অক্টোবর ৩, ২০২৫, ১২:১১ পিএম
সংসার চালাতে ন্যুব্জ শরীর নিয়ে গত তিন যুগ ধরে গরু বা ঘোড়ার পরিবর্তে বুক দিয়ে তেলের ঘানি টেনে এক অমানবিক জীবন পার করছেন নীলফামারীর কিশোরগঞ্জ উপজেলার ষাটোর্ধ্ব মোস্তাকিন (৬৮) ও তাঁর স্ত্রী ছকিনা (৬৫)। বাহাগিলি ইউনিয়নের উত্তর দুরাকুটি পাগলাটারী গ্রামের বাসিন্দা এই দম্পতি দীর্ঘকাল ধরে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে বেঁচে আছেন।
গরু বা ঘোড়া কেনার সামর্থ্য না থাকায় প্রাচীন এই পদ্ধতিতে নিজেদের কোমর ও পিঠে ভাঁজ ফেলে তাঁরা জীবনধারণ করে চলেছেন। তাঁদের চোখেমুখে এখন আতঙ্ক ও হতাশার ছাপ।মোস্তাকিন দম্পতি তাঁদের তিন ছেলে ও চার কন্যার ভরণপোষণ এই ঘানি টেনেই চালিয়ে এসেছেন। এই কঠিন বাস্তবতার কথা তুলে ধরে মোস্তাকিন জানান, মাথা গোঁজার ঠাঁই এর জায়গাটুকু ছাড়া তাঁর আর কোনো ফসলের জমি নেই।
দান হিসেবে পাওয়া গরু: চার বছর আগে এই কঠিন জীবনযাপনের কথা পত্রপত্রিকায় প্রকাশ পেলে নীলফামারী সদরের এক দানবীর তাঁকে একটি গরু দান করেন। দুই বছর লালনপালন করে বাছুর পাওয়ার আনন্দে বুক ভরে উঠেছিল। তবে কপালে সুখ সয়নি, গাভির দুধের বাটনে পচন ধরলে তিনি সেটি ১০ হাজার টাকায় বিক্রি করে দিতে বাধ্য হন।
পরিবারের করুণ অবস্থা: মোস্তাকিনের তিন ছেলের মধ্যে একজন হোটেল শ্রমিক, দ্বিতীয়জন অসুস্থ এবং তাঁর দুই ঘাড়ে টিউমার। আর তৃতীয় ছেলেটি প্রতিবন্ধী ও চোখে দেখে না। চার মেয়ের বিয়ে দিলেও যৌতুকের দায়ে তৃতীয় কন্যা তাঁর পুত্রসন্তানসহ তিন থেকে চার বছর ধরে বাবার বাড়িতেই আছেন।মোস্তাকিনের স্ত্রী ছকিনা জানান, তাঁর বৃদ্ধ স্বামী জীবন বাঁচানোর তাগিদে প্রতিদিন সকালে গ্রামে গ্রামে সরিষা সংগ্রহের কাজে বের হন। সরিষা সংগ্রহ শেষে বাড়িতে ফিরে বিরামহীনভাবে বিকাল ৩টা পর্যন্ত তেলের ঘানি টানার কাজ করেন।
এই কঠোর পরিশ্রমে তিনি ৫ কেজি সরিষার দানা পিষে সোয়া লিটার তেল ও প্রায় ৩ কেজি খৈল বের করতে পারেন। এতে তাঁর প্রতিদিন আয় আসে ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা। এই সামান্য আয়ে খাওয়া তো দূরের কথা, শরীরের ঘাম শুকাতে না শুকাতে তেল ও খৈল বিক্রির জন্য তাঁকে আবার ছুটতে হয় হাটবাজারে।
প্রতিবেশী শরিকুল ইসলাম বলেন, মোস্তাকিন বসতভিটার উঠানে গাছের গুঁড়ি ও পাথর দিয়ে জোড়াতালির টিনের ছাপরায় ঘানি তৈরি করেছেন। গরু না থাকায় এই বৃদ্ধ দম্পতি নিজেদের বুক ও হাত দিয়ে টেনে টেনে কোমর ও পিঠে ভাঁজ ফেলে দিয়েছেন।স্থানীয় বাসিন্দা জিয়াউর রহমান জানান, মোস্তাকিন তেলির শুধু খাওয়া-পড়ার অভাব নয়, তাঁর রাতে শোয়ার ঘরেরও অভাব। স্ত্রী, ছেলেমেয়ে ও ছেলের বউসহ যে ঘরে থাকেন, সেই ঘরের ওপরের অংশে পলিথিন দিয়ে কোনোমতে রোদবৃষ্টি থেকে রক্ষা পাওয়ার চেষ্টা করছেন।
স্থানীয় একাধিক ব্যক্তি সহানুভূতি জানিয়েছেন, মানবিক সহযোগিতা পেলে হয়ত এই বৃদ্ধ দম্পতি জীবন সায়াহ্নে একটু স্বস্তিতে পরিবার নিয়ে বাঁচতে পারবেন।
এ বিষয়ে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সুজাউদৌল্লা লিপটন আশ্বাস দিয়েছেন, উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে মোস্তাকিন দম্পতিকে সহযোগিতা করা হবে। উপজেলা নির্বাহী অফিসার প্রীতম সাহাও বিষয়টি শুনেছেন এবং পরিবারটির ভালোভাবে খোঁজখবর নিয়ে সহযোগিতা করার কথা বলেছেন।
এই ষাটোর্ধ্ব দম্পতি ডিজিটাল বাংলাদেশের আধুনিকতার ছোঁয়াকে হার মানিয়ে এখনো আদিম সভ্যতার আদলে দারিদ্র্য জর্জরিত কঠিন এক বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছেন।




দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন