সেপ্টেম্বর ২১, ২০২৬, ১২:৫৯ পিএম
পরিকল্পিত, আধুনিক ও নাগরিকবান্ধব নগরী গড়ে তোলার লক্ষ্যে বড় পরিসরের অবকাঠামোগত উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ সামনে রেখে কার্যক্রম এগিয়ে নিচ্ছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন (ডিএসসিসি)। আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় চলমান ও প্রক্রিয়াধীন উদ্যোগ মিলিয়ে মোট এক হাজার ৭৪ কোটি আট লাখ টাকার উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের সমন্বিত মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে সংস্থাটি। সড়ক নেটওয়ার্ক থেকে শুরু করে ড্রেনেজ ব্যবস্থা, ফুটপাত সংস্কার, বেদখল খাল পুনরুদ্ধার, আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তিনির্ভর পার্কিং, সামাজিক অনুষ্ঠান কেন্দ্র ও বিনোদন অবকাঠামোসহ নগরবাসীর নাগরিক জীবনের সাথে সরাসরি সম্পৃক্ত প্রতিটি প্রধান খাতকে এই উন্নয়ন কর্মপরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালাম জানিয়েছেন, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট প্রপোজাল বা ডিপিপিভুক্ত চলমান সরকারি প্রকল্পের জন্য ৫৫৪ কোটি ৮৪ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রক্রিয়াধীন ডিপিপিভুক্ত সরকারি প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে আরও ৫১৯ কোটি ২৪ লাখ টাকা। এর ফলে দুই পর্যায়ের প্রকল্প মিলিয়ে দক্ষিণ ঢাকার সামগ্রিক অবকাঠামো ও নাগরিক সেবার আধুনিকায়নে এক হাজার কোটি টাকারও বেশি সরকারি উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়নের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ডিএসসিসি প্রশাসক জানান, এই সামগ্রিক উন্নয়ন মহাপরিকল্পনার মূল কেন্দ্রে রাখা হয়েছে দক্ষিণ ঢাকার যোগাযোগব্যবস্থাকে কার্যকরভাবে গতিশীল করার উদ্যোগ।
ইনার সার্কুলার রিং রোডের আওতাধীন বেড়িবাঁধ রায়েরবাজার দুই নম্বর গেট থেকে লোহার ব্রিজ পর্যন্ত সংযোগ সড়কের উন্নয়ন প্রকল্পে সর্বোচ্চ ২৩৬ কোটি ৪৮ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ এই সড়কের সংস্কার ও উন্নয়ন কাজ শেষ হলে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের যোগাযোগে দীর্ঘদিনের স্থবিরতা দূর হবে। পাশাপাশি রাজধানীর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সাথে শহরের অন্যান্য অংশের সরাসরি সড়ক যোগাযোগ আরও সহজ ও নির্বিঘ্ন হবে। দক্ষিণ ঢাকার পরিবেশ উন্নয়ন ও দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা নিরসনেও বড় অঙ্কের আর্থিক বরাদ্দ রাখা হয়েছে।
খাল পুনরুদ্ধার, ব্যাপক সংস্কার ও নান্দনিক পরিবেশ সৃষ্টি সংক্রান্ত প্রকল্পে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১৫৩ কোটি ৮৬ লাখ টাকা। এই উদ্যোগের মাধ্যমে নগরীর বিভিন্ন খালের স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি খালের দুই পাড় সাজিয়ে নাগরিকদের জন্য উন্মুক্ত ও নির্মল পরিবেশ গড়ে তোলা হবে। এর ফলে শহরের প্রাকৃতিক জলাধারগুলো সুরক্ষা পাবে এবং বর্ষা মৌসুমে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা কার্যকর রাখা সম্ভব হবে।
নগরবাসীর পারিবারিক বিনোদনের সুযোগ প্রসারে হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী শিশুপার্ক আধুনিকায়ন প্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৯৬ কোটি টাকা। রাজধানী ঢাকার দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক ও পরিচিত এই বিনোদনকেন্দ্রের অবকাঠামো সম্পূর্ণ নতুন করে সাজানোর মাধ্যমে শিশু ও কিশোরদের জন্য আকর্ষণীয় বিনোদনের পরিমণ্ডল তৈরি হবে। আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনার অপরিহার্য শর্ত হিসেবে বর্জ্য অপসারণ ও সড়ক রক্ষণাবেক্ষণকে বিশেষ গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করছে ডিএসসিসি।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন এলাকায় গৃহস্থালি ও বাণিজ্যিক বর্জ্য অপসারণ ও আধুনিক ব্যবস্থাপনা, সড়ক সংস্কারে উন্নত ভারী যন্ত্রপাতি সংগ্রহ এবং মেকানাইজড পার্কিং ব্যবস্থা স্থাপনের মাধ্যমে যানজট নিরসন প্রকল্পে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩৬ কোটি টাকা। এর মাধ্যমে বর্জ্য সংগ্রহের সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলোতে আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর পার্কিং সুবিধা তৈরি করে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় দৃশ্যমান অগ্রগতি অর্জনের পরিকল্পনা রয়েছে।
