অক্টোবর ৭, ২০২৬, ১০:৩৫ এএম
রাজধানীর মতিঝিলের শাপলা চত্বরে ২০১৩ সালের ৫ মে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যার অভিযোগে করা মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাসহ ৪১ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের শুনানির জন্য আজ বুধবার দিন ধার্য রয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি নজরুল ইসলাম চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে এই মামলার শুনানি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ট্রাইব্যুনালের অপর দুই সদস্য হলেন বিচারক মো. মঞ্জুরুল বাছিদ ও বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর।
এর আগে গত ২৭ আগস্ট শেখ হাসিনাসহ ৪১ আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন। সেদিন দাখিলকৃত অভিযোগ আমলে নিয়ে শেখ হাসিনাসহ পলাতক ৩১ আসামির বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন আদালত। পরবর্তী সময়ে এ মামলায় সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকীকে গ্রেপ্তার করা হয়। ফলে বর্তমানে এ মামলার মোট ১১ জন আসামি গ্রেপ্তার রয়েছেন।
পলাতক আসামিদের উপস্থিতির বিষয়ে গত ৩ সেপ্টেম্বর শেখ হাসিনাসহ ৩০ জনকে আদালতে হাজির হতে সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের নির্দেশ দেন ট্রাইব্যুনাল। বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের পরও আসামিরা আদালতে হাজির হননি। এর ধারাবাহিকতায় আইনি প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে গত ১৬ সেপ্টেম্বর পলাতক ওই ৩০ আসামির পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী বা স্টেট ডিফেন্স নিয়োগের আদেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের শুনানির জন্য আজকের দিনটি নির্ধারণ করা হয়েছিল।
কারাগারে থাকা গ্রেপ্তার ১১ জন আসামি হলেন তৎকালীন তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, তৎকালীন খাদ্যমন্ত্রী ড. আব্দুর রাজ্জাক, তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ডা. দীপু মনি, সাবেক মন্ত্রী আবদুল লতিফ সিদ্দিকী, সাবেক আইজিপি একেএম শহীদুল হক, বরখাস্তকৃত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসান, সাবেক ডিআইজি আব্দুল জলিল মণ্ডল, ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সভাপতি শাহরিয়ার কবির, একাত্তর টিভির ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোজাম্মেল হক বাবু এবং ফারজানা রূপা।
পলাতক ৩০ জন আসামির তালিকায় রয়েছেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ, তৎকালীন বন ও পরিবেশমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, সাবেক প্রতিমন্ত্রী মৃণাল কান্তি দাস, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক, সাবেক মন্ত্রী মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, তৎকালীন যুবলীগ চেয়ারম্যান ওমর ফারুক চৌধুরী, সাবেক সংসদ সদস্য সালাউদ্দিন মাহমুদ এবং গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ডা. ইমরান এইচ সরকার।
এছাড়া সাবেক আইজিপি ড. মোহাম্মদ জাবেদ পাটোয়ারী, সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ, তৎকালীন র্যাব মহাপরিচালক মো. মোখলেছুর রহমান, সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল আজিজ আহমেদ, তৎকালীন র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক লেফটেন্যান্ট জেনারেল মো. মজিবুর রহমান, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি শেখ মুহাম্মাদ মারুফ হাসান, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি মাহবুব হোসেন, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি মনিরুল ইসলাম, তৎকালীন ডিএমপির ডিসি মো. আনোয়ার হোসেন, তৎকালীন ডিএমপির ডিসি আশরাফুজ্জামান, তৎকালীন ডিএমপির এডিসি এসএম মেহেদী হাসান, সাবেক ডিআইজি হারুন-অর-রশীদ, সাবেক ডিআইজি বিপ্লব কুমার সরকার, সাবেক ডিআইজি সৈয়দ নুরুল ইসলাম, তৎকালীন ডিএমপির এডিসি মো. আসাদুজ্জামান, অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এসএম শিবলী নোমান এবং তৎকালীন মতিঝিল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বিএম ফরমান আলীও এ তালিকায় রয়েছেন।
আদালতে পেশ করা আনুষ্ঠানিক অভিযোগের বিবরণ অনুযায়ী, তৎকালীন সরকার ২০১৩ সালের ৫ মে শাপলা চত্বরে অবস্থানরত হেফাজতে ইসলামের নিরস্ত্র নেতাকর্মীদের ওপর পরিকল্পিতভাবে অভিযান পরিচালনা করে। ওইদিন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গণভবনে সরকারের শীর্ষ মন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকদের নিয়ে একটি জরুরি বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে দলের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, খাদ্যমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক ও তথ্যমন্ত্রী হাসানুল হক ইনু উপস্থিত ছিলেন। বৈঠকে যেভাবেই হোক রাতের মধ্যে সমাবেশস্থল থেকে অবস্থানকারীদের সরিয়ে দেওয়ার সরাসরি নির্দেশনা দেওয়া হয়।
উচ্চপর্যায়ের নির্দেশনা পেয়ে পুলিশের তৎকালীন আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকারের নেতৃত্বে পুলিশ কন্ট্রোল রুমে পুলিশ, র্যাব ও বিজিবির শীর্ষ কর্মকর্তাদের উপস্থিতিতে একটি যৌথ সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানেই শাপলা চত্বর এলাকায় যৌথ সশস্ত্র অভিযানের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করা হয়। অভিযান কার্যকর করতে বাহিনীগুলো ভিন্ন ভিন্ন সাংকেতিক নাম দেয়। পুলিশের অভিযানের নাম ছিল ‘অপারেশন সিকিউরড শাপলা’, বিজিবির নাম ছিল ‘অপারেশন ক্যাপচার শাপলা’ এবং র্যাব অভিযানের নাম নির্ধারণ করে ‘অপারেশন ফ্ল্যাশ আউট’। পরবর্তীতে পুরো অভিযানটি ‘অপারেশন ফ্ল্যাশ আউট’ নামেই পরিচিতি লাভ করে।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, রাত আড়াইটার দিকে সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগ করে এই অভিযান শুরু হয়। সমাবেশস্থলে অবস্থানরতদের লক্ষ্য করে সাউন্ড গ্রেনেড, কালার স্মোক গ্রেনেড, মাল্টি ইমপ্যাক্ট গ্রেনেড, থ্রি-বল প্রজেক্টাইল ও টিয়ার গ্যাস ছোড়া হয়। এ সময় নেতাকর্মীরা আত্মরক্ষায় বিভিন্ন দিকে ছোটাছুটি শুরু করলে তাদের লক্ষ্য করে নির্বিচারে শটগান ও অন্যান্য আগ্নেয়াস্ত্র দিয়ে গুলি চালানো হয়।
রাত ও পরদিন দিনভর চলা আক্রমণে মতিঝিল ও আশপাশের এলাকায় হেফাজতে ইসলামের ৩২ জন নেতাকর্মী শহীদ ও নিখোঁজ হন বলে অভিযোগপত্রে প্রমাণ পাওয়ার কথা উল্লেখ রয়েছে। এছাড়া ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জ থানার মাদানী নগর ও এর আশপাশে ২০ জন, চট্টগ্রামে পাঁচজন এবং কুমিল্লায় একজন নিহত হওয়ার তথ্য অভিযোগে তুলে ধরা হয়। প্রসিকিউশন এ ঘটনায় একটি নির্দিষ্ট ধর্মীয় গোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিত গণহত্যা চালানোর অভিযোগ এনেছে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন