বুধবার, ০৪ নভেম্বর, ২০২৬,

মাদক নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ তৈরির তাগিদ রেলওয়ে পুলিশ প্রধানের

জাতীয় ডেস্ক

নভেম্বর ৩, ২০২৬, ১১:১৪ পিএম

মাদক নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ তৈরির তাগিদ রেলওয়ে পুলিশ প্রধানের

মাদক নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ গড়ে তোলা এবং কেবল মাঠপর্যায়ের বাহকদের না ধরে মূল অর্থদাতা ও সরবরাহকারীদের আইনের আওতায় আনার জোর দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশ রেলওয়ে পুলিশের প্রধান ও অতিরিক্ত আইজিপি (চলতি দায়িত্ব) ব্যারিস্টার মো. জিল্লুর রহমান।

মঙ্গলবার রাজধানীর ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির সহযোগিতায় ও ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি সাংবাদিক সমিতির আয়োজনে এক নীতিসংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ অভিমত ব্যক্ত করেন। ‍‍`পলিসি ডায়ালগ অন এ ড্রাগ ফ্রি বাংলাদেশ: চ্যালেঞ্জেস অ্যান্ড অ্যাকশন‍‍` শীর্ষক এই সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়।

রেলওয়ে পুলিশ প্রধান স্পষ্ট করেন, কেবল রাস্তায় অভিযান চালিয়ে বা খুচরা বিক্রেতা ও বাহকদের গ্রেপ্তার করে মাদক সমস্যার স্থায়ী সুফল পাওয়া অসম্ভব।

তিনি বলেন, কারা মাদকের চালান দেশে আনছে, কারা বিপুল অর্থ জোগান দিচ্ছে এবং পর্দার আড়ালে থেকে কারা এই সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছে, তাদের খুঁজে বের করতে হবে। অপরাধীদের তাৎক্ষণিক শনাক্ত করতে সব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ব্যবহারের উপযোগী একটি সমন্বিত কেন্দ্রীয় ডাটাবেজ তৈরি করা আবশ্যক। এই লক্ষ্যে গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার, তথ্যপ্রযুক্তির প্রয়োগ এবং বাহিনীগুলোর পারস্পরিক সমন্বয় বাড়ানো দরকার।

রেলপথের ঝুঁকির কথা তুলে ধরে তিনি জানান, মাদক কারবারিরা চলাচলের সব মাধ্যম ব্যবহার করে এবং রেলপথ তাদের কাছে অন্যতম রুট হতে পারে। দেশের বিশাল রেল যোগাযোগ, প্রতিদিন লাখ লাখ যাত্রীর যাতায়াত এবং উন্মুক্ত স্টেশন ব্যবস্থার কারণে সেখানে নজরদারি রাখা একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ। এই বাস্তবতা সত্ত্বেও পুলিশ সর্বোচ্চ সতর্কতায় কাজ করছে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সচেতনতা তৈরি, আসক্তদের চিকিৎসা ও সামাজিক পুনর্বাসনের তাগিদ দিয়ে তিনি পরিবার, প্রশাসন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও গণমাধ্যমের সমন্বিত ভূমিকার আহ্বান জানান।

সংলাপে ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য ড. মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় কেবল সনদ দেওয়ার জায়গা নয়, এটি মানবিক মূল্যবোধ ও সামাজিক দায়বদ্ধতা গড়ার ক্ষেত্র। ক্যাম্পাসে মাদক প্রতিরোধে নিয়মিত কাউন্সেলিং, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা ও কার্যকর নজরদারি থাকা প্রয়োজন। কোনো শিক্ষার্থী বিপথগামী হলে তাকে সরাসরি অপরাধী না ভেবে বিপথে যাওয়ার কারণ চিহ্নিত করতে হবে। পাশাপাশি ক্যাম্পাস ও এর আশপাশে মাদক কেনাবেচা ঠেকাতে শিক্ষকদের সঙ্গে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের সার্বক্ষণিক যোগাযোগ জরুরি।

গণমাধ্যমের ভূমিকা নিয়ে কথা বলেন ঢাকা মেইলের নির্বাহী সম্পাদক হারুন জামিল। তিনি উল্লেখ করেন, মাদকাসক্তি একটি চিকিৎসাযোগ্য সমস্যা। গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে কারবারি ও আসক্ত ব্যক্তির মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য বজায় রাখতে হবে, যাতে ভুক্তভোগীর স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সুযোগ নষ্ট না হয়। নতুন সরকার মাদকবিরোধী উদ্যোগ নিলেও তা এখনও কাঙ্ক্ষিত পর্যায়ে পৌঁছায়নি বলে তিনি মন্তব্য করেন। মানুষের হতাশা দূর করতে আত্মিক মূল্যবোধ, ধর্মীয় অনুশাসন ও মানবিকতার বিকাশের ওপর জোর দেন তিনি।

নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক কর্নেল (অবসরপ্রাপ্ত) কাজী শরীফ উদ্দিন বলেন, দৃশ্যমান খুচরা কারবারিদের ওপর অভিযান চালিয়ে মাদক বন্ধ করা যাবে না। মাদকের অর্থনৈতিক ও সাংগঠনিক কাঠামো উপড়ে ফেলতে হবে। প্রভাবশালী মহলের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থাকলে রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক পরিচয় বিবেচনা না করে নিরপেক্ষ তদন্ত চালাতে হবে। তিনি গোয়েন্দা তথ্যের আদান-প্রদান আরও বাড়ানোর সুপারিশ করেন।

ঢাকা জেলা প্রশাসনের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট জাবের মো. সোয়াইব জানান, নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হলেও শুধু অভিযান দিয়ে সমস্যার গোড়ায় পৌঁছানো যায় না। সাধারণ মানুষ প্রায়ই নিরাপত্তার ভয়ে তথ্য দিতে চান না। তাই তথ্যদাতার গোপনীয়তা নিশ্চিত করা জরুরি। এ লক্ষ্যে ঢাকা জেলা প্রশাসন ‍‍`হ্যালো ডিসি‍‍` নামে একটি নাগরিক সেবামূলক প্ল্যাটফর্ম গড়ে তুলেছে।

কন্টিনেন্টাল হসপিটালের মনোরোগ বিভাগের চিফ কনসালট্যান্ট ডা. এস এম কবির জুয়েল বলেন, কেবল ওষুধ দিয়ে মাদকাসক্তির দীর্ঘমেয়াদি নিরাময় সম্ভব নয়। চিকিৎসার সঙ্গে পরিবারকে সম্পৃক্ত করে মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সেলিং চালিয়ে যেতে হবে, যাতে রোগী পুনরায় মাদকে না জড়ান। তিনি দেশের নিরাময় কেন্দ্রগুলোর মান বৃদ্ধি, দক্ষ মনোরোগ বিশেষজ্ঞের সংখ্যা বাড়ানো এবং আসক্তদের প্রতি সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি ইতিবাচক করার আহ্বান জানান।