শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর, ২০২৬,
আন্তর্জাতিক ফুটবল থেকে বিদায়

যে কারণে হঠাৎ আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানালেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

নভেম্বর ৬, ২০২৬, ০৭:৪২ পিএম

যে কারণে হঠাৎ আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানালেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো

ছবি: সংগৃহীত

পর্তুগালের জার্সিতে দীর্ঘ ২৩ বছরের বর্ণাঢ্য আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ইতি টেনেছেন ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো। আন্তর্জাতিক ফুটবলে সর্বোচ্চ ম্যাচ ও গোলের রেকর্ড গড়া এই তারকার হঠাৎ এমন বিদায় বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের চমকে দিয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে কোচের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি, একাদশে জায়গা হারানোর শঙ্কা এবং জাতীয় দলের ক্যাম্প ছেড়ে যাওয়ার মতো ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে এই সিদ্ধান্তের পেছনের কারণগুলো স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

৪১ বছর বয়সি রোনালদো পর্তুগালের হয়ে ২৪৩ ম্যাচে ১৪৬ গোল করেছেন। এত দীর্ঘ ক্যারিয়ারের শেষটা হয়েছে বেশ নাটকীয়ভাবে। কোনো বিদায়ী ম্যাচ বা সতীর্থদের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বিদায়পর্বের পরিবর্তে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও বার্তার মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানান তিনি।

রোনালদোর এই সিদ্ধান্তের পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে সামনে এসেছে পর্তুগালের কোচ জর্জ জেসুসের সঙ্গে তার সম্পর্কের টানাপোড়েন। সাম্প্রতিক সময়ে দুজনের মধ্যে একাধিক বিষয়ে মতবিরোধ তৈরি হয়। বিশেষ করে দলের শুরুর একাদশে রোনালদোর জায়গা পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে।

গত ২৭ সেপ্টেম্বর নরওয়ের বিপক্ষে নেশনস লিগের ম্যাচে পুরোটা সময় বেঞ্চে বসে থাকতে হয় পর্তুগালের অধিনায়ককে। ২০০৮ সালের পর প্রথমবার কোনো আন্তর্জাতিক ম্যাচে পুরোটা সময় বেঞ্চে কাটাতে হয় তাকে। এরপর ডেনমার্কের বিপক্ষে ম্যাচের আগে কোচ জেসুস ইঙ্গিত দেন, ওই ম্যাচেও শুরুর একাদশে জায়গা নাও পেতে পারেন রোনালদো। টানা দুই ম্যাচে বেঞ্চে থাকার সম্ভাবনা মেনে নিতে পারেননি এই অভিজ্ঞ ফরোয়ার্ড।

এরপরই ঘটে আরও বড় ঘটনা। জাতীয় দলের ক্যাম্প ছেড়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন রোনালদো। ইনস্টাগ্রামে দেওয়া এক বার্তায় তিনি জানান, জাতীয় দলের কোচের সংবাদ সম্মেলন এবং পর্তুগিজ ফুটবল ফেডারেশনের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে কথা বলার পরই ক্যাম্প ছাড়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।

এই ঘটনার পর কোচের সঙ্গে তার দূরত্ব আরও বাড়ে। পরবর্তী সময়ে দুজনের সম্পর্ক স্বাভাবিক করার চেষ্টা হলেও তাতে খুব একটা অগ্রগতি হয়নি। কোচ জেসুস রোনালদোকে জাতীয় দলে ফেরার সুযোগ দেওয়ার কথা বলেছিলেন এবং তার জন্য দলের দরজাও খোলা রেখেছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত কোচের সঙ্গে কথা বলতেও আগ্রহ দেখাননি রোনালদো।

পরবর্তীতে কোচের পক্ষ থেকে যোগাযোগ করা হলেও সেই উদ্যোগ ব্যর্থ হয়। বর্তমান কোচিং স্টাফের অধীনে খেলার বিষয়ে রোনালদোর অনাগ্রহ তার আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারের ভবিষ্যৎকে সম্পূর্ণ অনিশ্চিত করে তোলে।

এদিকে জাতীয় দলের হয়ে শেষ কয়েকটি ঘটনায় রোনালদোর মানসিক অবস্থাও আলোচনায় আসে। একসময় তিনি বলেছিলেন, শারীরিকভাবে ফিট থাকা পর্যন্ত পর্তুগালের হয়ে খেলতে চান। এমনকি চল্লিশের কোঠায় পৌঁছেও অবসরের বিষয়ে সরাসরি কোনো সিদ্ধান্ত জানাননি। মাসখানেক আগেও তিনি বলেছিলেন, যেদিন খেলার প্রেরণা হারিয়ে ফেলবেন, সেদিনই ফুটবলকে বিদায় জানাবেন।

তবে সাম্প্রতিক পরিস্থিতি তাকে দ্রুত এই সিদ্ধান্তের দিকে ঠেলে দিয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। জাতীয় দলের ক্যাম্প ছাড়ার পর ড্রেসিংরুমের পরিবেশ বা কোচের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি না হওয়াও তার সিদ্ধান্তে বড় প্রভাব রেখেছে।

রোনালদোর এমন বিদায়ে পর্তুগাল ফুটবল ফেডারেশনও প্রস্তুত ছিল না। দেশের অন্যতম সেরা ফুটবল কিংবদন্তিকে স্বদেশি দর্শকদের সামনে আনুষ্ঠানিকভাবে বিদায় জানানোর পরিকল্পনা ছিল তাদের। কিন্তু রোনালদো শেষবারের মতো মাঠে নেমে বিদায় নেওয়ার আগ্রহ দেখাননি। বরং ভিডিও বার্তার মাধ্যমে নিজের সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেন।

তার এমন সিদ্ধান্তে বিস্মিত হয়েছেন সাবেক কোচ ও সতীর্থরাও। হোসে মরিনিও চেয়েছিলেন খেলোয়াড় হিসেবে রোনালদোর বিদায় আরও সুন্দর হোক। অন্যদিকে সাবেক সতীর্থ রুবেন আমোরিমও মনে করেন, জাতীয় দলের ক্যারিয়ারের এমন সমাপ্তি কাম্য ছিল না। তবে পর্তুগালের ফুটবলে রোনালদোর অবদান কখনো মুছে যাওয়ার নয়।

সব মিলিয়ে রোনালদোর আন্তর্জাতিক ফুটবল ছাড়ার পেছনে বয়স বা শারীরিক সক্ষমতার চেয়ে সাম্প্রতিক সময়ের ঘটনাপ্রবাহ, কোচের সঙ্গে মতবিরোধ এবং জাতীয় দলে নিজের ভূমিকা নিয়ে তৈরি হওয়া অস্বস্তি বড় প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে। তবে অবসরের প্রকৃত কারণ সম্পর্কে তিনি নিজে বিস্তারিত কিছু জানাননি।

সবশেষে ভক্তদের উদ্দেশে সাত নম্বর জার্সি ফিরিয়ে দেওয়ার কথা বলে বিদায় জানিয়েছেন রোনালদো। যে জার্সি গায়ে তিনি দীর্ঘ দুই দশক ধরে পর্তুগালের ফুটবল ইতিহাসে একের পর এক অধ্যায় লিখেছেন, সেই জার্সির সঙ্গেই সম্পর্কের ইতি টানলেন এক ভিডিও বার্তার মাধ্যমে।