রবিবার, ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

দৃষ্টি নেই, তবু স্বপ্ন অটুট—রাইটারের সহায়তায় এসএসসি দিচ্ছে শরীফ

রবিউল এহ্সান রিপন

এপ্রিল ২১, ২০২৬, ০২:১০ পিএম

দৃষ্টি নেই, তবু স্বপ্ন অটুট—রাইটারের সহায়তায় এসএসসি দিচ্ছে শরীফ

ছবি-দিনাজপুর টিভি

জন্ম থেকেই দুই চোখে পৃথিবীর আলো দেখেননি শরীফ আলী, কিন্তু মনের ভেতরের আলো দিয়ে তিনি জয় করতে চান শিক্ষাজীবনের প্রতিটি ধাপ। অদম্য ইচ্ছাশক্তি আর কঠোর পরিশ্রমকে সঙ্গী করে ঠাকুরগাঁওয়ের এই তরুণ অংশ নিয়েছেন ২০২৬ সালের এসএসসি পরীক্ষায়। দৃষ্টিশক্তির সীমাবদ্ধতা তাঁর পথ রুদ্ধ করতে পারেনি, বরং প্রতিকূলতাকে জয় করেই তিনি এখন সবার জন্য এক অনুপ্রেরণার নাম। 

শরীফের এই লড়াই কেবল নিজের জন্য নয়, বরং তাঁর পরিবারের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য।ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের এই দৃষ্টি প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী শরীফ আলীর বাড়ি শহরের গোবিন্দনগর মুন্সিরহাট মহল্লায়। 

তাঁর বাবা রমজান আলী একজন অতি সাধারণ ইজিবাইকচালক। পরিবারের আয় সীমিত হলেও ছেলেকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করার সংকল্প ছিল শুরু থেকেই। কোনো ব্রেইল পদ্ধতি ছাড়াই পরিবারের সদস্যদের মুখে মুখে পড়া শুনে শুনে শেখার মাধ্যমেই শরীফের শিক্ষাজীবনের কঠিন সংগ্রাম শুরু হয়। 

পরবর্তীতে স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয় শেষ করে ২০২১ সালে তিনি শহরের স্বনামধন্য সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন।মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) সকাল ১০টা থেকে শুরু হওয়া এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় শরীফ ঠাকুরগাঁও সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রে প্রথম দিনের বাংলা প্রথমপত্র পরীক্ষায় অংশ নেন। যেহেতু তিনি নিজে লিখতে পারেন না, তাই সরকারি নিয়ম অনুযায়ী একজন শ্রুতলেখক বা রাইটারের সহায়তা নিচ্ছেন। শরীফের হয়ে উত্তরপত্রে লিখছেন সদর উপজেলার মুন্সিরহাট এলাকার অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী শায়লা আক্তার। ‘পাবলিক ও শ্রেণি পরীক্ষায় শ্রুতলেখক সেবা গ্রহণসংক্রান্ত নীতিমালা-২০২৫’ অনুযায়ী এই সুযোগ পেয়েছেন তিনি।

শরীফের এই যাত্রায় শুরুতে ছিল চরম অনিশ্চয়তা। সঠিক সময়ে একজন শ্রুতলেখক খুঁজে না পাওয়ায় তাঁর পরীক্ষা দেওয়া নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছিল। বিষয়টি স্থানীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত হলে শায়লা আক্তার স্বতঃস্ফূর্তভাবে এগিয়ে আসেন। এরপর দিনাজপুর শিক্ষা বোর্ড থেকে দ্রুত অনুমোদন পাওয়ার পর শায়লা আনুষ্ঠানিকভাবে শরীফের শ্রুতলেখক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। পরীক্ষা শুরুর আগে শায়লা আবেগাপ্লুত হয়ে জানান, তাঁর হাতের লেখায় যদি শরীফ ভাই ভালো ফলাফল করতে পারেন, তবে সেটিই হবে তাঁর জীবনের অন্যতম বড় প্রাপ্তি।

অন্যদিকে শরীফ তাঁর স্বপ্নের কথা জানাতে গিয়ে বলেন, বাবা-মা তাঁর দৃষ্টি ফেরাতে অনেক চেষ্টা করেছেন। এখন তাঁর একমাত্র লক্ষ্য পড়ালেখা শেষ করে একটি ভালো চাকরি করা, যেন কষ্ট করা বাবা-মাকে তিনি শেষ জীবনে সুখে রাখতে পারেন। কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা শাহানুর বেগম চৌধুরী জানিয়েছেন, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থী হিসেবে শরীফকে প্রতি ঘণ্টায় ১৫ মিনিট অতিরিক্ত সময়সহ সব ধরনের প্রয়োজনীয় সরকারি সুবিধা প্রদান করা হচ্ছে।

ঠাকুরগাঁও জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শাহীন আকতারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, জেলায় এ বছর মোট ৩৯টি কেন্দ্রে ২৩ হাজার ২ জন পরীক্ষার্থী এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। এর মধ্যে ২৩টি কেন্দ্রে ১৭ হাজার ৮৩৩ জন সাধারণ এসএসসি, ৮টি কেন্দ্রে দাখিল এবং ৮টি কেন্দ্রে কারিগরি শাখার শিক্ষার্থীরা রয়েছে। শরীফ আলীর মতো শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতিটি কেন্দ্রে বিশেষ নজরদারি ও অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করা হয়েছে বলে তিনি জানান। শরীফের এই অদম্য পথচলা সমাজের জন্য এক শক্তিশালী বার্তা যে, অধ্যবসায় থাকলে যেকোনো বাধাই অতিক্রম করা সম্ভব।