রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

ইসলামে নারীর মর্যাদা ও অধিকারের এক অনন্য ইতিহাস

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

এপ্রিল ৭, ২০২৬, ১২:৫৫ পিএম

ইসলামে নারীর মর্যাদা ও অধিকারের এক অনন্য ইতিহাস

ইসলামে নারীর সুউচ্চ মর্যাদা

বিশ্ব সভ্যতার ইতিহাসে নারীর অবস্থান ও মর্যাদার বিবর্তন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, ইসলামের আগমন ছিল নারী জাতির জন্য এক মহান আশীর্বাদ। ইসলামের সামগ্রিক ইতিহাসকে সাধারণত পাঁচটি বিশেষ যুগে বিভক্ত করা হয় যার মধ্যে ইসলাম পূর্ব যুগ বা জাহেলি যুগ ছিল নারীর জন্য চরম অবমাননাকর। সেই অন্ধকার সময়ে সমাজে নারীদের কোনো সামাজিক মর্যাদা বা আইনি অধিকার ছিল না। 

বরং তাঁদের পরিবার ও সমাজের জন্য এক প্রকার অভিশাপ বা বোঝা হিসেবে গণ্য করা হতো। ঠিক সেই ক্রান্তিলগ্নে আরব ভূমিতে আবির্ভূত হন মানবতার মুক্তিদূত হযরত মুহাম্মদ (সা.)। তিনি কেবল একজন নবী হিসেবেই নন, বরং একজন শ্রেষ্ঠ সমাজ সংস্কারক হিসেবে নারীর হৃত গৌরব পুনরুদ্ধারে এক বৈপ্লবিক ভূমিকা পালন করেন।

জাহেলিয়াতের যুগে একটি মেয়ে শিশুর জন্ম নেওয়া ছিল পরিবারের জন্য চরম লজ্জার বিষয়। কন্যা সন্তান জন্ম দিলে মাকে সহ্য করতে হতো অমানবিক লাঞ্ছনা এবং অনেক ক্ষেত্রে নিষ্পাপ শিশুদের জীবন্ত কবর দেওয়া হতো। 

এই নিষ্ঠুর প্রথার মূলে কুঠারাঘাত করে রাসূলুল্লাহ (সা.) ঘোষণা করেন যে, আল্লাহ তাআলা কন্যা সন্তানকে জীবন্ত কবর দেওয়া এবং মায়ের অবাধ্য হওয়াকে হারাম করেছেন। তিনি আরও সুসংবাদ দেন যে, যার গৃহে কন্যাসন্তান জন্মগ্রহণ করে এবং সে তাকে কষ্ট না দিয়ে সঠিকভাবে লালন-পালন করে, সেই কন্যার কারণেই আল্লাহ তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন। এমনকি দুই জন কন্যাসন্তানকে উপযুক্ত শিক্ষায় বড় করে সুপাত্রে বিয়ে দিলে রাসূলের সাথে জান্নাতে থাকার সুসংবাদও দেওয়া হয়েছে বিভিন্ন হাদিসে।

নারীর বুদ্ধিবৃত্তিক মূল্যায়ন ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতায় ইসলাম যে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে তা সিরাত গ্রন্থগুলোতে স্পষ্টভাবে ফুটে ওঠে। জাহেলি যুগে নারীর কোনো মতামতের গুরুত্ব ছিল না, কিন্তু রাসূল (সা.) পারিবারিক ও রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়েও স্ত্রীদের পরামর্শ গ্রহণ করতেন। এর সবচেয়ে বড় উদাহরণ হলো হুদাইবিয়ার সন্ধির সময়কাল। যখন সাহাবীদের মধ্যে এক প্রকার দ্বিধা ও হতাশা কাজ করছিল, তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর সহধর্মিণী উম্মু সালামা (রা.)-এর সাথে পরামর্শ করেন এবং তাঁর প্রাজ্ঞ পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করে এক কঠিন পরিস্থিতির সমাধান করেন। 

এটি প্রমাণ করে যে, ইসলাম নারীকে কেবল গৃহবন্দী করে রাখেনি বরং তাঁর প্রজ্ঞা ও বুদ্ধিমত্তাকে যথাযথ সম্মান দিয়েছে।একজন নারীর জীবনের সবচেয়ে বড় সম্পদ হলো তাঁর সতীত্ব ও সম্মান। ইসলাম এই সম্মান রক্ষায় অত্যন্ত কঠোর বিধান জারি করেছে। পবিত্র কুরআনের সূরা নূরে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, যারা সচ্চরিত্রা ও সরলমনা মুমিন নারীদের প্রতি অপবাদ আরোপ করে, তারা দুনিয়া ও আখিরাতে অভিশপ্ত। এমনকি চারজন সাক্ষী ছাড়া কোনো নারীর চরিত্রে কালিমা লেপন করলে অপবাদকারীর জন্য আশিটি বেত্রাঘাতের শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। 

স্বয়ং উম্মুল মুমিনিন হযরত আয়েশা (রা.)-এর ওপর যখন মুনাফিকরা অপবাদ রটিয়েছিল, তখন মহান আল্লাহ কুরআনের আয়াত নাজিল করে তাঁর পবিত্রতা ঘোষণা করেন। এর মাধ্যমে ইসলাম নারীর সামাজিক নিরাপত্তাকে এক মজবুত আইনি ভিতের ওপর দাঁড় করিয়েছে।পারিবারিক জীবনে স্ত্রী হিসেবে নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠায় ইসলামের ভূমিকা অতুলনীয়। যখন তৎকালীন সমাজে নারীদের কেবল ভোগের সামগ্রী মনে করা হতো, তখন রাসূল (সা.) তাঁদের পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সম্পদ হিসেবে অভিহিত করেছেন। 

তিনি ঘোষণা করেছেন যে, তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বোত্তম যে তার স্ত্রীর কাছে উত্তম। দাম্পত্য জীবনে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার যে আদর্শ তিনি স্থাপন করেছেন, তা আধুনিক যুগেও সমভাবে অনুকরণীয়। মা হিসেবে নারীর মর্যাদাকে ইসলাম সবার উপরে স্থান দিয়েছে। রাসূল (সা.)-এর বিখ্যাত হাদিস অনুযায়ী বাবার চেয়ে মায়ের হক তিনগুণ বেশি এবং মায়ের পায়ের নিচে সন্তানের জান্নাত ঘোষণা করে ইসলাম মাতৃত্বকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।অর্থনৈতিক অধিকারের ক্ষেত্রেও ইসলাম নারীদের পূর্ণ স্বাধীনতা ও মালিকানা নিশ্চিত করেছে। 

ইসলামপূর্ব যুগে নারী ও শিশুরা উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত হলেও ইসলাম কুরআনের বিধানের মাধ্যমে মা, কন্যা ও স্ত্রী হিসেবে তাঁদের সুনির্দিষ্ট অংশ নির্ধারণ করে দিয়েছে। একজন নারী তাঁর নিজস্ব সম্পদের ওপর একক অধিকার ভোগ করেন এবং তাঁর অনুমতি ছাড়া পিতা, স্বামী বা সন্তান কেউ সেই সম্পদে অংশীদার হতে পারে না। এমনকি বিয়ের সময় মোহরানা হিসেবে প্রাপ্ত অর্থও সম্পূর্ণ তাঁর নিজস্ব সম্পদ। ইসলাম ন্যায্যতা ও ইনসাফের ভিত্তিতে নারীকে যে অধিকার ও সম্মান দিয়েছে, তা অন্য কোনো মতবাদ বা ধর্মে খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। নারীর এই সুউচ্চ মর্যাদা রক্ষা করা প্রতিটি মুসলিম সমাজের ধর্মীয় ও নৈতিক দায়িত্ব।