নাগরিকদের সামাজিক ও পারিবারিক আচার-অনুষ্ঠান পালনের সুবিধার্থে অবকাঠামো উন্নয়নের উদ্যোগও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। কমিউনিটি সেন্টার নির্মাণ প্রকল্পের প্রথম সংশোধিত পর্যায়ে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩২ কোটি ৫০ লাখ টাকা। এই বরাদ্দের মাধ্যমে বিভিন্ন ওয়ার্ডে উন্নত সুবিধাসম্পন্ন কমিউনিটি সেন্টার সম্প্রসারণের আশা প্রকাশ করেছেন ডিএসসিসি প্রশাসক। চলমান প্রকল্পের পাশাপাশি নতুন উন্নয়ন পরিকল্পনাতেও উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগের সুযোগ রাখা হয়েছে। সংস্থাটির অঞ্চল-২, অঞ্চল-৪ এবং অঞ্চল-৭-এর আওতাধীন ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা, নর্দমা ও ফুটপাতের টেকসই উন্নয়ন কাজে ১০৯ কোটি ২৪ লাখ টাকা বরাদ্দ নির্ধারণ করা হয়েছে। একইভাবে অঞ্চল-৩-এর আওতাধীন ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা ও নর্দমা উন্নয়ন কার্যক্রমে রাখা হয়েছে ২০ কোটি টাকা।
দক্ষিণ ঢাকার নতুন যুক্ত হওয়া সম্প্রসারিত এলাকাগুলোর আধুনিকায়নে বিশেষ নজর দিয়েছে সিটি কর্পোরেশন। ডিএসসিসির অন্তর্ভুক্ত নতুন পাঁচটি অঞ্চলের ১৮টি ওয়ার্ডের সড়ক অবকাঠামো ও টেকসই ড্রেনেজ ব্যবস্থার সার্বিক উন্নয়ন প্রকল্পে ১৯০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। অন্তর্ভুক্ত হওয়া এই নতুন এলাকাগুলোকে পরিকল্পিত আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনার আওতায় এনে নাগরিক সুবিধা দ্রুত বৃদ্ধির পথ সুগম করা হচ্ছে। এ ছাড়া ডিএসসিসির ছয়টি সামাজিক অনুষ্ঠান কেন্দ্রের সার্বিক সংস্কার, উন্নয়ন ও আধুনিকায়ন প্রকল্পে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২০ কোটি টাকা। এই সংস্কারকাজ শেষ হলে নগরবাসীর সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য উপযুক্ত ও পরিচ্ছন্ন পরিবেশ তৈরি হবে।
রাজধানীর প্রধান সড়কগুলোর টেকসই সংস্কারেও বড় অঙ্কের বরাদ্দ নিশ্চিত করা হয়েছে। দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের আওতাধীন প্রধান সড়কগুলোর ক্ষতিগ্রস্ত রাস্তা, ড্রেনেজ নর্দমা ও পথচারীদের হাঁটার ফুটপাত সংস্কার ও উন্নয়নে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ১৮০ কোটি টাকা। এই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রধান করিডোরগুলোর যানবাহন চলাচল উন্নত করার পাশাপাশি পথচারীদের নিরাপদ চলাচলের ফুটপাত ও বৃষ্টির পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
প্রশাসক বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আবদুস সালামের মতে, এসব প্রকল্পের মাধ্যমে দক্ষিণ ঢাকার উন্নয়নকে শুধু প্রচলিত রাস্তাঘাট সংস্কারের গণ্ডির মধ্যে আটকে রাখা হয়নি। বরং সার্বিক যোগাযোগ, পরিবেশ সুরক্ষা, পানি নিষ্কাশন, বর্জ্য অপসারণ, পরিকল্পিত পার্কিং, বিনোদন এবং সামাজিক সুযোগ-সুবিধাকে একটি একক ও সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে নিয়ে আসা হয়েছে।
বিশেষ করে নতুন পাঁচটি অঞ্চলের ১৮টি ওয়ার্ডকে সরাসরি মেগা প্রকল্পের আওতায় আনায় নগরীর প্রান্তিক অঞ্চলগুলোতে নাগরিক সেবার গতি বাড়বে। এর ফলে দীর্ঘদিনের অবহেলিত এলাকাগুলোর সড়ক ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা মূল শহরের সমপর্যায়ে উন্নীত হবে এবং পুরো দক্ষিণ ঢাকা একটি সমন্বিত আধুনিক নগরী হিসেবে গড়ে উঠবে। পরিকল্পনা অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ে এই কর্মযজ্ঞ বাস্তবায়িত হলে দক্ষিণ ঢাকার ভৌত অবকাঠামো, পরিবেশ ও নাগরিক সেবায় আমূল ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
তথ্যসূত্র: বাসস

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন