অক্টোবর ৭, ২০২৬, ১২:৪৯ পিএম
রাঙ্গামাটির বিলাইছড়ি উপজেলায় জলবায়ু পরিবর্তন ও বন্যার মতো প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা জয় করে কৃষিতে নীরব বিপ্লব ঘটাচ্ছেন প্রান্তিক ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নারীরা। রাইংখং নদীর তীরবর্তী নিভৃত পাহাড়ি জনপদ ক্যারনছড়িতে নারীদের হাত ধরেই বদলে যাচ্ছে কৃষি খাত। পরিবেশগত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে তারা ফসল উৎপাদন, গবাদিপশু পালন ও দেশীয় বীজ সংরক্ষণের মাধ্যমে নিজেদের স্বাবলম্বী করে তুলছেন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের অর্থায়নে ২০২৩ সাল থেকে পরিচালিত ‘পিআরএলসি’ প্রকল্পের আওতায় বিলাইছড়ির দুই হাজারের বেশি পরিবার এই সহায়তা পাচ্ছে।
প্রকল্পটির কারিগরি সহায়তা দিচ্ছে বেসরকারি সংস্থা ‘মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন’ এবং মাঠপর্যায়ে বাস্তবায়ন করছে ‘হিল ফ্লাওয়ার’। প্রান্তিক এই পরিবারগুলোকে হাতে-কলমে জলবায়ুসহিষ্ণু চাষাবাদ ও ফসল সংরক্ষণের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। বস্তায় আদা চাষ, শাকসবজি উৎপাদন, কেঁচো সার তৈরি এবং গবাদিপশু পালনে তারা এখন দক্ষ।
এক নারী কৃষক জানান, প্রতি সপ্তাহে তিনি বেগুন, শিম ও পুঁইশাকের বীজ বিক্রি করেন। পাশাপাশি কেঁচো সার ও মরিচ বিক্রি করে পরিবারের খাবারের চাহিদার পাশাপাশি বাড়তি খরচও মেটাচ্ছেন। আরেকজন নারী কৃষক ছাগল পালনের সাফল্যের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, ‘প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর দুই হাজার টাকা পেয়েছিলাম। ওই টাকা দিয়ে তিনটি ছাগল কিনি। এখন সেই ছাগল থেকে আরও বাচ্চা হয়েছে।’
আধুনিক বাণিজ্যিক কৃষির প্রসারে অনেক দেশীয় বীজ হারিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এই নারীরা নিজেদের প্রয়োজনেই ঘরোয়া পদ্ধতিতে এমন অনেক ফসলের বীজ সযত্নে সংরক্ষণ করছেন, যেন ভবিষ্যতে সেগুলো আবারও ব্যবহার করা যায়। হিল ফ্লাওয়ারের এক প্রতিনিধি জানান, পাহাড়ি অঞ্চলে যাতায়াত ব্যবস্থা দুর্গম হওয়ায় কৃষি পণ্য বাজারে নেওয়া কষ্টকর। সুফলভোগীদের কথা মাথায় রেখে পণ্য বিক্রির জন্য একটি ‘বাজার সংগ্রহ কেন্দ্র’ চালু করা হয়েছে। পাশাপাশি খামারজাত সার ও কেঁচো সার তৈরিতেও কৃষকদের উৎসাহিত করা হচ্ছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার মতে, পাহাড়ে প্রধান সমস্যা হলো সেচ সংকট। এর কারণে অনেক কৃষিজমি পতিত থাকে। তিনি জানান, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হঠাৎ বন্যা দেখা দেয়। এসব সমস্যা কাটিয়ে উঠতে সরকারি দপ্তর ও বেসরকারি সংস্থাগুলোকে সমন্বিতভাবে নতুন প্রযুক্তির সম্প্রসারণে কাজ করতে হবে। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধিরা বলছেন, দুর্গমতার কারণে পাহাড়ে সরকারি সহায়তা সেভাবে পৌঁছায় না। আধুনিক কৃষিব্যবস্থা সম্পর্কেও কৃষকরা তেমন জানেন না। তাই তাদের ঐতিহ্যবাহী কৃষিজ্ঞানের সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয় ঘটিয়ে তাদের সচেতন করা হচ্ছে।
কৃষি অর্থনীতিবিদরা পাহাড়ি নারীদের এই নীরব শ্রমের প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতির ওপর জোর দিয়েছেন। তারা বলছেন, জুম চাষের পাশাপাশি পাহাড়ি আদা ও হলুদ এখন সমতলের বাজারগুলোতে অত্যন্ত জনপ্রিয়। খাদ্য নিরাপত্তা ও পুষ্টির চাহিদা মেটাতে এই নারীদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। তাদের আরও উৎসাহিত করতে এবং সরাসরি সম্পৃক্ততা বাড়াতে সব নারী কৃষকের জন্য ‘কৃষক কার্ড’ ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন