নভেম্বর ৩, ২০২৬, ১০:৫৬ পিএম
মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনে কেন শত শত কোটি ডলার ঢালছেন বিশ্বের শীর্ষ ধনী ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ী গোষ্ঠী, তা নিয়ে নতুন করে তুমুল বিতর্ক শুরু হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের ২০২৬ সালের এই মধ্যবর্তী নির্বাচন দেশটির রাজনৈতিক ইতিহাসে এযাবৎকালের সবচেয়ে ব্যয়বহুল নির্বাচনে পরিণত হতে যাচ্ছে। কেবল প্রার্থীদের পক্ষে প্রচারের বিজ্ঞাপনেই ব্যয় হতে পারে এক হাজার ১৬০ কোটি ডলার।
বিজ্ঞাপন ব্যয় পর্যবেক্ষণকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা অ্যাডইমপ্যাক্টের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৪ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনসহ অতীতের যেকোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতার চেয়ে এবার বিজ্ঞাপনের পেছনে অর্থের প্রবাহ বহুগুণ বেশি। নির্বাচনের মাঠে সবচেয়ে বড় অঙ্কের অর্থের জোগান দিচ্ছেন শীর্ষ ধনকুবের, করপোরেট প্রতিষ্ঠান ও বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন। তবে এসব অনুদানের বড় অংশই প্রার্থীদের অ্যাকাউন্টে সরাসরি যাচ্ছে না।
যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল নির্বাচন কমিশনের (এফইসি) নথিপত্র বিশ্লেষণ করে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল জাজিরা জানিয়েছে, এবারের নির্বাচন ঘিরে শীর্ষ ৫০ জন ব্যক্তি ও সংগঠন ইতিমধ্যে মোট ২৭৭ কোটি ডলার অনুদান দিয়েছে।
এই বিপুল তহবিলের মধ্যে রিপাবলিকানপন্থী অনুদানদাতারা দিয়েছেন ১৬৭ কোটি ডলার, যা মোট ব্যয়ের প্রায় ৬০ শতাংশ। অন্যদিকে ডেমোক্র্যাটপন্থীদের পকেটে গেছে ৮৩ কোটি ২০ লাখ ডলার বা প্রায় ৩০ শতাংশ। বাকি ২৬ কোটি ৪০ লাখ ডলার এসেছে দুই দলের প্রতি সমান সমর্থন রাখা মধ্যপন্থী এবং বিশেষ স্বার্থসংশ্লিষ্ট গোষ্ঠীগুলোর কাছ থেকে। এসব গোষ্ঠীর মধ্যে ক্রিপ্টোকারেন্সি ও বাজি ধরার ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক অন্যতম।
ব্যক্তি অনুদানদাতা হিসেবে সবাইকে ছাড়িয়ে গেছেন বিশ্বের শীর্ষ ধনী ইলন মাস্ক। টেসলা ও স্পেসএক্সের প্রধান নির্বাহী মাস্ক একাই দিয়েছেন ৪৪ কোটি ৬০ লাখ ডলার। রিপাবলিকানদের পক্ষে অন্য বড় দাতাদের মধ্যে আছেন পণ্য পরিবহন সরঞ্জাম তৈরির প্রতিষ্ঠান ইউলাইনের প্রতিষ্ঠাতা এলিজাবেথ ও রিচার্ড ইউহলিন। তারা দিয়েছেন ১৫ কোটি ডলার। এছাড়া সুসকেহানা ইন্টারন্যাশনাল গ্রুপের সহপ্রতিষ্ঠাতা জেফ ইয়াস ও তার স্ত্রী জেনিন ইয়াস দিয়েছেন ১১ কোটি ডলার।
ডেমোক্র্যাট শিবিরেও অর্থের অভাব নেই। এই পক্ষে বড় অনুদানদাতাদের শীর্ষে রয়েছেন ওপেন সোসাইটি ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা জর্জ সরোস। তিনি দিয়েছেন ১০ কোটি ২০ লাখ ডলার। নিউইয়র্কের সাবেক মেয়র মাইক ব্লুমবার্গ দিয়েছেন ৮ কোটি ৪০ লাখ ডলার এবং লিংকডইনের সহপ্রতিষ্ঠাতা রিড হফম্যান ও তার স্ত্রী মিশেল ই দিয়েছেন ৪ কোটি ১০ লাখ ডলার।
যুক্তরাষ্ট্রের বিদ্যমান নির্বাচনী আইনে একজন ব্যক্তি কোনো প্রার্থীকে সরাসরি সর্বোচ্চ তিন হাজার ৫০০ ডলার দিতে পারেন। অথচ ধনকুবেররা অনায়াসে শত শত মিলিয়ন ডলার ঢালছেন। এই আইনি ফাঁকফোকরের মূল ভিত্তি হলো সুপার পলিটিক্যাল অ্যাকশন কমিটি বা সংক্ষেপে সুপার প্যাক। ২০১০ সালে মার্কিন আদালতের দুটি ঐতিহাসিক রায়ের পর এই কাঠামোর জন্ম হয়। সুপার প্যাকগুলো প্রার্থীদের প্রচার শিবিরের সঙ্গে সরাসরি সমন্বয় না করে যেকোনো প্রার্থীর পক্ষে বা বিপক্ষে সীমাহীন অর্থ তুলতে ও খরচ করতে পারে।
সুপার প্যাকগুলোর অর্থদাতার নাম প্রকাশ করার নিয়ম থাকলেও ওয়ান নেশন বা মেজরিটি ফরোয়ার্ডের মতো রাজনৈতিক অলাভজনক সংস্থাগুলোর ক্ষেত্রে অর্থের মূল উৎস প্রকাশ বাধ্যতামূলক নয়। ফলে মূল তহবিলদাতার পরিচয় আড়ালেই থেকে যায়, যাকে বলা হয় `ডার্ক মানি` বা গোপন অর্থায়ন।
হার্ভার্ড ল স্কুলের অধ্যাপক লরেন্স লেসিগ মনে করেন, এই অর্থ সাধারণ ভোটারদের কাছে অন্ধকার থাকলেও নেতাদের কাছে তা সম্পূর্ণ দিনের আলোর মতো পরিষ্কার। তাঁর মতে, রাজনীতিকরা খুব ভালো করেই জানেন অর্থ ঠিক কোথা থেকে আসছে এবং তাদের কী করতে হবে।
সংগঠনগুলোর মধ্যেও তহবিল সরবরাহে তীব্র প্রতিযোগিতা দেখা গেছে। রিপাবলিকানদের পক্ষে ওয়ান নেশন দিয়েছে ১৩ কোটি ৩০ লাখ ডলার, আমেরিকান অ্যাকশন নেটওয়ার্ক দিয়েছে ৬ কোটি ৪৩ লাখ এবং আমেরিকান প্রসপারিটি অ্যালায়েন্স দিয়েছে ৫ কোটি ৭ লাখ ডলার। ডেমোক্র্যাটদের পক্ষে মেজরিটি ফরোয়ার্ড দিয়েছে ১০ কোটি ২০ লাখ, হাউস মেজরিটি ফরোয়ার্ড দিয়েছে ৯ কোটি ৩৭ লাখ এবং ইকোনমিক অপরচুনিটি ফান্ড দিয়েছে ৪ কোটি ১৫ লাখ ডলার।
অন্যদিকে নতুন করে প্রভাব বাড়িয়েছে ক্রিপ্টোকারেন্সি ও জুয়া কোম্পানিগুলো। সবচেয়ে বড় ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ কয়েনবেস দিয়েছে ৫ কোটি ৭৮ লাখ ডলার, রিপল দিয়েছে ৪ কোটি ৯৬ লাখ এবং ক্রিপ্টো ডটকমের মূল প্রতিষ্ঠান ফরিস ডিএএক্স দিয়েছে ৩ কোটি ৯০ লাখ ডলার। এছাড়া বহুজাতিক শিল্পগোষ্ঠী কোচ দিয়েছে ৪ কোটি ৬৮ লাখ ডলার ও স্পোর্টস বেটিং প্রতিষ্ঠান ড্রাফটকিংস দিয়েছে ৪ কোটি ৪ লাখ ডলার।
এবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে চারজন ব্যক্তি এককভাবে প্রত্যেকে ১০ কোটি ডলারের বেশি অর্থ দিয়েছেন। নির্বাচনী তহবিলের এমন ভয়াবহ কেন্দ্রীভবন সাধারণ ভোটাধিকারের জন্য অশনিসংকেত হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকরা।
অধ্যাপক লেসিগের পর্যবেক্ষণ, মোট ব্যয়ের চেয়ে সবচেয়ে বিপজ্জনক হলো কয়েকজন ধনীর হাতে সমগ্র নির্বাচনী প্রভাব কুক্ষিগত হওয়া। যাদের কোটি কোটি ডলার ঢালার সক্ষমতা নেই, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় তাদের কন্ঠস্বর দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন