শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

প্রতিভার সাহস : আবুল কালাম শামসুদ্দীন

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

নভেম্বর ৮, ২০২৫, ০১:৪৯ পিএম

প্রতিভার সাহস : আবুল কালাম শামসুদ্দীন

প্রতিভা আর কিছুই নয়, সাহসের সময়োপযোগী লক্ষ্যভেদী প্রকাশ মাত্র—এই প্রকাশ ঘটে প্রতিবাদের মাধ্যমে। জাতীয় ক্রান্তিকালে আমাদের পূর্বপুরুষদের মধ্য থেকে প্রতিভার সাহস প্রতিবাদের দুর্বিনীত আলো জ্বেলে দিয়েছে। এই আলোর মশালচিদেরই অন্যতম ছিলেন সাংবাদিকতার বিকাশকালের অসাধারণ প্রতিভাধর সাংবাদিক, সম্পাদক, সাহিত্য বিশ্লেষক ও অনুবাদক—সর্বোপরি জাতির সৃজন-মননের অনন্য দিশারি আবুল কালাম শামসুদ্দীন (জন্ম: ৩ নভেম্বর ১৮৯৭; মৃত্যু: ৪ মার্চ ১৯৭৮)।

মানুষের প্রতি ভালোবাসা, গণঅধিকারের প্রতি অন্তর্গত আত্মীয়তা এবং জাতীয় স্বাতন্ত্র্যের প্রতি নিবেদিত চেতনার এমন উজ্জ্বল প্রকাশ খুব কমই লক্ষ করা যায়। আবুল কালাম শামসুদ্দীনের এই দ্বিধাহীন নিঃশঙ্ক ব্যক্তিত্বের বলিষ্ঠ প্রকাশের স্বাক্ষর তাঁর সমগ্র জীবনজুড়ে রয়েছে।জাতীয় প্রতিভা ও জাতীয় ব্যক্তিত্ব আবুল কালাম শামসুদ্দীনকে চিনতে-জানতে-বুঝতে তার জীবনের তিনটি প্রধান প্রতিবাদমূলক ঘটনাই যথেষ্ট। এই প্রতিবাদগুলো জাতিকে তিন-তিনবার প্রতিবাদের আলোকে আলোকিত করেছিল:

১. শিক্ষাব্যবস্থার পরীক্ষা বর্জন (১৯২১): असहযোগ আন্দোলনে (অসহযোগ আন্দোলনে) অংশ নিতে গিয়ে তিনি শাসক ব্রিটিশ প্রবর্তিত শিক্ষাব্যবস্থার বিএ পরীক্ষা বর্জন করেন। তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতে মুসলমানদের সামাজিক-অর্থনৈতিক অবস্থার প্রেক্ষিতে এ ছিল দেশপ্রেমের এক বলিষ্ঠ প্রকাশ। এরপর তিনি National University বা গৌড়ীয় সর্ব-বিদ্যায়তন থেকে স্নাতক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।

২. আইন পরিষদের সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ (ভাষা আন্দোলন): মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রভাষার মর্যাদা দেওয়ার দাবিতে মিছিলে অংশগ্রহণকারীদের ওপর সরকার নির্বিচারে গুলিবর্ষণ করলে, এর প্রতিবাদে তিনি আইন পরিষদের সদস্যপদ থেকে পদত্যাগ করেন। এটি ছিল গণঅধিকারের প্রতি তাঁর অন্তর্গত আত্মীয়তার সর্বোচ্চ প্রকাশ।

৩. সরকারি খেতাব বর্জন (স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন): স্বৈরাচারবিরোধী গণআন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি তাঁর প্রাপ্ত সরকারি খেতাব বর্জন করেন। এটি ছিল স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিভার সাহসের দৃঢ় অবস্থান।আবুল কালাম শামসুদ্দীনের সমগ্র জীবনে জাতীয় ও মানবসভ্যতার অগ্রযাত্রাকে অনিবার্য করে তোলাই ছিল প্রতিভার মৌল ধর্ম। তাঁর কাছে পরীক্ষা পাসের আকাঙ্ক্ষা, আইন পরিষদের মেম্বারশিপের লালসা ও রাজকীয় খেতাবের মোহ—কোনো কিছুই তাঁর প্রতিভার সাহসকে শৃঙ্খলিত করতে পারেনি।

তিনি তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন যে, জালিয়ানওয়ালাবাগের ঘটনা তাকে জোর করে রাজনীতির দিকে দৃষ্টি ফেরাতে বাধ্য করেছিল। এরপর তিনি স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীতে নাম লেখান এবং অহসহযোগ আন্দোলনের সময় তিনি সক্রিয় কর্মপন্থা গ্রহণের দিকে এগিয়ে যান।

জীবনের শুরুতে মধ্যবিত্ত মুসলিম পরিবারের ছেলে হয়েও যেমন নির্দ্বিধায় ব্রিটিশ প্রবর্তিত শিক্ষাব্যবস্থার পরীক্ষা বর্জন করেছিলেন, তেমনি পরবর্তী জীবনের বাঁকে বাঁকে তিনি এই দ্বিধাহীন নিঃশঙ্ক ব্যক্তিত্বের বলিষ্ঠ প্রকাশের স্বাক্ষর রেখে গেছেন। স্বাধীন মুসলিম সমাজ তথা মুক্ত জাতীয় সত্তা বিকাশের চরম লক্ষ্যেই নিবেদিত ছিল তাঁর সাহিত্যকর্ম, সাংবাদিকতা ও সমগ্র জীবনের শ্রম ও সাধনা।