নভেম্বর ৩, ২০২৬, ১০:২১ এএম
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে আজ মঙ্গলবার। কংগ্রেসের দুই কক্ষের শত শত প্রতিনিধি নির্বাচনে ভোট দিচ্ছেন দেশটির নাগরিকরা। নির্বাচনি প্রচার ঘিরে ইতোমধ্যে বাহ্যিক হস্তক্ষেপের আশঙ্কা এবং দলীয় কোন্দল নিয়ে চরম রাজনৈতিক উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষক ও বিশ্লেষকরা এবারের নির্বাচনকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের মেয়াদের ওপর সরাসরি গণভোট হিসেবে চিহ্নিত করছেন। কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ শেষ পর্যন্ত কোন দলের হাতে থাকবে, তার ওপর নির্ভর করছে ট্রাম্প তার দ্বিতীয় মেয়াদের বাকি দুই বছরে কতটা নির্বাহী ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারবেন। একই সাথে এই নির্বাচনের সামগ্রিক ফলাফল আগামী ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনেও গভীর প্রভাব ফেলবে।
মধ্যবর্তী নির্বাচন মূলত মার্কিন প্রেসিডেন্টের চার বছর মেয়াদের মাঝামাঝি সময়ে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। এই প্রক্রিয়ায় আইনসভার উভয় কক্ষ—প্রতিনিধি পরিষদ এবং সিনেটের সদস্য নির্বাচন করেন ভোটাররা। কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের সব কটিতে এবং ১০০ সদস্যের সিনেটের ৩৫টি আসনে ভোট নেওয়া হচ্ছে। এর বাইরে দেশটির ৫০টি অঙ্গরাজ্যের মধ্যে ৩৬টিতে চার বছর মেয়াদের জন্য নতুন গভর্নর বেছে নিচ্ছেন ভোটাররা।
বর্তমানে আইনসভার উভয় কক্ষেই সামান্য ব্যবধানে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রেখেছে রিপাবলিকান পার্টি, যা গ্র্যান্ড ওল্ড পার্টি বা জিওপি নামে পরিচিত। ফলে উভয় দলের মধ্যে আসন ধরে রাখা ও ছিনিয়ে নেওয়ার তুমুল প্রতিযোগিতা দেখা যাচ্ছে। মার্কিন রাজনীতির চিরাচরিত রীতি অনুযায়ী, ক্ষমতাসীন প্রেসিডেন্টের দল সাধারণত মধ্যবর্তী নির্বাচনে আসন হারায় এবং বিরোধী দল আসন বৃদ্ধির সুবিধা পায়। সেই ঐতিহাসিক সমীকরণে ভর করে এবার ডেমোক্র্যাটদের সামনে কংগ্রেসে পুনরায় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার সুযোগ তৈরি হয়েছে। কংগ্রেসের অনুমোদিত কেন্দ্রীয় আইন দেশটির কোটি কোটি নাগরিকের দৈনন্দিন জীবনে কার্যকর প্রভাব ফেলে। ডেমোক্র্যাটরা প্রতিনিধি পরিষদের দখল নিতে পারলে ট্রাম্প প্রশাসনের বিভিন্ন নীতি ও কৌশল বাস্তবায়নে কঠোর বাধার মুখে পড়তে হবে।
প্রতিনিধি পরিষদের ৪৩৫টি আসনের মধ্যে মাত্র ৪০টি আসনে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। কক্ষটির নিয়ন্ত্রণ নিজের অনুকূলে আনতে বর্তমান আসনসংখ্যার বাইরে ডেমোক্র্যাটদের নিট তিনটি আসন বৃদ্ধি করতে হবে। ফলে সামান্য কয়েকটি আসনের ফলাফলই নির্ধারণ করবে কক্ষটির সংখ্যাগরিষ্ঠতা।
অন্যদিকে উচ্চকক্ষ সিনেটের হিসাব অনেকটাই আলাদা। ৩৫টি নির্বাচনি আসনের মধ্যে প্রায় ১২টিতে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের পূর্বাভাস রয়েছে, যার বাকি আসনগুলো দুই দলের সুনির্দিষ্ট শক্ত ঘাঁটিতে অবস্থিত। বর্তমানে সিনেটে রিপাবলিকানদের আসন ৫৩টি, বিপরীতে ডেমোক্র্যাট ও সমমনা স্বতন্ত্র সদস্যদের সম্মিলিত আসন ৪৭টি। সিনেটের সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিশ্চিত করতে ডেমোক্র্যাটদের নিট চারটি আসন বাড়িয়ে ৫১-তে পৌঁছাতে হবে।
রিপাবলিকানরা সর্বোচ্চ তিনটি আসন হারালেও নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে পারবে। কারণ সিনেটে দুই দলের আসন সংখ্যা ৫০-৫০ হলে আইন অনুযায়ী ভোটের অচলাবস্থা নিরসনে টাইব্রেকিং ভোট প্রদান করেন ভাইস প্রেসিডেন্ট। বর্তমানে এই দায়িত্বে রয়েছেন রিপাবলিকান নেতা জেডি ভ্যান্স। এই জটিল সমীকরণের কারণে নিম্নকক্ষের তুলনায় সিনেটের কর্তৃত্ব ফিরে পাওয়া ডেমোক্র্যাটদের জন্য অপেক্ষাকৃত কঠিন।
নির্বাচনি বিশ্লেষক ও পূর্বাভাসমূলক রাজনৈতিক বাজারগুলোর একাংশের ধারণা, প্রতিনিধি পরিষদের নিয়ন্ত্রণ ডেমোক্র্যাটদের হাতে চলে যেতে পারে। তেমনটি ঘটলে ট্রাম্পের রাজনৈতিক কর্মসূচি কার্যকরের পথ রুদ্ধ হবে। সেই সঙ্গে প্রশাসনের ওপর কংগ্রেসের স্থায়ী নজরদারি বৃদ্ধি পাবে, যার মধ্যে তদন্ত, সমন জারি এবং শুনানির সংখ্যা অনেক বেড়ে যাবে। শক্ত সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলে ট্রাম্পকে পুনরায় অভিশংসন প্রক্রিয়ার মুখেও ফেলতে পারেন ডেমোক্র্যাটরা।
গত সাধারণ নির্বাচনের পর দেশটিতে নির্বাচনি এলাকার মানচিত্রে বড় ধরনের রূপান্তর এসেছে। ১০টি অঙ্গরাজ্যে কংগ্রেসের নির্বাচনি এলাকার সীমানা নতুন করে নির্ধারণ করা হয়েছে, যাকে রাজনৈতিক পরিভাষায় রিডিস্ট্রিক্টিং বলা হয়। সাধারণত প্রতি দশ বছর পরপর আদমশুমারির পর এই সীমানা পুনর্বিন্যাস করা হলেও রিপাবলিকানদের সুবিধা দিতে টেক্সাস অঙ্গরাজ্যে নতুন মানচিত্র তৈরি করা হয়, যা পরবর্তীতে অন্যান্য অঙ্গরাজ্যেও ছড়িয়ে পড়ে। ফলে রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব ও ভোটের অধিকার প্রশ্নে বিভিন্ন রাজ্যে ব্যাপক বিরোধ দেখা দেয়।
কুক পলিটিক্যাল রিপোর্টের পরিসংখ্যান তুলে ধরে দিনাজপুর টিভি ডট কম নিশ্চিত করেছে, এই সীমানা পুনর্বিন্যাসের কারণে রিপাবলিকানরা নিট পাঁচটি অতিরিক্ত আসনের সুবিধা নিজেদের পক্ষে টেনে নিতে পেরেছে। এর ফলে ভোট গ্রহণের আগেই দলটি কিছুটা কৌশলগত অগ্রগামী অবস্থানে রয়েছে।
এর পাশাপাশি ফেডারেল আদালত ও সুপ্রিম কোর্টের কিছু বিতর্কিত রায়ের কারণে ভোটাধিকার আইন দুর্বল হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন নাগরিক অধিকারকর্মীরা। ঐতিহাসিকভাবে জাতিগত বৈষম্য দূর করতে এই আইনটি বলবৎ ছিল। বিশেষ করে ভোটারদের প্রাথমিক যোগ্যতা এবং ডাকযোগে ব্যালট পাঠানোর বৈধতা নিয়ে এবারের নির্বাচনে গভীর বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
ব্যালটে কোনো প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হিসেবে ট্রাম্পের নাম না থাকলেও এবারের নির্বাচন মূলত তাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছে। জাতীয় পর্যায়ের জনমত জরিপগুলোতে ট্রাম্পের জনপ্রিয়তা সর্বনিম্ন পর্যায়ে থাকা সত্ত্বেও রিপাবলিকানদের প্রধান রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে তিনি নিজেই নিজেকে মাঠে উপস্থাপন করছেন। ট্রাম্প ও তার উপদেষ্টাদের দাবি, তার চরম সমর্থকগোষ্ঠী `মাগা` ভোটারদের মাঠে নামাতে তিনি ছাড়া বিকল্প কোনো নেতৃত্ব নেই, যা মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোটকেন্দ্রে কম উপস্থিতির ঐতিহাসিক ঝুঁকি মোকাবিলা করতে পারে।
গত সেপ্টেম্বরের শুরুতে রিপাবলিকানদের মধ্যবর্তী নির্বাচন সংক্রান্ত সম্মেলনে প্রধান বক্তা ছিলেন ট্রাম্প। `ট্রাম্প-এ-পালুজা` নাম দেওয়া ওই সমাবেশের মাধ্যমে নির্বাচনি প্রচারের একক কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হন তিনি। ভোটারদের উদ্দেশে তিনি স্পষ্টভাবে বার্তা দিয়েছেন যে ব্যালটে তার ব্যক্তিগত নাম না থাকলেও তার পুরো প্রশাসন, রাজনৈতিক উত্তরাধিকার এবং ভবিষ্যৎ নীতিমালার টিকে থাকা এই ফলাফলের ওপরই নির্ভর করছে। দেশজুড়ে বিভিন্ন আসনের দলীয় প্রার্থীদের তিনি প্রকাশ্যে সমর্থন জুগিয়েছেন, যা সমর্থকদের প্রভাবিত করছে। বিপরীতে ডেমোক্র্যাট শিবির ট্রাম্প ও তার নীতিকে প্রধান লক্ষ্যবস্তু বানিয়ে প্রচারণা সাজিয়েছে, যাতে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতাকে কংগ্রেসের মাধ্যমে জবাবদিহির আওতায় আনা যায়।
এই নির্বাচনের ফলাফল আগামী ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের গতিপথ চূড়ান্ত করবে। ডেমোক্র্যাটরা বড় জয় পেলে তা পরবর্তী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের আগে তাদের রাজনৈতিক অবস্থান সংহত করবে। অপরদিকে রিপাবলিকানরা উভয় কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রাখতে সক্ষম হলে ট্রাম্প প্রশাসন তাদের কঠোর রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে আরও বেপরোয়া হয়ে উঠবে। উভয় দলের যে পক্ষই বিজয়ী হোক না কেন, জনগণের ভোট দেওয়ার প্রবণতা ও ভবিষ্যৎ দলীয় প্রার্থীদের সক্ষমতা এই মধ্যবর্তী নির্বাচনের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে। একই সঙ্গে ৩৬টি অঙ্গরাজ্যের গভর্নর নির্বাচনের ফল দুই দলের ভবিষ্যৎ প্রেসিডেন্ট প্রার্থীদের জাতীয় গ্রহণযোগ্যতা যাচাইয়ের বড় মঞ্চ হিসেবে কাজ করবে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন