বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬,

সেন্ট মার্টিনের সৌন্দর্যের আড়ালে যেভাবে বাড়ছে গভীর সংকট

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

সেপ্টেম্বর ৩০, ২০২৬, ১০:৪৮ পিএম

সেন্ট মার্টিনের সৌন্দর্যের আড়ালে যেভাবে বাড়ছে গভীর সংকট

বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিনের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষা এবং বিপন্ন প্রতিবেশ পুনরুদ্ধারে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছে পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়। পর্যটন নিষিদ্ধ থাকার অফসিজনে দ্বীপটিকে নতুন রূপ দিতে সাগর পাড়ি দিয়ে সেখানে বনায়ন ও বর্জ্য অপসারণ কর্মসূচি শুরু করা হয়েছে। এ সময় পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী শেখ ফরিদুল ইসলাম জানান, সেন্ট মার্টিন সৃষ্টিকর্তার এক অনন্য উপহার এবং ট্রিলিয়ন ডলার খরচ করেও আরেকটি সেন্ট মার্টিন তৈরি করা যাবে না। 

তাই এর সৌন্দর্য রক্ষা ও দ্বীপবাসীর ভবিষ্যৎ সুরক্ষায় সুপরিকল্পিত পদক্ষেপের কোনো বিকল্প নেই। দ্বীপে মাটি ও আবহাওয়া উপযোগী ২০ হাজার দেশীয় প্রজাতির গাছ লাগানোর পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী উদ্যোগের অংশ হিসেবে আগামী চার দিনে পুরো দ্বীপ থেকে যাবতীয় প্লাস্টিক ও পলিথিন সংগ্রহ করে মূল ভূখণ্ডে ফিরিয়ে আনার কাজ শুরু হয়েছে। পরিবেশ প্রতিমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, এই বর্ষা ও অফসিজনই হলো গাছ লাগানো এবং দ্বীপ পরিচ্ছন্ন করার সঠিক সময়। 

শীত মৌসুমে পর্যটকেরা আসার আগেই যদি একটি সুশৃঙ্খল পরিবেশ তৈরি করা যায়, তবে প্রকৃতির ওপর পর্যটকদের অযাচিত হস্তক্ষেপ নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হবে। তবে পরিবেশ সংরক্ষণের এই কড়াকড়িতে ভয়াবহ মানবিক সংকটে পড়েছেন দ্বীপের স্থায়ী বাসিন্দারা। স্থানীয়দের তথ্যমতে, সেন্ট মার্টিনে বর্তমানে প্রায় দুই হাজার ২০০ পরিবারের বসবাস। এর মধ্যে অন্তত দুই হাজার পরিবারই এখন সম্পূর্ণ বেকার হয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছে। আগে যেখানে বছরে ছয় মাস পর্যটন চালু থাকত এবং সাগরে মাছ ধরার ওপর মাত্র ২২ দিনের নিষেধাজ্ঞা ছিল, সেখানে এখন মাছ ধরায় ৬৫ দিনের সরকারি নিষেধাজ্ঞা বলবৎ রয়েছে। 

পাশাপাশি পর্যটন মৌসুম কমিয়ে মাত্র দুই থেকে তিন মাসে নামিয়ে আনায় হাজার হাজার মানুষের আয়ের পথ রুদ্ধ হয়ে গেছে। স্থানীয় বাজার, হোটেল ও পথঘাট এখন খাঁ খাঁ করছে এবং দোকানপাটের তালায় মরিচা ধরেছে। অতিরিক্ত দখল, অপরিকল্পিত অবকাঠামো নির্মাণ এবং প্লাস্টিক দূষণে দীর্ঘদিন ধরে হুমকির মুখে রয়েছে প্রবাল সমৃদ্ধ এই দ্বীপ।

১৯৯৯ সালে সেন্ট মার্টিনের ৫০৯ হেক্টর এলাকাকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা এবং পরবর্তীতে প্রায় এক হাজার ৭৪৩ বর্গকিলোমিটার সমুদ্রাঞ্চলকে সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণা করা হয়। তবে নিষেধাজ্ঞার তোয়াক্কা না করে শত শত অননুমোদিত হোটেল-রিসোর্ট গড়ে উঠেছে। সৈকত সংলগ্ন কেয়াবন কেটে ফেলা এবং ভূগর্ভস্থ অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের কারণে মিষ্টি পানির স্তরে লবণাক্ত পানি ঢুকে মিঠা পানির ভান্ডার ধ্বংসের মুখে পড়েছে।

নভেম্বর থেকে এপ্রিল পর্যন্ত সামুদ্রিক কচ্ছপের প্রজনন মৌসুম হলেও হোটেলগুলোর কৃত্রিম আলো, পর্যটকদের অতিরিক্ত শব্দ এবং ভবঘুরে কুকুরের উপদ্রবে ডিম পাড়ার পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। দ্বীপে মানুষের সমপরিমাণ অন্তত ছয় থেকে সাত হাজার বেওয়ারিশ কুকুরের উৎপাত তৈরি হলেও স্থানীয় হাসপাতালে জলাতঙ্কের প্রতিষেধক নেই। ফলে পরিবেশ বাঁচাতে পর্যটন নিয়ন্ত্রণের সুফল হিসেবে সৈকতে লাল কাঁকড়া ও সামুদ্রিক কচ্ছপের আনাগোনা কিছুটা বাড়লেও কর্মহীন হয়ে পড়া হাজারো দ্বীপবাসীর বিকল্প জীবিকার ব্যবস্থা করা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।