অক্টোবর ১৩, ২০২৬, ১০:৫৭ পিএম
সংবিধান সংশোধন প্রক্রিয়ায় বিরোধী দলের ইতিবাচক অংশগ্রহণের জন্য সরকার অপেক্ষা করবে বলে জানিয়েছেন সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সভাপতি ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) জাতীয় সংসদ ভবনে সংবিধান সংশোধন সম্পর্কিত বিশেষ কমিটির সপ্তম বৈঠক শেষে সংসদ ভবনের মিডিয়া সেন্টারে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে তিনি স্পষ্ট করেন, বিরোধী দল যদি আলোচনায় অংশ না-ও নেয়, তবুও জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়নে সংবিধান সংশোধনের ঐতিহাসিক প্রক্রিয়া থেমে থাকবে না।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সরকার চায় সরকারি দল ও বিরোধী দলসহ সবাই আলোচনার ভিত্তিতে একটি ঐকমত্যে পৌঁছে যৌথভাবে এই সাংবিধানিক পরিবর্তন গ্রহণ করুক। বিরোধী দলকে একাধিকবার আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানিয়ে আলোচনায় বসার আহ্বান জানানো হয়েছে। তবে তারা যদি একান্তই আলোচনায় না আসে, তবুও জাতির প্রত্যাশা পূরণে এবং ঐতিহাসিক জুলাই সনদ বাস্তবায়নের অঙ্গীকার রক্ষায় সরকারকে সাংবিধানিক সংস্কার কার্যকর করতেই হবে।
তিনি জানান, সাবেক প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সভাপতিত্বে এবং অধ্যাপক আলী রীয়াজের সহ-সভাপতিত্বে পরিচালিত জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের মাধ্যমেই জুলাই জাতীয় সনদ প্রণীত হয়েছিল। বর্তমান সরকার এখন এই সনদ বাস্তবায়নে সর্বাত্মক কাজ করছে। বিরোধী দল চাইলে বিশেষ কমিটিতে নিজেদের প্রতিনিধি পাঠাতে পারে, এমনকি লিখিত মতামত দিয়েও এই প্রক্রিয়ায় গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে পারে। পরবর্তীতে সংসদে সংশোধনী বিল উত্থাপন করা হলেও বিরোধী দলের সেখানে যুক্ত হওয়ার পূর্ণ সুযোগ থাকবে।
জাতীয় সংসদ ভবনে অনুষ্ঠিত এই বিশেষ বৈঠকে কমিটির সদস্য ও সংসদের চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি, আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান, সংসদ সদস্য জয়নুল আবেদীন, পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক, ভূমি প্রতিমন্ত্রী মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দীন, সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী ফারজানা শারমীন এবং সংসদ সদস্য মো. মাহমুদুল হক রুবেল উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠকে অংশ নেন দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, জাতীয় অধ্যাপক, শিক্ষাবিদ ও বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবীরা।
বৈঠকে সংবিধানের বিভিন্ন অংশে জুলাই জাতীয় সনদের প্রতিফলন ঘটানোর কৌশল, সংবিধান সংশোধনের পদ্ধতিগত রূপরেখা, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার পুনর্বহাল, বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা ও এখতিয়ার, রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি এবং জনগণের সার্বভৌমত্ব সুসংহত করার বিষয়ে বিস্তারিত পর্যালোচনা হয়।
সংবিধান সংশোধনের পদ্ধতি নিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, বর্তমান সংবিধানের ১৪২ অনুচ্ছেদে থাকা সংশোধনী বিধান নিয়ে শিক্ষাবিদরা মতামত উপস্থাপন করেছেন। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে বাতিল হওয়া গণভোটের বিধান এবং আদালতের রায়ের প্রেক্ষিতে তৈরি হওয়া আইনি বাস্তবতা আইনসভার মাধ্যমে কীভাবে নিষ্পত্তি করা যায় তা নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ভবিষ্যতে যেন অতিরিক্ত কঠোরতা বা নমনীয়তা তৈরি না হয়, সে বিষয়ে বিকল্প প্রস্তাব এসেছে।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রসঙ্গে তিনি জানান, জুলাই সনদ প্রণয়নকালে রাষ্ট্রপতির কাছে যাওয়ার সর্বশেষ বিকল্পটি বিলুপ্ত করার ঐকমত্য হয়েছিল। আগের ধাপগুলোতে ঐকমত্য না হলে বিচার বিভাগের সম্ভাব্য ভূমিকা নিয়ে প্রাথমিক আলোচনা হলেও পূর্ণাঙ্গ লিখিত প্রস্তাব এখনো জমা পড়েনি।
বিচার বিভাগের বিষয়ে তিনি উল্লেখ করেন, সংবিধানের ব্যাখ্যা দেওয়ার ক্ষমতা ও মৌলিক কাঠামোর সুরক্ষায় বিচার বিভাগের এখতিয়ারের পাশাপাশি এক অঙ্গ যেন অন্য অঙ্গের ওপর অযাচিত কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে না পারে তা নিশ্চিত করার তাগিদ দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতির কিছু অংশকে মৌলিক অধিকারে রূপান্তর করা যায় কি না এবং প্রজাতন্ত্র অংশে জনগণের সার্বভৌমত্ব কীভাবে আরও স্পষ্ট করা যায় সে বিষয়ে আলোচনা হয়।
উচ্চকক্ষ গঠনের বিষয়েও বৈঠকে বিশদ আলোচনা হয়েছে।
তিনি জানান, আইনসভার উচ্চকক্ষে অঞ্চল বা শ্রেণির প্রতিনিধিত্ব কেমন হবে, জেলাভিত্তিক নাকি আনুপাতিক প্রতিনিধিত্বের পদ্ধতিতে নির্বাচন হবে—এসব নিয়ে বুদ্ধিজীবীরা মত দিয়েছেন। এসব প্রস্তাব পর্যালোচনা করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
আগামী ২৪ অক্টোবর সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির প্রতিনিধি, জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে দিনব্যাপী বিশেষ মতবিনিময় সভার পরিকল্পনা নিয়েছে কমিটি।
মঙ্গলবারের এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে অংশ নেন জাতীয় অধ্যাপক মাহবুবুল্লাহ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক এস এম এ ফায়েজ, অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক এ বি এম ওবায়দুল ইসলাম, অধ্যাপক গীতি আরা নাসরিন, অধ্যাপক সামিয়া লুৎফা, অধ্যাপক তানজীমউদ্দিন খান এবং অধ্যাপক কে এইচ লুৎফুল এলাহী।
এছাড়াও খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মো. রেজাউল করিম, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবদুল্লাহ আল মামুন, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক একরামুল হক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবদুল লতিফ মাসুম, অধ্যাপক শামীমা সুলতানা, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন আহমেদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের ডিন অধ্যাপক মোহাম্মদ একরামুল হক, সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান এবং নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক নেসার ইউ আহমেদ উপস্থিত ছিলেন।
কমিটির সভাপতি সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, শিক্ষাবিদদের লিখিত ও মৌখিক মতামত পর্যালোচনার পর জুলাই সনদের অঙ্গীকার, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, নির্বাচনী ইশতেহার এবং জনআকাঙ্ক্ষার সমন্বয়ে চূড়ান্ত সংশোধনী প্রস্তাব প্রস্তুত করা হবে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন