অক্টোবর ২৪, ২০২৫, ০৩:০৪ পিএম
টানা প্রায় এক সপ্তাহ ধরে বৃষ্টিহীন দেশের বেশিরভাগ এলাকা। হেমন্তের মাঝামাঝি সময়ে এসেও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত শীতল আমেজ, উল্টো দেশজুড়ে বয়ে যাচ্ছে মৃদু তাপপ্রবাহ। দিনের বেলা তো বটেই, রাতের বেলাতেও গরমের অনুভূতি যথেষ্ট তীব্র। এই ভ্যাপসা গরমের অস্বস্তির মধ্যেই আবহাওয়ার সম্ভাব্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিল বাংলাদেশ আবহাওয়া অধিদপ্তর। শুক্রবার সকাল ছয়টার দিকে দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গোপসাগর এবং তৎসংলগ্ন এলাকায় একটি লঘুচাপ সৃষ্টি হয়েছে।
আবহাওয়াবিদরা আশঙ্কা করছেন, এই লঘুচাপটি আরও শক্তি সঞ্চয় করে প্রথমে নিম্নচাপ এবং পরবর্তীতে ঘূর্ণিঝড়েও পরিণত হতে পারে। যদিও এর মূল প্রভাব ভারতের ওডিশা বা অন্ধ্রপ্রদেশ উপকূলের দিকে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি, তবে এর পরোক্ষ প্রভাবে বাংলাদেশের আবহাওয়াতেও বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে পারে। বিশেষ করে দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল এবং উপকূলীয় এলাকায় এর প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে, যার ফলে আগামী সপ্তাহের মাঝামাঝি নাগাদ টানা কয়েকদিন বৃষ্টিপাত হতে পারে এবং চলমান তাপপ্রবাহের অবসান ঘটতে পারে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের সংজ্ঞা অনুযায়ী, কোনো অঞ্চলের তাপমাত্রা যদি ৩৬ ডিগ্রি থেকে ৩৭ দশমিক ৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে থাকে, তবে তাকে মৃদু তাপপ্রবাহ হিসেবে গণ্য করা হয়। তাপমাত্রা ৩৮ থেকে ৩৯ দশমিক ৯ ডিগ্রি হলে তা মাঝারি, ৪০ থেকে ৪১ দশমিক ৯ ডিগ্রি হলে তীব্র এবং ৪২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের বেশি হলে তাকে অতি তীব্র তাপপ্রবাহ বলা হয়। এই সংজ্ঞা অনুযায়ী, গত কয়েকদিন ধরেই দেশের বিভিন্ন এলাকার ওপর দিয়ে মৃদু তাপপ্রবাহ বয়ে চলেছে।
গতকাল বৃহস্পতিবার দেশের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ফেনীতে, ৩৬ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এই সময়ে দেশের প্রায় সর্বত্রই ছিল বৃষ্টিহীন। কেবল রাঙ্গামাটিতে ৯ মিলিমিটার এবং শ্রীমঙ্গলে সামান্য বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। বৃষ্টির এই অনুপস্থিতিই মূলত দেশজুড়ে গরমের তীব্রতা বাড়িয়ে দিয়েছে। আবহাওয়া অফিস বলছে, এই ভ্যাপসা গরমের পরিস্থিতি আরও দুই থেকে তিন দিন অব্যাহত থাকতে পারে।
তবে শুক্রবার সকালে সৃষ্ট লঘুচাপটি এই পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটাতে পারে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের আবহাওয়াবিদ ড. ওমর ফারুক শুক্রবার দুপুরে সংবাদমাধ্যম ‘আমার দেশ’-কে জানান, দক্ষিণ-পূর্ব বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপটির গতিপ্রকৃতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। এটি যদি আরও শক্তি সঞ্চয় করে নিম্নচাপে পরিণত হয়, তবে এর প্রভাবে দেশের উপকূলীয় এলাকাসহ বেশ কয়েকটি অঞ্চলে বৃষ্টিপাত হতে পারে। তিনি জানান, বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে আগামী বুধবার, অর্থাৎ ২৯ অক্টোবরের দিকে।
এর প্রভাবে রংপুর, রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল এবং ময়মনসিংহ অঞ্চলে বৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে চট্টগ্রাম ও সিলেট অঞ্চলে এই নিম্নচাপের প্রভাবে বৃষ্টির সম্ভাবনা তুলনামূলকভাবে কম বলে তিনি মনে করেন।এর মাত্র চার দিন আগেও বঙ্গোপসাগরে একটি লঘুচাপ সৃষ্টি হয়েছিল। তবে সেটি খুব দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ে এবং বাংলাদেশের উপকূলে এর কোনো প্রভাবই পড়েনি। কিন্তু এবারের লঘুচাপটি নিয়ে আবহাওয়াবিদরা কিছুটা বেশি সতর্ক।
ড. ওমর ফারুক বলেন, ‘এ পর্যন্ত লঘুচাপের যে গতিপ্রকৃতি, তাতে এটি ঘনীভূত হয়ে নিম্নচাপে এবং পরবর্তীতে ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হওয়ার সমূহ সম্ভাবনা রয়েছে।’ তবে তিনি আশ্বস্ত করেন যে, বর্তমান পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ঘূর্ণিঝড়ে পরিণত হলেও এর মূল আঘাত বাংলাদেশের উপকূলের দিকে আসার সম্ভাবনা কম। তিনি বলেন, ‘এর প্রভাব বাংলাদেশের উপকূলে তত বেশি হবে না বলেই মনে করছেন তারা।’
কিন্তু ঘূর্ণিঝড় না হলেও, নিম্নচাপের পরোক্ষ প্রভাবেই চলতি সপ্তাহের শেষের দিকে, বিশেষ করে ২৯ অক্টোবর থেকে শুরু করে টানা তিন দিন বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টিপাত হতে পারে। এই বৃষ্টিপাত একদিকে যেমন দীর্ঘদিনের ভ্যাপসা গরম থেকে স্বস্তি দেবে, তেমনি কৃষকদের আমন ধানের জন্যও তা উপকারী হতে পারে, যদি না বৃষ্টির পরিমাণ অতিরিক্ত হয় বা ঝড়ো হাওয়া থাকে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর লঘুচাপটির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছে এবং সময়মতো প্রয়োজনীয় সতর্কতা জারি করবে বলে জানিয়েছে। যেহেতু অক্টোবরের শেষ এবং নভেম্বরের শুরু বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টির জন্য একটি উর্বর সময়, তাই এই লঘুচাপটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েই দেখা হচ্ছে। এর সম্ভাব্য গতিপথ এবং তীব্রতা আগামী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আরও স্পষ্ট হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
আপাতত দেশবাসীকে আরও কয়েকদিন ভ্যাপসা গরম সহ্য করতে হলেও, আগামী সপ্তাহের মাঝামাঝি সময়ে বৃষ্টির হাত ধরে স্বস্তি ফেরার একটি সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। তবে একইসঙ্গে উপকূলীয় এলাকার মানুষদের সতর্ক থাকার এবং আবহাওয়া অফিসের নির্দেশনার দিকে নজর রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।




দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন