শুক্রবার, ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

তিন বৃহৎ শক্তির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক চায় সরকার

জাতীয় ডেস্ক

জুন ২০, ২০২৬, ০৮:১৯ এএম

তিন বৃহৎ শক্তির সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক চায় সরকার

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ছয় দিনের প্রথম বিদেশ সফর আগামীকাল রোববার থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হতে যাচ্ছে। নতুন সরকার গঠনের পর এটিই সরকারপ্রধানের প্রথম দ্বিপক্ষীয় আন্তর্জাতিক সফর হতে চলেছে। একবিংশ শতাব্দীর জটিল ভূরাজনীতিতে নিজেদের অবস্থান সুদৃঢ় করতে এবং তিন বৃহৎ শক্তির সাথে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখতেই এই সফরসূচি নির্ধারণ করা হয়েছে।বেইজিং সফরে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকে বসবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।

কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানিয়েছে যে কোনো নির্দিষ্ট ব্লকে বা জোটে আটকে না থেকে সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব ও কারও সঙ্গে বৈরিতা নয়—এই নীতির এক আধুনিক ও বাস্তবমুখী প্রয়োগ ঘটাতে চলেছে নতুন গণতান্ত্রিক সরকার। সফরসূচি অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী আগামী ২১ ও ২২ জুন মালয়েশিয়ায় অবস্থান করবেন এবং এরপর ২৩ থেকে ২৬ জুন পর্যন্ত চীনে সরকারি সফর সম্পন্ন করবেন। 

দীর্ঘ প্রায় দেড় যুগ পর দেশের পররাষ্ট্রনীতিতে মেরুদণ্ড সোজা রেখে সব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক এগিয়ে নেওয়ার এই কৌশলী পদক্ষেপকে অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। সরকারের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ জানিয়েছেন যে জনগণের ম্যান্ডেট নিয়ে গঠিত নতুন সরকারের পররাষ্ট্রনীতি হবে বাংলাদেশ ফার্স্ট যেখানে প্রতিটি সিদ্ধান্তে দেশের জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

উল্লেখ্য যে দীর্ঘ ১৭ বছর পর গত ১২ ফেব্রুয়ারি দেশে অবাধ, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ক্যারিশম্যাটিক নেতৃত্বে দলটি এককভাবে ২১৩টি আসনে বিজয়ী হয়ে দুই দশক পর রাষ্ট্রক্ষমতায় ফিরে আসে। এরপর গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বিকেলে জাতীয় সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজায় নতুন মন্ত্রিসভার সদস্যদের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে গঠিত এই ৫০ সদস্যবিশিষ্ট মন্ত্রিসভায় ১৬ জন নতুন পূর্ণ মন্ত্রী এবং ২৪ জন একেবারেই নতুন মুখের প্রতিমন্ত্রী স্থান পেয়েছেন।

মালয়েশিয়া ও চীনের এই ছয় দিনের ব্যস্ত সফরে বাংলাদেশের স্বার্থের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত মোট ১৩টি গুরুত্বপূর্ণ সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হতে পারে। এর মধ্যে কুয়ালালামপুরে জনশক্তি রপ্তানিসহ ৩টি এবং বেইজিংয়ে অবকাঠামো, জ্বালানি, শিল্প পার্ক, প্রযুক্তি স্থানান্তর ও অর্থায়নের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে ১০টি সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার কথা রয়েছে। আগামীকাল রোববার দুপুরে একটি বিশেষ ফ্লাইটে প্রধানমন্ত্রী মালয়েশিয়ার উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করবেন এবং সোমবার সেখানে গুরুত্বপূর্ণ করপোরেট বৈঠক শেষে বেইজিংয়ের উদ্দেশে রওনা দেবেন। 

চীনের উপকূলীয় বন্দরনগরী দালিয়ানে আগামী ২৩ জুন বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে তাঁর বিশেষ বৈঠক নির্ধারিত রয়েছে। এরপর আগামী ২৪ জুন ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ১৭তম বার্ষিক সভায় অংশ নিয়ে তিনি বিশ্ব অর্থনীতি, বিনিয়োগ প্রবাহ, সবুজ অর্থনীতি এবং জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরবেন।এই সফরে চীনের বৃহৎ অবকাঠামো ও শিল্প খাতের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান চায়না রেলওয়ে কনস্ট্রাকশন করপোরেশন, চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশন এবং চায়না মেশিনারি ইঞ্জিনিয়ারিং করপোরেশনের সঙ্গে বিশেষ আলোচনা হবে। 

সেখানে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ রেলপথ, সেতু, বিদ্যুৎ এবং শিল্পায়ন প্রকল্পে নতুন বিনিয়োগ নিয়ে ফলপ্রসূ আলোচনার সম্ভাবনা রয়েছে। কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন যে বেইজিং সফর সফলভাবে সমাপ্ত করার পরপরই প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান প্রতিবেশী দেশ ভারত সফরে যেতে পারেন। এরপর জাপান কিংবা তুরস্কসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ মিত্র দেশগুলোতেও দ্বিপক্ষীয় সফরের পরিকল্পনা রয়েছে যা কোনো একক পরাশক্তির দিকে ঝুঁকে না থাকার স্পষ্ট বার্তা বহন করে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান জানিয়েছেন যে প্রত্যেক দেশই প্রথমে নিজেদের জাতীয় স্বার্থনীতি ঠিক করে দ্বিপক্ষীয় আলোচনা পরিচালনা করে এবং এই সফরের সঙ্গে ভিন্ন কোনো ভূরাজনৈতিক প্রভাবের সম্পর্ক নেই। অন্যদিকে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের পলিটিক্যাল স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. সাহাবুল হক সাবু বলেন যে প্রথম সফরে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র বাচীনের মতো পরাশক্তিকে বেছে না নিয়ে মালয়েশিয়াকে প্রাধান্য দেওয়া বাংলাদেশের এক চমৎকার ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনৈতিক অবস্থানের ইঙ্গিত দেয়। 

তিনি আরও উল্লেখ করেন যে বিএনপি সরকার তাদের আদর্শিক অবস্থান ও অর্থনৈতিক স্বার্থের মধ্যে এক সুষম সমন্বয় ঘটিয়ে বহুমাত্রিক পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করতে চায় যেখানে জাতীয় অর্থনৈতিক উন্নয়নই প্রধান অগ্রাধিকার পাবে। পশ্চিমা বিশ্বের সাথে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য বৃদ্ধি, চীনের বিনিয়োগ এবং প্রতিবেশী ভারতের সাথে অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন ও সীমান্ত সুরক্ষার মতো সংবেদনশীল ইস্যুতে গঠনমূলক আলোচনার মাধ্যমেই এই নতুন কূটনীতি এগিয়ে যাবে।