নভেম্বর ৩, ২০২৬, ০২:৪৩ পিএম
ইরান সংকট নিরসনে কোন কৌশল বেছে নেবেন, তা নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সামনে তিনটি আলাদা বিকল্প পথ উন্মুক্ত হয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের এক বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের বরাতে জানা গেছে, মার্কিন প্রশাসনের প্রভাবশালী শীর্ষ উপদেষ্টারা এ বিষয়ে তিনটি পরস্পরবিরোধী অবস্থানে বিভক্ত হয়ে পড়েছেন।
একটি পক্ষ চাইছে সমঝোতার মাধ্যমে বিরোধের ইতি টানতে, অন্য পক্ষ চাপ দিচ্ছে সরাসরি পুনরায় পুরোদমে যুদ্ধ শুরুর জন্য। মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত মধ্যবর্তী নির্বাচন শেষ হওয়ার পরই ট্রাম্প এ বিষয়ে তার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন বলে আশা করা হচ্ছে। প্রথম পথটির পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন খোদ মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স এবং মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ। তারা কূটনৈতিক চ্যানেলে আলোচনার মাধ্যমে একটি টেকসই মীমাংসায় পৌঁছে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতের অবসান চান।
দ্বিতীয় কৌশলটির পক্ষে জোর ওকালতি করছেন ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এবং মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। তাদের দাবি, ইরানের পারমাণবিক ও সামরিক অবকাঠামো পুরোপুরি ধ্বংস করতে অবিলম্বে নতুন করে সামরিক অভিযান শুরু করা প্রয়োজন।
তৃতীয় পথটি মূলত একটি মধ্যবর্তী অবস্থান। মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও, অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট এবং সিআইএ প্রধান জন র্যাটক্লিফ এই অবস্থানের পক্ষে মত দিয়েছেন। তারা ওয়াশিংটনকে `যুদ্ধও নয়, চুক্তিও নয়` এমন একটি দীর্ঘস্থায়ী ভারসাম্য ধরে রাখার পরামর্শ দিয়েছেন। তাদের প্রস্তাব হলো, ইরানের ওপর ক্রমাগত অর্থনৈতিক অবরোধ ও আর্থিক চাপ বহাল রাখতে হবে, যাতে তেহরান নিজেই একপর্যায়ে নমনীয় হয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সব শর্ত মেনে নিতে বাধ্য হয়।
সিআইএ প্রধান জন র্যাটক্লিফ ট্রাম্পকে কৌশলগত যুক্তি দিয়ে জানিয়েছেন, এ ধরনের অর্থনৈতিক শ্বাসরোধ অব্যাহত থাকলে ইরানের ভেতরে অভ্যন্তরীণ অসন্তোষ বহুগুণ বেড়ে যাবে। একপর্যায়ে ক্ষুব্ধ সাধারণ জনগণ রাজপথে নেমে সরকারের বিরুদ্ধে গণবিদ্রোহ শুরু করতে পারে। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকরাও দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছেন, সামরিক বিজয়ের চেয়ে অভ্যন্তরীণ অভ্যুত্থান উসকে দিয়ে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের পতন ঘটানোই ছিল ট্রাম্পের দীর্ঘমেয়াদি হিসাব।
তবে ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজে শেষ পর্যন্ত কোন বিকল্পটি বেছে নেবেন, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
বিগত কয়েক সপ্তাহে তিনি প্রকাশ্য বক্তব্যে বারবার ইরানে বিধ্বংসী হামলার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্যের জলসীমায় বাড়তি মার্কিন সৈন্য ও নৌবাহিনীর যুদ্ধজাহাজ মোতায়েন করেছেন। কিন্তু সমান্তরালভাবে তিনি কূটনৈতিক আলোচনার তদারকির দায়িত্ব অর্পণ করেছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট ভ্যান্সের ওপর।
এদিকে আঞ্চলিক সংকট এড়াতে কাতার ও পাকিস্তানের মধ্যস্থতাকারীরা ওয়াশিংটন ও তেহরানকে সরাসরি আলোচনার টেবিলে বসাতে জোর কূটনৈতিক তৎপরতা চালাচ্ছেন।
অ্যাক্সিওসের তথ্যমতে, কাতারের মধ্যস্থতাকারীরা ইতিমধ্যে একটি সমঝোতা রূপরেখা বা খসড়া চুক্তি তৈরি করেছেন। এতে উভয় পক্ষের মধ্যে দূরত্ব কমাতে তিন দিনের মধ্যে কয়েকটি বাস্তবমুখী আস্থা বৃদ্ধির পদক্ষেপের প্রস্তাব রাখা হয়েছে। লক্ষ্য হলো দুই বৈরী দেশের মধ্যকার সরাসরি আলোচনা পুনরায় চালু করা। মধ্যস্থতাকারীরা বর্তমানে এই খসড়ার ওপর উভয় দেশের আনুষ্ঠানিক জবাবের অপেক্ষায় রয়েছেন।
কূটনৈতিক এই আলোচনার মধ্যেই সোমবার মার্কিন বাহিনী ইরানের কৌশলগত কেশম দ্বীপে পুনরায় সামরিক আঘাত হেনেছে, যা বিগত কয়েক সপ্তাহ ধরে চলা সীমিত মাত্রার মার্কিন অভিযানের ধারাবাহিক অংশ।
যুদ্ধাবস্থার কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্রে জীবনযাত্রার ব্যয় ও নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে। মার্কিন সাধারণ ভোটাররা এই অর্থনৈতিক মূল্যস্ফীতির জন্য সরাসরি প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নীতিকে দায়ী করছেন। এমন পরিস্থিতিতে আসন্ন নির্বাচনের কথা বিবেচনা করে বেশ কয়েকজন রিপাবলিকান প্রার্থী ও দলীয় ভোটার তার আক্রমণাত্মক অবস্থান থেকে দূরত্ব বজায় রাখছেন।
উপদেষ্টাদের নানামুখী মতামতের মুখে নিজের অবস্থান তুলে ধরে ট্রাম্প জানিয়েছেন, সিদ্ধান্ত গ্রহণে তার কোনো তাড়া নেই।
অ্যাক্সিওসকে দেওয়া বক্তব্যে ট্রাম্প বলেন, "এভাবে হোক বা ওভাবে, আমরা কিছু একটা করব। তবে কোনো তাড়া নেই। আমরা ওদের আর্থিকভাবে পঙ্গু করে দিয়েছি। ওদের টাকা নেই, গ্যাসোলিন নেই। ওদের মানুষ এসবে খুব ক্লান্ত হয়ে পড়ছে।"
নির্বাচনের আগে নিজের মূল্যায়নে তিনি উল্লেখ করেন, কৌশলগত বাস্তবতায় তেহরানের পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে সমঝোতা করার তাড়া কম দেখা গেলেও তাদের ভেতরে চুক্তি করার তাগিদ আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে তীব্র হয়ে উঠেছে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন