শনিবার, ০৭ নভেম্বর, ২০২৬,
ঐতিহাসিক বিপ্লব

জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস আজ

জাতীয় ডেস্ক

নভেম্বর ৭, ২০২৬, ০৯:১৪ এএম

জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস আজ

ছবি: সংগৃহীত

আজ ৭ নভেম্বর, জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস। দিনটি স্বাধীন বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গভীর তাৎপর্যবহ ও টার্নিং পয়েন্ট। ১৯৭৫ সালের এই দিনে দেশের অখণ্ডতা ও স্বাধীনতা রক্ষায় সিপাহি এবং জনতা এক ঐতিহাসিক অভ্যুত্থানে রাজপথে নেমে আসে।

সিপাহি-জনতার ঐতিহাসিক বিপ্লবে দেশের তৎকালীন রাজনীতির গতিধারা পাল্টে যায়। সেদিন দেশ ও জাতি পায় নতুন দিশা। দিনটি কেবল ক্ষমতার পালাবদল বা কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক ঘটনার গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়; বরং সংকটময় মুহূর্তে বহিরাগত ও অভ্যন্তরীণ ষড়যন্ত্র প্রতিহত করে একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে টিকে থাকার অদম্য লড়াইয়ের প্রতীক। আজও জাতীয় জীবনের যে কোনো সংকট উত্তরণে সিপাহি-জনতার সেই ঐক্যের চেতনা এক গভীর অনুপ্রেরণা জোগায়। দিবসটি উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী।

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট সপরিবারে শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে হত্যার ধারাবাহিকতায় সেনাবাহিনীর তৎকালীন উপপ্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল খালেদ মোশাররফ তার অনুসারী সেনাসদস্যদের নিয়ে এক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে সেনাপ্রধান মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমানকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টের বাসায় গৃহবন্দি করে রাখেন। খালেদ মোশাররফ নিজেকে সেনাপ্রধান হিসেবে ঘোষণা দিয়ে ৬ নভেম্বর বঙ্গভবনে গিয়ে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমেদকে গ্রেপ্তার করে মন্ত্রিসভা বাতিল ও জাতীয় সংসদ ভেঙে দেওয়ার ঘোষণা দেন। প্রধান বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমকে দেশের রাষ্ট্রপতি পদে বসান। ওই রাতেই সেনাবাহিনীর সাধারণ সিপাহিরা ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। সেই অভ্যুত্থানে স্বতঃস্ফূর্ত সমর্থন দিয়ে সর্বস্তরের জনতা রাজপথে নেমে আসে। সিপাহি-জনতার মিলিত সেই বিপ্লবে বন্দি অবস্থা থেকে মুক্ত হন জিয়াউর রহমান। পাল্টা অভ্যুত্থান ঠেকাতে গিয়ে ৭ নভেম্বর সকালে কয়েকজন অনুসারীসহ প্রাণ হারান খালেদ মোশাররফ। অভূতপূর্ব এক সংহতির নজির সৃষ্টি হয় দেশের রাজনীতিতে। জিয়াউর রহমান চলে আসেন ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নভেম্বরে এই পটপরিবর্তনের পর জিয়াউর রহমানের নেতৃত্বে দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব প্রভাবমুক্ত হয়ে শক্তিশালী সত্তা লাভ করে। গণতন্ত্র অর্গলমুক্ত হয়ে অগ্রগতির পথে এগিয়ে যায়। এ দিন থেকে বহুদলীয় গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়। এরপর থেকে ৭ নভেম্বর জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস হিসেবে পালন করছে বিএনপি। বিএনপি সরকারের আমলে এ দিনটিতে ছিল সরকারি ছুটি। তবে আওয়ামী লীগের শাসনামলে গত দেড় দশকেরও বেশি সময় দিবসটি স্বাচ্ছন্দ্যে উদযাপন করতে পারেনি বিএনপি। এবার দীর্ঘ প্রায় ২০ বছর পর ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত বিএনপি বিপ্লব ও সংহতি দিবস উদযাপন করতে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে দিবসটি উপলক্ষে কর্মসূচিও ঘোষণা করেছে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনগুলো। দিনটিকে যথাযোগ্য মর্যাদায় পালনের সব ধরনের উদ্যোগ নিয়েছে দলটি।

জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনগুলো সপ্তাহব্যাপী কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। ৫ নভেম্বর থেকে শুরু হওয়া এসব কর্মসূচি চলবে ১১ নভেম্বর পর্যন্ত। মূল কর্মসূচির অংশ হিসেবে আজ শনিবার বিকেল ৩টায় নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে বর্ণাঢ্য র্যালির উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। গতকাল শুক্রবার নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলের ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী সাংবাদিকদের এ কথা জানান। তিনি বলেন, ৭ নভেম্বর দেশের অধিকাংশ জেলা ও মহানগরে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবসের র্যালি হবে। ঢাকায় নয়াপল্টনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে র্যালির উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনী বক্তব্যের পর বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে র্যালিটি শুরু হবে এবং নয়াপল্টন থেকে কাকরাইলে প্রধান বিচারপতির বাসভবনের সামনে দিয়ে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল মোড় হয়ে বাংলামটর, ফার্মগেট হয়ে মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে গিয়ে শেষ হবে।

রুহুল কবির রিজভী বলেন, র্যালির আগে সকাল সাড়ে ৮টায় শেরেবাংলা নগরে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার কবরে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা নিবেদন করবেন প্রধানমন্ত্রীসহ সিনিয়র নেতৃবৃন্দ। ঢাকার কেন্দ্রীয় কর্মসূচির বাইরে বিভিন্ন অঙ্গসংগঠন আলোচনা সভা, আলোকচিত্র প্রদর্শনীসহ বিভিন্ন কর্মসূচি করবে।

দিবসটি উপলক্ষে দলটির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোও পৃথক কর্মসূচি পালন করবে। এর মধ্যে ১০ নভেম্বর যুবদলের আলোচনা সভা, ৫ নভেম্বর শ্রমিক দলের আলোচনা সভা, ৯ নভেম্বর বেলা ১১টায় কৃষক দলের আলোচনা সভা এবং একই দিন বিকেল ৩টায় জাতীয়তাবাদী সামাজিক সাংস্কৃতিক সংস্থার উদ্যোগে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান রয়েছে। এ ছাড়া ছাত্রদল ৭ নভেম্বর বেলা ১১টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে আলোকচিত্র প্রদর্শনী এবং ৮ নভেম্বর আলোচনা সভার আয়োজন করবে। ওলামা দল এতিম শিক্ষার্থীদের মধ্যে শিক্ষা উপকরণ বিতরণ করবে। ৮ নভেম্বর সারা দেশের থানা ও উপজেলা পর্যায়েও র্যালি করবে বিএনপি।

দিবসটি উপলক্ষে দেওয়া এক বাণীতে দেশের সকল নাগরিককে আন্তরিক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। একই সঙ্গে তিনি ১৯৭৫ সালের ৭ নভেম্বরের সিপাহি-জনতার যুগান্তকারী বিপ্লবে অংশগ্রহণকারী সকল বীর সেনানী ও দেশপ্রেমিক জনতার প্রতি শ্রদ্ধা জানান।

মানবিক দেশ গড়ার আহ্বান জানিয়ে রাষ্ট্রপতি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, ৭ নভেম্বরের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে দলমত নির্বিশেষে সকলে ঐক্যবদ্ধভাবে দুর্নীতি, বৈষম্য ও সকল ষড়যন্ত্রের অবসান ঘটাতে হবে। সবার আগে বাংলাদেশ দর্শনের ভিত্তিতে পরিচালিত হবে রাষ্ট্র। জাতীয় স্বার্থ, সাম্য, ন্যায্যতা ও গণতন্ত্রচর্চা পাবে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।

আমাদের জাতীয় জীবনে এই বিপ্লব ও সংহতির গুরুত্ব অপরিসীম উল্লেখ করে রাষ্ট্রপতি বলেন, এরই ধারাবাহিকতায় শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র, আইনের শাসন, বাক ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন, অর্থনৈতিক মুক্তি এবং সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি দেশকে নতজানু পররাষ্ট্রনীতি থেকে মুক্তি দেন এবং বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে জাতিকে উন্নয়ন, অগ্রগতি ও সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নেন। জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করেন, সর্বস্তরে প্রতিষ্ঠা করেন সুশাসন। সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি নির্বাচিত সরকারের নেতৃত্বে দেশ আজ আবার গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করেছে। এই অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানসহ রাষ্ট্রের সকল প্রতিষ্ঠানকে আরও শক্তিশালী করা অপরিহার্য।

বিপ্লব ও সংহতি দিবসের এক বাণীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ১৯৭৫ সালের ঐতিহাসিক ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতার বিপ্লব বাংলাদেশের পথ নির্ধারণ করেছিল। যারা বাংলাদেশকে তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত করে রাখতে চেয়েছিল, জনগণের গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক অধিকার হরণ করে দেশে একদলীয় স্বৈরাচারী শাসন কায়েম করতে চেয়েছিল এবং দেশের শৌর্য, বীর্য, সাহস ও সম্মানের প্রতীক সেনাবাহিনীর গৌরব ভূলুণ্ঠিত করতে চেয়েছিল, ৭ নভেম্বর দেশপ্রেমিক সিপাহি-জনতার ঐতিহাসিক বিপ্লবের মাধ্যমে তাদের পরাজয় ঘটেছিল।

প্রধানমন্ত্রী দিবসটি উপলক্ষে জাতীয়ভাবে গৃহীত সব কর্মসূচির সাফল্য কামনা করে বলেন, ৭ নভেম্বর সিপাহি-জনতা ঐক্যবদ্ধভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে সব চক্রান্ত রুখে দিয়েছিল। দেশের ইতিহাসে ঐতিহাসিক দিনটি ছিল বাংলাদেশের শত্রু-মিত্র চিহ্নিত করার দিন।