বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬,

অননুমোদিত মোবাইল শনাক্ত ও জালিয়াতি বন্ধে কড়া হচ্ছে বিটিআরসি

জাতীয় ডেস্ক

অক্টোবর ২২, ২০২৬, ০৮:৫৭ পিএম

অননুমোদিত মোবাইল শনাক্ত ও জালিয়াতি বন্ধে কড়া হচ্ছে বিটিআরসি

অবৈধভাবে মোবাইল ফোন উৎপাদন, চোরাচালান এবং অনুমোদনহীন বিক্রি বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। অবৈধ হ্যান্ডসেটের কারণে সরকার প্রতি বছর প্রায় দুই হাজার কোটি টাকার বিপুল রাজস্ব হারাচ্ছে। এই বিশাল অঙ্কের আর্থিক ক্ষতি প্রতিরোধ এবং গ্রাহকপর্যায়ে আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিতের লক্ষ্যে আগামী বছরের ১ জানুয়ারি থেকে দুই ধাপে জাতীয় যন্ত্রপাতি শনাক্তকরণ নিবন্ধন ব্যবস্থা বা এনইআইআর (NEIR) পুনরায় চালুর পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি। 

এই ব্যবস্থার মাধ্যমে নেটওয়ার্কে ব্যবহৃত ক্লোন বা নকল হ্যান্ডসেট শনাক্তকরণ এবং মোবাইল আর্থিক সেবা বা এমএফএস (MFS) ভিত্তিক অপরাধ ও জালিয়াতি ঠেকানোর সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) মূল্যায়ন অনুসারে, অবৈধ উপায়ে বাজারে আসা মোবাইল ফোনের কারণে রাষ্ট্রীয় কোষাগার বছরে আনুমানিক দুই হাজার কোটি টাকার শুল্ক-কর থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। বিটিআরসির আনুষ্ঠানিক কমিশন সভায় উপস্থাপিত এক বিশেষ কার্যপত্রে এই পরিসংখ্যান স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

অননুমোদিত হ্যান্ডসেটের ক্ষেত্রে কার্যকর হবে কঠোর নজরদারি। গৃহীত পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ধাপে এনইআইআরের মৌলিক ডাটাবেজ ও নিবন্ধন সংক্রান্ত কার্যক্রমগুলো চালু করা হবে। তবে গ্রাহকদের তাৎক্ষণিক ভোগান্তি এড়াতে এই প্রাথমিক পর্যায়ে কোনো হ্যান্ডসেটের সংযোগ বা নেটওয়ার্ক নিবন্ধন সরাসরি বাতিল করা হবে না। দেশের মোবাইল অপারেটরদের সক্রিয় নেটওয়ার্কে বর্তমানে সচল থাকা হ্যান্ডসেটগুলো এই প্রক্রিয়ায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে নিবন্ধিত হিসেবে গণ্য হবে।

একই সঙ্গে অনুমোদিত আমদানিকারক ও স্থানীয় উৎপাদকদের কাছে অবিক্রিত অবস্থায় থাকা প্রতিটি হ্যান্ডসেটের আইএমইআই (IMEI) নম্বরও এই কেন্দ্রীয় ডাটাবেজে অন্তর্ভুক্ত করা হবে। বিদেশ থেকে অবৈধ উপায়ে আনা, শুল্ক ফাঁকি দিয়ে চোরাচালানের মাধ্যমে বাজারে ছাড়া হ্যান্ডসেট শনাক্ত করে প্রয়োজনে তা বন্ধ করার প্রযুক্তিগত সক্ষমতাও এই ধাপে কার্যকর থাকবে।

পরবর্তীকালে দ্বিতীয় ধাপে উপযুক্ত সময়ে স্বয়ংক্রিয়ভাবে হ্যান্ডসেটের নিবন্ধন বাতিলের কঠোর ব্যবস্থা পুরোপুরি সক্রিয় করা হবে। এর মাধ্যমে প্রতিটি ফোনের প্রকৃত মালিকানা যাচাই, ক্লোন হ্যান্ডসেট চিহ্নিতকরণ এবং সাইবার ও আর্থিক জালিয়াতি প্রতিরোধ করা সম্ভব হবে।

বিটিআরসির কমিশন সভায় সংস্থাটির স্পেকট্রাম ম্যানেজমেন্ট বা এসএম (SM) বিভাগের মহাপরিচালক এনইআইআর ব্যবস্থা পুনরায় কার্যকরের রূপরেখা উপস্থাপন করেন। কার্যপত্রে উল্লেখ করা হয়, ২০২১ সালের ১ জুলাই পরীক্ষামূলকভাবে ব্যবস্থাটি চালুর পর তৎকালীন সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্তে অবৈধভাবে আসা ফোন স্বয়ংক্রিয়ভাবে বন্ধ করা এবং ক্লোন হ্যান্ডসেট প্রতিরোধের মূল কার্যক্রমগুলো আর চালু করা যায়নি। ফলে কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে এনইআইআর অবকাঠামো তৈরির মূল উদ্দেশ্যই দীর্ঘদিন ধরে বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

পুরো পরিকল্পনাটির মাঠপর্যায়ের প্রযুক্তিগত বাস্তবায়ন করবে বিটিআরসির এসএম বিভাগ। দুই ধাপে ব্যবস্থাটি কার্যকর করার জন্য সরকারের পূর্বানুমোদন চেয়ে দ্রুত ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠানো হবে।

রাজস্ব ফাঁকি রোধ, টেলিযোগাযোগ খাতের প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা এবং জাতীয় নিরাপত্তা ঝুঁকি মোকাবিলায় বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় দপ্তর দীর্ঘ সময় ধরে এনইআইআর পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর তাগিদ দিয়ে আসছে। এর আগে ২০২৪ সালের ২৯ অক্টোবর অবৈধ হ্যান্ডসেটের দৌরাত্ম্য বন্ধে এনবিআর আনুষ্ঠানিকভাবে বিটিআরসিকে পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানায়। পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ২৮ জুন ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগ ব্যবস্থাটি পুনরায় সচল করার পরিকল্পনায় প্রাথমিক প্রশাসনিক অনুমোদন দেয়।

পরবর্তীতে ২০২৫ সালের ১ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় দেশের সব কটি নেটওয়ার্কে এনইআইআর পূর্ণাঙ্গভাবে চালুর সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়। ২০২৬ সালের ১ জানুয়ারি এটি চালুর প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হলেও সাধারণ গ্রাহকদের ভোগান্তির দিকটি বিবেচনায় নিয়ে ডিভাইস সরাসরি বন্ধ করার অংশটি তখন কার্যকর করা হয়নি।

চলতি ২০২৬ সালের ৯ জুন নিরাপত্তা সংস্থাগুলো আনুষ্ঠানিক চিঠির মাধ্যমে অর্থনৈতিক ক্ষতি ও জাতীয় নিরাপত্তার ঝুঁকি তুলে ধরে ব্যবস্থাটি অবিলম্বে চালুর তাগিদ দেয়। এরপর ২ জুলাই অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভাতেও আইএমইআই ও সিম নিবন্ধনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়। সর্বশেষ গত ২২ সেপ্টেম্বর স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের সমন্বয় সভায় ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে দুই ধাপে এই ব্যবস্থা পূর্ণাঙ্গ রূপ দেওয়ার সুপারিশ চূড়ান্ত করা হয়।

সংশ্লিষ্ট নথিতে জানানো হয়েছে, অনিবন্ধিত, চোরাই ও ক্লোন করা ডিভাইসগুলো সংঘবদ্ধ অপরাধ চক্র, ফোন চুরি এবং বিকাশ-নগদের মতো আর্থিক লেনদেনে প্রতারণার কাজে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তাই নেটওয়ার্কে যুক্ত থাকা প্রতিটি ডিভাইসের পরিচয় ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে এনইআইআর চালু করা এখন সময়ের দাবি।

এর পাশাপাশি ২০২৯ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শুধু দ্বিতীয় প্রজন্মের বা ২জি (2G) নেটওয়ার্ক-সমর্থিত ফিচার ফোনের ব্যবহার পর্যায়ক্রমে বন্ধের রূপরেখাও অনুমোদন করেছে বিটিআরসি। এর আওতায় এ ধরনের সেকেলে ফোনের অনুমোদন, স্থানীয় উৎপাদন, আমদানি ও উন্মুক্ত বিক্রির ওপর ক্রমান্বয়ে বিধিনিষেধ আরোপ করা হবে।