অক্টোবর ২৩, ২০২৫, ০৫:০৯ পিএম
গুম, খুন এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের মতো গুরুতর অভিযোগে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারাধীন আলোচিত ১৫ জন সেনা কর্মকর্তার পক্ষে আইনি লড়াই থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার এম সরোয়ার হোসেন। বৃহস্পতিবার, ২৩ অক্টোবর, সাংবাদিকদের করা এক প্রশ্নের জবাবে তিনি তার এই সিদ্ধান্তের কথা জানান। এই সিদ্ধান্তটি আইনি অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে, কারণ মাত্র একদিন আগেই, বুধবার, এই ব্যারিস্টার অভিযুক্ত সেনা কর্মকর্তাদের পক্ষে ট্রাইব্যুনালে শুনানি করেছিলেন।
তার এই আকস্মিক সরে দাঁড়ানোর পেছনে একটি বড় ধরনের ‘স্বার্থের সংঘাত’ বা নৈতিক সংকটের বিষয়টি সামনে এসেছে, যা তিনি নিজেই স্বীকার করেছেন। ব্যারিস্টার সরোয়ার জানিয়েছেন, তিনি নিজেই গুমের ঘটনায় একজন অভিযোগকারী এবং বর্তমানে কারাগারে পাঠানো এই পনেরো জন কর্মকর্তার মধ্যে একজন কর্মকর্তা তার দায়ের করা অভিযোগের প্রত্যক্ষ আসামি। এই পরিস্থিতিতে একই মামলায় অভিযোগকারী এবং আসামিপক্ষের আইনজীবী হিসেবে থাকা আইনগত ও নৈতিকভাবে অসম্ভব হওয়ায় তিনি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
এই নাটকীয় সিদ্ধান্তের ঠিক একদিন আগে, বুধবার, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এ একটি ভিন্ন চিত্র দেখা গিয়েছিল। আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে টিএফআই-জেআইসি সেলে সংঘটিত গুম-খুন এবং গত জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানকালে মানবতাবিরোধী অপরাধে অভিযুক্ত ১৫ জন উচ্চপদস্থ সেনা কর্মকর্তাকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। সেই শুনানিতে ব্যারিস্টার এম সরোয়ার হোসেনই অভিযুক্ত এই কর্মকর্তাদের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন এবং তাদের জন্য জামিন আবেদনসহ বিভিন্ন আইনি প্রক্রিয়া শুরু করেছিলেন।
ওইদিনই ট্রাইব্যুনাল-১ এর চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল অভিযুক্তদের জামিন আবেদন নাকচ করে তাদের কারাগারে পাঠানোর আদেশ দেন। এই কর্মকর্তাদের সেনানিবাসে একটি বিশেষ সাব-জেলে রাখার ব্যবস্থাও করা হয়। বুধবার যিনি আসামিদের পক্ষে জোরালো সওয়াল করলেন, বৃহস্পতিবারই তার এমন সরে দাঁড়ানোর ঘোষণায় মামলার গতিপ্রকৃতি নিয়ে নতুন কৌতূহল তৈরি হয়েছে।
বৃহস্পতিবার সাংবাদিকরা এই বিষয়ে ব্যারিস্টার সরোয়ারের মুখোমুখি হলে তিনি তার অবস্থান পরিষ্কার করেন। তিনি বলেন, ‘আমি যে গুমের অভিযোগ দায়ের করেছিলাম, গ্রেপ্তার হওয়া ১৫ কর্মকর্তার মধ্যে একজন রয়েছেন। তাই আর আইনি লড়াইয়ে থাকছি না।’ এই মন্তব্যের মাধ্যমে তিনি স্বীকার করে নেন যে, বুধবারের শুনানিতে একটি বড় ধরনের স্বার্থের সংঘাতের বিষয় ছিল। আইনি ও নৈতিক বিধিবিধান অনুযায়ী, একজন আইনজীবী যিনি কোনো মামলায় অভিযোগকারী,
তিনি সেই মামলার বা সম্পর্কিত কোনো মামলার আসামির পক্ষে আইনজীবী হিসেবে দাঁড়াতে পারেন না। ব্যারিস্টার সরোয়ারের এই স্বীকারোক্তি মামলার একটি জটিল দিক উন্মোচন করল।
বিষয়টি আরও গভীরে অনুসন্ধান করে জানা গেছে, ব্যারিস্টার এম সরোয়ার হোসেন, যিনি নিজেও সেনাবাহিনীর একজন সাবেক কর্মকর্তা, তিনি কেবল এই ১৫ কর্মকর্তার বিরুদ্ধেই নন, বরং পূর্ববর্তী শাসনামলে সংঘটিত গুম ও রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের ঘটনায় সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল (অব.) এস এম শফিউদ্দিন আহমেদসহ আরও কয়েকজন সাবেক শীর্ষ সেনা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল এবং জুলাই বিপ্লবের পর গঠিত গুম কমিশনে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দায়ের করেছিলেন।
তার দায়ের করা অভিযোগগুলো ছিল মূলত টিএফআই সেলে নির্যাতন এবং গুমের ঘটনা সংক্রান্ত। বুধবার কারাগারে পাঠানো ১৫ জন কর্মকর্তার মধ্যে অন্তত একজন কর্মকর্তা ব্যারিস্টার সরোয়ারের দায়ের করা সেই অভিযোগপত্রের অন্যতম আসামি। এই তথ্য প্রকাশ্যে আসার পরই ব্যারিস্টার সরোয়ারের বুধবারের উপস্থিতি নিয়ে তীব্র সমালোচনা শুরু হয় এবং অবশেষে বৃহস্পতিবার তিনি নিজেই এই মামলা থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দিতে বাধ্য হলেন।
ব্যারিস্টার সরোয়ারের এই প্রত্যাহারের ফলে অভিযুক্ত ১৫ জন সেনা কর্মকর্তাকে এখন তাদের আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার জন্য নতুন আইনজীবী বা আইনি দল নিয়োগ করতে হবে। অন্যদিকে, ব্যারিস্টার সরোয়ার এখন এই মামলায় পুরোপুরি অভিযোগকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হবেন, যা মামলার বিচারিক প্রক্রিয়াকে আরও জটিল ও বহুমাত্রিক করে তুলবে। আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একজন অভিযোগকারীর ভুলবশত বা অজ্ঞাতসারে আসামিপক্ষের আইনজীবী হিসেবে একদিনের জন্য হলেও অংশ নেওয়া একটি বিরল ঘটনা।
তবে তিনি যেহেতু দ্রুতই এই নৈতিক ত্রুটি উপলব্ধি করে নিজেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছেন, তাই এটি বিচার প্রক্রিয়ায় কোনো নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে না। এখন সবার দৃষ্টি থাকবে এই ১৫ জন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের এই মামলার পরবর্তী শুনানির দিকে, যা দেশের আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে একটি ঐতিহাসিক পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।




দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন