মার্চ ২৬, ২০২৬, ০৭:১২ পিএম
দেশের উত্তরাঞ্চলে চলমান জ্বালানি সংকটের কারণে বোরো ধানের আবাদ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। বিশেষ করে রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় ডিজেলের তীব্র অভাব দেখা দেওয়ায় সেচ কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে। বোরো মৌসুমের এই গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সেচ পাম্প, নলকূপ ও অন্যান্য কৃষিযন্ত্রগুলো সচল রাখতে না পেরে চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন স্থানীয় কৃষকরা।
মাঠ পর্যায়ের কৃষকদের অভিযোগ অনুযায়ী, সরকারি নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে লিটারপ্রতি ১৫ থেকে ২০ টাকা বেশি দিয়েও অনেক ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় জ্বালানি তেল সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে না। অনেক এলাকায় পাম্পগুলো বন্ধ থাকায় খোলা বাজারে চড়া মূল্যে ডিজেল বিক্রি হচ্ছে যা সাধারণ কৃষকদের উৎপাদন খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
রাজশাহীর গোদাগাড়ী ও নওগাঁর বিভিন্ন এলাকায় সরেজমিন পরিদর্শনে দেখা গেছে, সেচ পাম্পের সামনে তেলের জন্য দীর্ঘ অপেক্ষা করেও অনেক কৃষক খালি হাতে ফিরছেন।
স্থানীয় কৃষকরা জানিয়েছেন, কয়েকদিন আগেও যে ডিজেল ১০২ টাকা লিটারে পাওয়া যেত, তা এখন ১২০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত দরে বিক্রি হচ্ছে। পানির অভাবে বোরো ক্ষেত শুকিয়ে যাওয়ার উপক্রম হলেও জ্বালানি সংকটে তারা নিরুপায় হয়ে পড়েছেন। বিশেষ করে প্রান্তিক চাষিরা এই বাড়তি আর্থিক চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন। সেচ পাম্পের চালকরাও জানিয়েছেন যে জ্বালানি সংকটের কারণে তারা সময়মতো পানি সরবরাহ করতে পারছেন না যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে ফসলের ওপর। নওগাঁর দুর্গাপুর ও আশেপাশের গ্রামে কৃষকরা দীর্ঘ পথ ঘুরেও তেলের সন্ধান পাচ্ছেন না বলে জানা গেছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, রাজশাহী কৃষি অঞ্চলে চলতি মৌসুমে প্রায় তিন লাখ ৫২ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এই অঞ্চলের মোট সেচনির্ভর জমির একটি বড় অংশ অর্থাৎ প্রায় ২১ শতাংশ জমি সরাসরি ডিজেলচালিত পাম্পের ওপর নির্ভরশীল। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এই অঞ্চলে প্রায় ৮৮ হাজার ২৬৮টি অগভীর নলকূপ এবং সাত হাজার ৪৫৮টি লো-লিফট পাম্প ডিজেলের মাধ্যমে পরিচালিত হয়।
এ ছাড়াও ৩১৫টি গভীর নলকূপও ডিজেল দিয়ে চালানো হয়। জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হলে এই বিশাল পরিমাণ জমির ফসল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে যা দেশের সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে পারে। কৃষকরা বলছেন, সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হলে ধানের ফলন অর্ধেকের নিচে নেমে আসবে।
কৃষি অর্থনীতিবিদরা এই পরিস্থিতিতে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে জ্বালানি বণ্টনের ক্ষেত্রে কৃষি খাতকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন। তারা বলছেন, বিশ্ববাজারে জ্বালানি অস্থিরতার কারণে রেশনিং ব্যবস্থা কার্যকর হলেও বোরো ধান বাংলাদেশের প্রধান খাদ্যশস্য হওয়ায় এই খাতে নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা জরুরি। কৃষিবিদদের মতে, দেশে বোরো আবাদি জমির প্রায় ৬৫ শতাংশ সেচই ডিজেলচালিত পাম্পের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। তাই এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে চালের বাজারে অস্থিরতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
তবে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয়ের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে যে পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে এবং কোনো অভিযোগ তাদের কাছে পৌঁছায়নি। যদিও মাঠ পর্যায়ের বাস্তবতা ও কৃষকদের অসহায়ত্ব ভিন্ন চিত্র তুলে ধরছে যা দ্রুত সমাধানের দাবি রাখে।


দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন