অক্টোবর ১৯, ২০২৬, ০৫:১৮ পিএম
স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণ তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার বিষয়ে চলতি অক্টোবর মাসের মধ্যেই আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে বলে আশা প্রকাশ করেছেন বাণিজ্য, শিল্প এবং বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদির।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) বিকেলে রাজধানীতে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের সেমিনারে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ তথ্য জানান।
রাজধানীর পল্টনে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম মিলনায়তনে যৌথভাবে এ সেমিনারের আয়োজন করে ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম ও বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউট।
বাড়তি সময়কে কাজে লাগাতে কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে।
বাণিজ্যমন্ত্রী জানান, উত্তরণ পেছানোর প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশ ইতোমধ্যে জাতিসংঘের কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির ধাপ অতিক্রম করেছে। পরবর্তীতে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদে তিন বছর সময় বৃদ্ধির আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব উত্থাপন করা হয়। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সহযোগী দেশগুলোও বাংলাদেশের অনুকূলে বাড়তি সময় বরাদ্দের যৌক্তিকতায় ঐকমত্য প্রকাশ করেছে।
তিনি উল্লেখ করেন, আগামী সপ্তাহ বা তার পরের সপ্তাহের মধ্যে এ বিষয়ে একটি ইতিবাচক নিষ্পত্তি দেখা যাবে। আগামী ২৪ নভেম্বরের নির্ধারিত সময়সীমার আগেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত মিলবে বলে তিনি আশাবাদী।
তিন বছর সময় চাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে মন্ত্রী কঠোর মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, সম্ভাব্য চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য অতীতে দেশের বাস্তব কোনো প্রস্তুতি ছিল না। অর্থনৈতিক ও আর্থিক কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করার চেয়ে উত্তরণের বিষয়টিকে কেবল রাজনৈতিকভাবে মহিমান্বিত করার অপচেষ্টা চালানো হয়েছে। উত্তরণ-পরবর্তী বাণিজ্য সুবিধা রক্ষা এবং সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতি কাটিয়ে ওঠার সক্ষমতা তৈরিতে প্রয়োজনীয় মনোযোগ দেওয়া হয়নি।
বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, এই বাড়তি সময় কীভাবে যথাযথভাবে কাজে লাগানো হবে, সে সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট সময়বদ্ধ কর্মপরিকল্পনা ইতোমধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কাছে তুলে ধরা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্য সুবিধা নিশ্চিত করতে একাধিক মুক্তবাণিজ্য চুক্তির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
মন্ত্রী জানান, ২০২৬ ও ২০২৭ সালের মধ্যে বিশ্বের আট থেকে দশটি গুরুত্বপূর্ণ দেশের সঙ্গে সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি অথবা মুক্তবাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন করার সমন্বিত লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সঙ্গে মুক্তবাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনার জন্য প্রধান আলোচক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে এবং প্রথম ধাপের কারিগরি পর্যালোচনার প্রস্তুতি পুরোদমে চলছে। উত্তরণের সময়সীমা শেষ হওয়ার আগেই এই চুক্তি চূড়ান্ত করাই সরকারের মূল লক্ষ্য।
একই সাথে জিএসপি প্লাস সুবিধা প্রাপ্তির প্রস্তুতিও সমান্তরালভাবে চলমান থাকবে।
মন্ত্রী দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, জিএসপি প্লাসের বিকল্প পথে বাংলাদেশকে যাতে হাঁটতে না হয়, তার আগেই মুক্তবাণিজ্য চুক্তি সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।
পাশাপাশি এশীয় অঞ্চলের বৃহত্তম বাণিজ্য জোট আঞ্চলিক বিস্তৃত অর্থনৈতিক অংশীদারত্বে যুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়াও অগ্রসর হচ্ছে। এ বিষয়ে নীতিগত অনুমোদন লাভ করেছে বাংলাদেশ এবং বর্তমানে আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়াগত কাজ চলমান রয়েছে।
বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে অভ্যন্তরীণ অবকাঠামোগত জটিলতা নিরসনে আলোকপাত করেন বাণিজ্যমন্ত্রী।
তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যের শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকারের পাশাপাশি নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ, ব্যবসায়িক প্রক্রিয়া সহজীকরণ এবং বাণিজ্যিক বিরোধের দ্রুত ও স্বচ্ছ আইনি সমাধান অপরিহার্য।
দেশে ব্যবসা শুরু করার আমলাতান্ত্রিক দীর্ঘসূত্রতার উদাহরণ তুলে ধরে তিনি জানান, ট্রেড লাইসেন্স, ব্যাংক হিসাব ও পরিবেশগত ছাড়পত্র সংগ্রহ থেকে শুরু করে আমদানি নিবন্ধন সনদ নিয়ে শিল্প যন্ত্রপাতির ঋণপত্র খোলা পর্যন্ত একজন উদ্যোক্তার গড়ে ৩৫৫ দিন লেগে যায়। এত বিপুল সময় ব্যয় হলে ব্যবসায়ী ও বিনিয়োগকারীদের স্বাভাবিক উদ্যম বিনষ্ট হয়।
এ পরিস্থিতি আমূল পাল্টাতে একক ডিজিটাল পোর্টালে ট্রেড লাইসেন্স চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এর ফলে দেশ কিংবা বিদেশের যেকোনো স্থান থেকে প্রয়োজনীয় নথিপত্র অনলাইনে জমা ও সরকারি ফি পরিশোধ করে ঘরে বসেই লাইসেন্স সংগ্রহ করা যাবে। পরিশোধিত ফি স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংশ্লিষ্ট স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের তহবিলে জমা হবে।
পাশাপাশি যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরের যাবতীয় সেবা শতভাগ অনলাইনে রূপান্তর এবং বিদ্যমান বিভিন্ন লাইসেন্সের নবায়ন মেয়াদ তিন থেকে পাঁচ বছর পর্যন্ত বৃদ্ধির প্রক্রিয়া চলছে। আলাদা আলাদা সংস্থার পৃথক পরিদর্শনের ভোগান্তি বন্ধে একটি সমন্বিত পরিদর্শন ব্যবস্থা চালু করা হচ্ছে।
মন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, এসব কাঠামোগত প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে ২০২৭ সালের মধ্যে লাইসেন্স ও অনুমোদন প্রাপ্তির দীর্ঘসূত্রতা স্থায়ীভাবে দূর করা সম্ভব হবে।
জ্বালানিসংকটকে নতুন শিল্পায়নের প্রধান অন্তরায় উল্লেখ করে তিনি বলেন, অভ্যন্তরীণ সরবরাহ নিশ্চিতে নতুন ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল স্থাপন, নতুন গ্যাসকূপ খনন এবং সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে গতি বাড়াতে বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
আন্তর্জাতিক সরবরাহ চেইনে বিঘ্ন ঘটলে যেন সংকট তৈরি না হয়, সে জন্য এলএনজি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় ভোগ্যপণ্যের কৌশলগত জাতীয় মজুত সক্ষমতা গড়ে তোলার ওপর জোর দেন বাণিজ্যমন্ত্রী।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি দৌলত আক্তার মালা।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউটের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ড. মোস্তফা আবিদ খান। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরামের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য এসএসএম মঈনুল হক।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন