রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

মুসলিমদের দোষ প্রচার, শয়তানের সহযোগী হবেন না: মাওলানা আব্দুল্লাহ আল আমিন

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

অক্টোবর ১, ২০২৫, ১০:২১ পিএম

মুসলিমদের দোষ প্রচার, শয়তানের সহযোগী হবেন না: মাওলানা আব্দুল্লাহ আল আমিন

ছবি - সংগৃহীত

আজকের ডিজিটাল যুগে তথ্যপ্রবাহ সহজলভ্য হওয়ায় মানুষ একে অন্যের অত্যন্ত ক্ষুদ্র ভুলও বিচার-বিবেচনা ছাড়াই দ্রুত শেয়ার করে বিভিন্ন আলোচনা-সমালোচনা ছড়িয়ে দিচ্ছে, যা সমাজকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহার আজ এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে অনেকেই পাবলিক প্ল্যাটফর্মকে ব্যক্তিগত ক্ষোভ প্রকাশ, অন্যকে হেয় করা বা আক্রমণ করার এক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করছেন।

কিন্তু আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত নয়—ইসলামের শিক্ষা হলো শান্তি, সম্মান ও নৈতিকতা রক্ষা করা। ইদানিং গভীরভাবে লক্ষ্য করছি, যে কথা ইনডোরে পারস্পরিক সংশোধনের মাধ্যমে সমাধান করা উচিত ছিল, তা না করে ক্যারিয়ার ধ্বংসের হিংসাত্মক মানসিকতা লালন করে পাবলিক প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করা হচ্ছে।

তারা যেন ভুলে গেছেন নিম্নোক্ত হাদিসগুলো। রাসূল (সা.) বলেছেন, "মুসলমান মুসলমানের ভাই। সে তার উপর যুলম করবে না এবং তাকে যালিমের হাতে সোপর্দ করবে না। যে ব্যক্তি কোনো মুসলমানের দোষ ঢেকে রাখবে, আল্লাহ কিয়ামতের দিন তার দোষ ঢেকে রাখবেন।" সহীহ আল বুখারী: ২৪৪২।

অপর হাদিসে এসেছে, ইবনে উমার (রা.) বলেন, একদা আল্লাহর রসূল (সা.) মিম্বরে চড়ে উচ্চশব্দে বলেন, "ওহে যারা মুখে মুসলিম হয়েছ এবং যাদের অন্তরে এখনও ঈমান প্রবেশ করেনি (তারা শোন), তোমরা মুসলিমদেরকে কষ্ট দিয়ো না, তাদেরকে লাঞ্ছিত করো না ও তাদের ছিদ্রান্বেষণ করো না। যেহেতু যে ব্যক্তি তার মুসলিম ভাইয়ের দোষ অনুসন্ধান করে আল্লাহ তার দোষ অনুসন্ধান করেন।

আর আল্লাহ যার দোষ অনুসন্ধান করেন (অর্থাৎ গোপন না করেন) তিনি তাকে অপদস্থ করেন; যদিও সে নিজ গৃহাভ্যন্তরে থাকে।" (তিরমিযী ২০৩২)। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত আরেক হাদিসে রাসূল (সা.) মাতালকে প্রহারের পর কটূক্তিকারীকে বলেছেন, "এরুপ বলো না; তার বিরুদ্ধে শয়তানের সাহায্যকারী হয়ো না।" (বুখারী ৬৭৭৭)। অতএব, এখনই আমাদের সতর্ক হতে হবে।

আমাদের নিজেদের মাঝে এমন হিংস্র মনোভাব যেন আমাদেরকে গ্রাস না করে ফেলে এবং আমরা যেন কোনোভাবে শয়তানের সহযোগী না হয়ে যাই।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে, আলিম ও ওয়ায়েজদের ভূমিকাকে কোনোভাবেই নিচু চোখে দেখার সুযোগ নেই। বিগত ষোলো বছর আলিম ও ওয়ায়েজগণ রাষ্ট্রযন্ত্রের রোষানল, জেল-জুলুম আর নির্যাতন সহ্য করেও হকের পথে অবিচল থেকেছেন। আজ তাদের অবদানের ফলস্বরূপ আমরা দেখতে পাচ্ছি, অনলাইনে-অফলাইনে সমগ্র বাংলাদেশে একটি ইসলামী জাগরণ তৈরি হয়েছে, যুবক শ্রেণী কুরআনকে আঁকড়ে ধরা শিখছে।

তাঁদের রক্ত-ঘামে সিক্ত আত্মত্যাগই আজ জাতির রূহানী পুনর্জাগরণের শিকড়। অতএব, এটা আমাদের ঈমানী দায়িত্ব—মুসলিম ভাই-বোনদের ভুল-ত্রুটি নিয়ে প্রকাশ্যে বিভিন্ন অসম্মানজনক পন্থায় লাঞ্ছিত না করে বরং সর্বোত্তম উপায়ে কার্যকরভাবে তাদের কল্যাণের জন্য সঠিক ও সুন্দর পন্থা অবলম্বন করা।

ব্যক্তিগত ত্রুটি-অপূর্ণতার অস্থির চিত্র প্রকাশ্যে ছড়িয়ে না দিয়ে গোপনীয়তার আচ্ছাদনে তাদেরকে নেক পথে ফিরিয়ে আনার প্রয়াসই হোক আমাদের লক্ষ্য। কেননা, প্রকৃত ভ্রাতৃত্ব কেবল দোষ ধরিয়ে দেওয়াতে নয়, বরং ভ্রাতার সম্মান রক্ষা করে তার জন্য কল্যাণমুখী সমাধান খুঁজে বের করাতেই নিহিত। রাসূল (সা.) আমাদের এমনটাই শিখিয়েছেন।

বদরযুদ্ধে অংশগ্রহণকারী সাহাবী হাতিব ইবন আবি বালতাআ (রা.) যখন গোপনে বিশেষ পরিস্থিতিতে কিছু সংবাদ গুপ্তচরকে জানিয়েছিলেন, এরপরও রাসূল (সা.) তাকে কঠোর শাস্তির পথে না নিয়ে ক্ষমা ও দয়ার মহিমায় আচ্ছাদিত করেছিলেন। এ থেকে আমরা শিক্ষা পাই যে, দোষকে প্রচারণার হাতিয়ার না বানিয়ে বরং কল্যাণের দৃষ্টিতে সর্বোত্তম সমাধানের দিকে ধাবিত হওয়াই ইসলামের প্রকৃত রূপরেখা।

ওয়ায়েজদের সৃষ্ট জটিলতা ও সমাধানে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো খেয়াল রাখা অত্যন্ত জরুরি: বাচনভঙ্গি হতে হবে বিশুদ্ধ, নম্র ও হৃদয়গ্রাহী। বিষয়বস্তু নির্বাচন যেন সর্বদা কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক, সময়োপযোগী, জীবনঘনিষ্ঠ ও শিক্ষণীয় হয়। বাস্তব জীবন ও বিশুদ্ধ ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত থেকে সহজ-সরলভাবে শিক্ষণীয় বার্তাগুলোকে শ্রোতার মনে গেঁথে দেওয়ার চেষ্টা করুন। সরাসরি রাজনৈতিক বিতর্কের ব্যাপারে সতর্ক থাকুন, তথ্য গ্রহণের আগে ভালোভাবে যাচাই করুন এবং ব্যক্তি-কেন্দ্রিক অশালীন সমালোচনা থেকে বিরত থাকুন।

ন্যায়-অন্যায়, সত্য-মিথ্যা ও মানবিক মূল্যবোধের সার্বজনীন দৃষ্টিকোণ থেকে মানুষকে সচেতন করুন। জ্ঞানের গভীরতা ও স্পষ্টতার জন্য কুরআনের আয়াতের ব্যাখ্যায় প্রামাণিক তাফসীরের ভিত্তিকে সামনে রাখুন। আলোচনার প্রতিটি শব্দ ও বাক্য যেন হয় শালীন, সুস্পষ্ট ও অর্থপূর্ণ। জটিলতা ও অসুন্দর শব্দ পরিহার করে সহজ-সরল, প্রাঞ্জল ও শ্রুতিমধুর করে কথা বলুন। মহান আল্লাহ আমাদের সকলকে এই মহান দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করার তাওফীক দান করুন। আমীন।