‍‍`শপথবদ্ধ রাজনীতিবিদ‍‍` দেখতে চায় না সরকার। তিনি বলেন, যারা সন্ধ্যার পর রাত ১২টা পর্যন্ত মোমবাতি জ্বালিয়ে বিরোধীপক্ষকে দমনের জন্য বিচারকার্য পরিচালনা করেছেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সময়ের দাবি। কারা এই প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িত ছিলেন, আইন মন্ত্রণালয় বর্তমানে সেই বিষয়টি খতিয়ে দেখছে।