বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,
ঐতিহ্যবাহী শিদল সংস্কৃতি

শিদল তৈরির প্রণালী ও নীলফামারীর ঐতিহ্যবাহী তরকারি

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

সেপ্টেম্বর ২৩, ২০২৬, ০২:৫৪ পিএম

শিদল তৈরির প্রণালী ও নীলফামারীর ঐতিহ্যবাহী তরকারি

ভাওয়াইয়াসমৃদ্ধ উত্তরবঙ্গের নীলফামারী জেলার খাদ্যাভ্যাস ও রন্ধনশৈলীতে শিদল একটি অত্যন্ত পরিচিত ও জনপ্রিয় ঐতিহ্যবাহী খাবার। বিশেষ করে নীলফামারীর বাবু পাড়া ও আশপাশের অঞ্চলে যুগ যুগ ধরে নিজস্ব কৌশলে বিভিন্ন ছোট মাছের শুঁটকি ও মানকচুর ডাটার সমন্বয়ে এই বিশেষ খাদ্যটি তৈরি ও সংরক্ষণ করা হয়ে আসছে।

রন্ধনশিল্পী জলি আপার হাত ধরে এই পদটি বিশেষ খ্যাতি পেয়েছে। শিদল তৈরির মূল উপাদানের মধ্যে রয়েছে বিভিন্ন ধরনের ছোট মাছের শুঁটকি, আদা, রসুন, কাঁচা মরিচ, কালো কচুর ডাটা, জিরার গুঁড়া ও ধনিয়ার গুঁড়া। নীলফামারীর আঞ্চলিক ভাষায় যে পাত্রে এগুলো কোটা হয় তাকে সামগাই বা উরুনগাই বলা হয়। এই বিশেষ কাঠের বা পাথরের পাত্রে শুঁটকিগুলো প্রথমে কোনো পানি ছাড়া শক্তভাবে গুঁড়ো করে আলাদা তুলে রাখা হয়।পরবর্তী ধাপে কাঁচা মরিচ, রসুন ও আদা একসাথে মিহি করে পিষে নেওয়া হয়।

এই খাবারে কাঁচা মরিচের ব্যবহার তুলনামূলকভাবে বেশি থাকে, কারণ স্থানীয়দের বিশ্বাস শিদল যত বেশি ঝাল হয় এর স্বাদ তত বাড়ে। মসলা বাটার পর শুঁটকির পরিমাণের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কালো কচুর নরম অংশ বা ডাটা মিশিয়ে একসঙ্গে পুনরায় কোটা হয়। মিশ্রণটি যখন আঠালো রূপ ধারণ করে, তখন এর মধ্যে ধনিয়া ও জিরার গুঁড়া ভালোভাবে মেখে নেওয়া হয়।প্রখ্যাত সাহিত্যিক হুমায়ূন আহমেদ একসময় নীলফামারীতে এসে শিদল খেয়ে এর স্বাদের ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন। পুরো মিশ্রণটি তৈরি শেষে হাতের তালুতে নিয়ে গোল বা চ্যাপ্টা আকৃতি দেওয়া হয়। এরপর সামান্য সরিষার তেল ও হলুদের গুঁড়ার আবরণে গড়িয়ে নিয়ে এগুলোকে কড়া রোদে শুকানোর জন্য দেওয়া হয়। দুই থেকে তিন দিন রোদে শুকানোর পর এগুলো বেশ শক্ত হয়ে ওঠে এবং দীর্ঘদিনের জন্য কাঠের ছাইয়ের পাত্রে সংরক্ষণ করা যায়।

রোদে শুকানো সেই শিদল দিয়ে চমৎকার তরকারি রান্না করা হয়। রান্নার পূর্বে শক্ত শিদলকে কচুর পাতায় ভালোভাবে মুড়ে মাটির চুলায় থাকা গরম ছাইয়ের নিচে রেখে হালকা পুড়িয়ে নেওয়া হয়। এরপর পোড়ানো অংশটি পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে রান্নায় ব্যবহার করা হয়, এমনকি চাইলে সুস্বাদু সেই কচুপাতাও রান্নার সাথে দেওয়া যায়। অনেকে শুধু এই পোড়া শিদল পেঁয়াজ ও মরিচ দিয়ে ভর্তা হিসেবে খেয়ে থাকেন। তরকারি রান্নার জন্য প্রয়োজন হয় শোল মাছ, টাকি মাছ অথবা মাগুর মাছ। এর সাথে ব্যবহার করা হয় ডুমো করে কাটা আলু, গোল বেগুন, পেঁয়াজ কুচি, কাঁচা মরিচ, আদা বাটা, রসুন বাটা, মরিচের গুঁড়া, হলুদের গুঁড়া, জিরার গুঁড়া, ধনিয়ার গুঁড়া, স্বাদমতো লবণ ও রান্নার তেল। নীলফামারীর ঐতিহাসিক শাকামাছার হাট বা বর্তমানের বড় বাজার থেকে আনা সতেজ বেগুন ও মাছ এই রান্নার স্বাদ অনেক বাড়িয়ে দেয়। কড়াইয়ে তেল গরম করে পেঁয়াজ কুচি ও সামান্য লবণ দিয়ে ভাজতে হয়, যাতে পেঁয়াজ দ্রুত নরম হয়।

এরপর একে একে আদা বাটা, রসুন বাটা, কাঁচা মরিচ, হলুদের গুঁড়া, মরিচের গুঁড়া, জিরার গুঁড়া ও ধনিয়ার গুঁড়া দিয়ে মসলা ভালোভাবে কষিয়ে নিতে হয়। মসলা ভুনা হলে মাছের টুকরোগুলো দিয়ে সামান্য কষিয়ে আলাদা বাটিতে তুলে রাখা হয়। একই মসলার মধ্যে আলু ও বেগুনের টুকরো দিয়ে ঢেকে সামান্য সেদ্ধ করা হয়। সবজি কিছুটা নরম হলে আগে থেকে তুলে রাখা মাছ এবং পরিষ্কার করা পোড়া শিদল ছেড়ে দেওয়া হয়। ঝোল শুকিয়ে আসার আগ পর্যন্ত পুরো মিশ্রণটি ভালোভাবে নাড়াচাড়া করে ভুনতে হয়, যার ফলে মাছ ও শিদল গলে গিয়ে ঝোলের সাথে মিশে গাঢ় ঘনত্ব তৈরি করে। শিদল ভালোভাবে সেদ্ধ না হলে শুঁটকির কাঁচা গন্ধ থেকে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে, তাই ধিমে আঁচে কিছুটা পানি দিয়ে সময় নিয়ে ভুনা সম্পন্ন করতে হয়। শীতকালে নামানোর আগে টাটকা ধনেপাতা কুচি ছড়িয়ে দিলে এই তরকারির সুবাস ও স্বাদ দ্বিগুণ হয়।

নীলফামারীর আতিথেয়তায় শিদলের ভূমিকা অপরিসীম। অঞ্চলটিতে অতিথি বা সাগাই আপ্যায়নে শিদল পোড়া, শিদল ভর্তা এবং মাছ-বেগুনের ঝাল শিদল তরকারি পরিবেশনের দীর্ঘ রেওয়াজ রয়েছে। এই পদের পাশাপাশি নীলফামারীতে শোল বা টাকি মাছ গুঁড়ো করে রান্না করা নাখখোরিশানা, ঘন আলুর ডাল এবং ডিমলা ও চিলাহাটি অঞ্চলের চালের গুঁড়ার সেমাই নাড়ু অত্যন্ত প্রসিদ্ধ লোকজ খাবার হিসেবে পরিচিত।