নভেম্বর ৮, ২০২৬, ০৩:০৬ পিএম
রামায়ণের কাহিনিতে রাবণকে মূলত একজন শক্তিশালী ও অহংকারী শাসক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। তবে তার পাশে এমন একজন রানি ছিলেন, যিনি বারবার তাকে ভুল সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসার সঠিক পরামর্শ দিয়েছিলেন। তিনি হলেন মন্দোদরী, যিনি লঙ্কার রানি এবং রাবণের স্ত্রী হিসেবে পরিচিত। সীতাকে সীতাদেবীর মর্যাদায় ফিরিয়ে দিয়ে যুদ্ধ এড়ানোর পরামর্শ দিলেও রাবণ তার কথা শোনেননি। নীতিবোধ ও দূরদর্শিতার কারণে রামায়ণের এই চরিত্রটি আজও বিশেষভাবে আলোচিত। নিতেশ তিওয়ারির পরিচালিত ‘রামায়ণ’ ছবিতে মন্দোদরীর ভূমিকায় অভিনয় করেছেন অভিনেত্রী কাজল আগরওয়াল।
পৌরাণিক বিবরণ অনুযায়ী, মন্দোদরী ছিলেন অসুরদের কিংবদন্তি স্থপতি ময়াসুরের কন্যা এবং তার মা ছিলেন অপ্সরা হেমা। ময়াসুরের কন্যা হিসেবে রাজকীয় পরিবেশেই তার শৈশব ও কৈশোর কাটে এবং পরবর্তীতে লঙ্কার রাজা রাবণের সঙ্গে তার বিবাহ হয়। তাদের ঔরসে জন্ম নেন মেঘনাদ, যিনি পরবর্তীতে ইন্দ্রজিৎ নামে পরিচিত হন এবং রামায়ণের অন্যতম শক্তিশালী যোদ্ধা হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন।
রামায়ণের মূল কাহিনিতে মন্দোদরীকে একজন অত্যন্ত বিচক্ষণ ও দূরদর্শী নারী হিসেবে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। সীতাকে লঙ্কায় অপহরণের পর তিনি রাবণকে তাকে অবিলম্বে ফিরিয়ে দেওয়ার পরামর্শ দেন। একই সঙ্গে শ্রীরামের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে জড়ানো থেকে বিরত থাকতে বলেন। মন্দোদরী দূরদৃষ্টি দিয়ে বুঝতে পেরেছিলেন যে, এই অবিবেচকের সিদ্ধান্ত গোটা লঙ্কার জন্য একটি ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
কিন্তু রাবণ তার স্ত্রীর কোনো পরামর্শই কর্ণপাত করেননি এবং নিজের জেদি সিদ্ধান্তে সম্পূর্ণ অটল থাকেন। শেষ পর্যন্ত রাম ও রাবণের ভয়াবহ যুদ্ধে লঙ্কা সাম্রাজ্যের পতন ঘটে। রাবণের এই করুণ পরিণতির মধ্য দিয়ে মন্দোদরীর সতর্কবার্তার সত্যতা ও গুরুত্ব আরও বেশি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সময়ের বিবর্তনে আধুনিক যুগের বিভিন্ন সাহিত্যিক পুনর্নির্মাণেও মন্দোদরীর চরিত্রটি সম্পূর্ণ নতুনভাবে উঠে এসেছে। লেখক আনন্দ নীলকান্তনের ‘অসুর’ উপন্যাসে রামায়ণের প্রচলিত কাহিনি রাবণের দৃষ্টিকোণ থেকে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, যেখানে মন্দোদরীর প্রজ্ঞা, মানসিক টানাপোড়েন ও নীরব কষ্টের দিকগুলো দারুণভাবে স্থান পেয়েছে।
এদিকে চলচ্চিত্র অঙ্গনেও এই চরিত্রটি নিয়ে নতুন উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে। পরিচালক নিতেশ তিওয়ারির বিগ বাজেটের ‘রামায়ণ’ চলচ্চিত্রে মন্দোদরীর চরিত্রে অভিনয় করেছেন কাজল আগরওয়াল। ছবিটির বিভিন্ন প্রধান চরিত্রে রণবীর কাপুর, সাই পল্লবী ও যশ অভিনয় করেছেন। ছবিটির প্রথম পর্ব ইতোমধ্যে মুক্তি পেয়েছে।
কাজলকে মন্দোদরীর মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ পৌরাণিক চরিত্রের জন্য বেছে নেওয়ার খবর প্রকাশের পর দর্শকদের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গিয়েছিল। কেউ কেউ মনে করেছিলেন, বিচক্ষণ ও সৌম্য স্বভাবের মন্দোদরীর যে রূপ মানুষের মনে কল্পনা করা হয়, কাজলের অবয়বের সঙ্গে তা সম্পূর্ণ মেলে না। এ নিয়ে বেশ কিছুদিন আলোচনাও হয়েছিল। তবে চরিত্রটির যথাযথ প্রস্তুতি নিতে মন্দোদরীকে কেন্দ্র করে রচিত বিভিন্ন পৌরাণিক ও ঐতিহাসিক বই নিবিড়ভাবে অধ্যয়ন করেছেন বলে জানিয়েছেন কাজল। এমনকি তার ছোট ছেলেও রামায়ণের কাহিনি খুব ভালোভাবেই জানে এবং বাড়িতে ছোট পরিসরে রামলীলা মঞ্চস্থ করে বলেও গণমাধ্যমে প্রকাশ করেছেন অভিনেত্রী।
রামায়ণের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ ও বীরত্বের আখ্যানে মন্দোদরীর পরিচয় কেবল রাবণের স্ত্রী হিসেবেই সীমাবদ্ধ নয়। নিজের অবস্থান থেকে অন্যায়ের ঘোর বিরোধিতা করা এবং আসন্ন বিপর্যয় এড়ানোর সঠিক ও কল্যাণকর পরামর্শ দেওয়ার মধ্য দিয়েই চরিত্রটি আলাদা ও অনন্য গুরুত্ব লাভ করেছে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন