নভেম্বর ৩, ২০২৬, ০৭:০০ পিএম
যুক্তরাষ্ট্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টি কংগ্রেসের এক বা উভয় কক্ষের নিয়ন্ত্রণ হারালে দ্বিতীয় মেয়াদে বড় ধরনের রাজনৈতিক ও আইনি বাধার মুখে পড়তে পারেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হাতছাড়া হলে ট্রাম্পের সাংবিধানিক পদ বা মূল নির্বাহী কর্তৃত্ব সরাসরি বাতিল হয়ে যাবে না।
তবে নতুন আইন প্রণয়ন, জাতীয় বাজেট বরাদ্দ, প্রশাসনিক ও বিচারিক নিয়োগ অনুমোদন এবং বহুল আলোচিত নির্বাহী নীতিগুলো মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়বে তাঁর সরকার।
মঙ্গলবার (৩ নভেম্বর) অনুষ্ঠিত মধ্যবর্তী নির্বাচনকে ট্রাম্প প্রশাসনের দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য অগ্নিপরীক্ষা হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।
কংগ্রেসে বিরোধী দল ডেমোক্রেটিক পার্টির আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হলে নির্বাহী সিদ্ধান্তের ওপর আইনসভার সরাসরি তদারকি ও তদন্তের পরিধি বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে।
যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা—যার নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদ এবং উচ্চকক্ষ সিনেট।
দুই কক্ষের যেকোনো একটির নিয়ন্ত্রণ হারানোর প্রশাসনিক ও সাংবিধানিক প্রভাব ভিন্ন ভিন্ন।
আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে উভয় কক্ষেই রিপাবলিকান পার্টির নিয়ন্ত্রণে ক্ষীণ ব্যবধানের সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। প্রতিনিধি পরিষদে রিপাবলিকানদের আসন ২১৮টি এবং ডেমোক্র্যাটদের আসন ২১৪টি। অপরদিকে সিনেটে রিপাবলিকানদের আসন সংখ্যা ৫৩টি এবং ডেমোক্র্যাটদের আসন ৪৭টি।
নির্বাচনে দলীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা হাতছাড়া হলে ট্রাম্পের সামনে প্রধান সাতটি সংকট মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে:
প্রথমত, ট্রাম্প প্রশাসনের বিরুদ্ধে সরকারি তদন্ত ও নিয়মিত নজরদারির পথ উন্মুক্ত হবে। প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ বিরোধী শিবিরে গেলে তারা বিভিন্ন স্থায়ী কমিটির সভাপতি পদে দায়িত্ব পাবেন। ফলে কমিটির ক্ষমতাবলে সরকারি ব্যয়, প্রশাসনিক নীতি ও ফেডারেল সংস্থাগুলোর অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম চুলচেরা বিশ্লেষণের সুযোগ সৃষ্টি হবে। হোয়াইট হাউসের শীর্ষ কর্মকর্তা ও মন্ত্রীদের শুনানিতে তলব এবং নথিপত্র প্রদর্শনে আইনি বাধ্যবাধকতা তৈরি করা যাবে।
দ্বিতীয়ত, প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে নতুন করে অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরুর সম্ভাব্য ঝুঁকি দেখা দেবে। মার্কিন সংবিধান মোতাবেক কোনো প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে অভিশংসনের আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের একক ক্ষমতা প্রতিনিধি পরিষদের। নিম্নকক্ষে সাধারণ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় অভিশংসন প্রস্তাব পাস হলেও সিনেটে দুই-তৃতীয়াংশ ভোট ছাড়া কাউকে পদ থেকে সরানো সম্ভব নয়। ফলে ট্রাম্পের পদ সরাসরি না গেলেও রাজনৈতিকভাবে তাঁকে চাপে রাখার হাতিয়ার পাবে বিরোধী পক্ষ।
তৃতীয়ত, সরকারের বাজেট পাস ও পরিচালন ব্যয় বরাদ্দ নিয়ে তীব্র অচলাবস্থা তৈরি হতে পারে। প্রতিরক্ষা খাতসহ অভ্যন্তরীণ নীতি বাস্তবায়নে তহবিলের অনুমোদন দেয় কংগ্রেস। ডেমোক্র্যাটরা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে শর্ত আরোপ কিংবা তহবিল আটকে দেওয়ার কৌশল গ্রহণ করতে পারে, যা ২০২৭ সালের সরকারি কার্যক্রমে আংশিক অর্থায়ন সংকট বা সরকারের শাটডাউন ডেকে আনতে পারে।
চতুর্থত, সুপ্রিম কোর্ট ও ফেডারেল আদালতের শূন্য পদে বিচারক এবং গুরুত্বপূর্ণ সরকারি পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে বড় জটিলতা দেখা দিতে পারে। মার্কিন সংবিধানে এসব নিয়োগের চূড়ান্ত অনুমোদন দিতে হয় সিনেটকে। সিনেটে ডেমোক্র্যাটদের নিয়ন্ত্রণ এলে বিচার বিভাগীয় মনোনয়ন দীর্ঘদিনের জন্য আটকে যেতে পারে।
পঞ্চমত, রাজনৈতিক অগ্রাধিকারভিত্তিক নতুন আইন পাস প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। যেকোনো বিল আইনে রূপান্তর করতে উভয় কক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ অনুমোদন আবশ্যক। তবে প্রেসিডেন্টের হাতে থাকা সাংবিধানিক ভেটো ক্ষমতা বহাল থাকবে, যা বাতিল করতে কংগ্রেসের দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের যৌথ সমর্থন প্রয়োজন হবে।
ষষ্ঠত, শুল্কনীতি, অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক পররাষ্ট্রনীতির ক্ষেত্রে ট্রাম্পের ওপর চাপ উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বাড়বে। যদিও পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষার বহু সিদ্ধান্ত নির্বাহী ক্ষমতাবলে প্রেসিডেন্ট একাই নিতে পারেন, তবু সংশ্লিষ্ট আর্থিক বরাদ্দ ও নতুন আইনের মাধ্যমে কংগ্রেস এতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে পারে।
সপ্তমত, দ্বিতীয় মেয়াদের বাকি দুই বছর তীব্র রাজনৈতিক সংঘাত ও হোয়াইট হাউস-ক্যাপিটল হিল অচলাবস্থার মধ্য দিয়ে অতিবাহিত হতে পারে।
ব্রুকিংস ইনস্টিটিউশনের বিশ্লেষক উইলিয়াম গ্যালস্টনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, প্রতিনিধি পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে বিরোধী ডেমোক্র্যাটরা প্রেসিডেন্টের প্রতিটি পদক্ষেপকে আইনসভার কড়া নজরদারির আওতায় নিয়ে আসবে। এতে নির্বাহী প্রশাসন ও আইনসভার মধ্যকার বিরোধ ঐতিহাসিক মাত্রায় পৌঁছাতে পারে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন