বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, ২০২৬,

৭০-এর দশকেও বিশ্ব দেখেছিল তেল সংকট, এবার কী অপেক্ষা করছে?

আন্তর্জাতিক ডেস্ক

এপ্রিল ৬, ২০২৬, ০৩:০৮ পিএম

৭০-এর দশকেও বিশ্ব দেখেছিল তেল সংকট, এবার কী অপেক্ষা করছে?

সংকটের মুখে বৈশ্বিক জ্বালানি

বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহ পথ হরমুজ প্রণালি এক মাসেরও বেশি সময় ধরে বন্ধ থাকায় বড় ধরণের অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান উত্তেজনার জেরে এই কৌশলগত নৌপথটি অবরুদ্ধ হয়ে পড়ায় বিশ্বব্যাপী তেলের বাজারে অস্থিরতা শুরু হয়েছে। 

আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ ও অর্থনীতিবিদরা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, বর্তমান পরিস্থিতি ১৯৭০-এর দশকের সেই ভয়াবহ তেল সংকটের চেয়েও বড় ধরণের মানবিক ও অর্থনৈতিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। বিশ্বজুড়ে জ্বালানি নিরাপত্তার এই হুমকি এখন ইতিহাসের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে যাওয়ার পথে।

নৌপরিবহন বিশেষজ্ঞ এবং লজিস্টিকস জায়ান্ট মায়ের্সকের সাবেক পরিচালক লার্স জেনসেনের মতে, ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রভাব বৈশ্বিক অর্থনীতিতে যে বিশৃঙ্খলা তৈরি করবে, তা ১৯৭০-এর দশকের সংকটের তুলনায় অনেক বেশি দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে। 

একই ধরণের সতর্কবার্তা দিয়েছেন আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংস্থার প্রধান ফাতিহ বিরোল। তিনি মনে করেন, বর্তমান বিশ্ব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তা ঝুঁকির মুখে দাঁড়িয়ে আছে। বিরোলের ভাষায়, ইউক্রেনে রাশিয়ার আক্রমণের ফলে যে প্রাকৃতিক গ্যাসের সংকট তৈরি হয়েছিল, এবারের ধাক্কা তার চেয়েও বহুগুণ বেশি শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, ১৯৭৩ সালে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের সময় ইসরায়েলকে সমর্থনের প্রতিবাদে তেল সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছিল আরব দেশগুলো। 

সেই সময় তেলের দাম রাতারাতি চার গুণ বেড়ে যাওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মতো উন্নত দেশগুলোর অর্থনীতি স্থবির হয়ে পড়েছিল। শুরু হয়েছিল ব্যাপক মুদ্রাস্ফীতি, বেকারত্ব এবং সামাজিক অস্থিরতা। এমনকি তেলের রেশনিং ব্যবস্থা চালু করার মতো পরিস্থিতিও তৈরি হয়েছিল অনেক দেশে। গবেষক ড. টিয়ার্নান হেনির মতে, সেই সময় তেলের আকাশছোঁয়া দাম অনেক দেশের সামাজিক কাঠামোকে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল, যার রেশ স্থায়ী হয়েছিল দীর্ঘ সময়।

বর্তমান পরিস্থিতিতে উদ্বেগের প্রধান কারণ হলো হরমুজ প্রণালির ওপর বিশ্ববাজারের অতিনির্ভরশীলতা। বিশ্বের মোট তেল ও জ্বালানি সরবরাহের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। গত কয়েক সপ্তাহ ধরে এই পথে জাহাজ চলাচল প্রায় বন্ধ থাকায় উপসাগরীয় অঞ্চল থেকে তেল ও গ্যাস সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। যদিও বর্তমানে মজুদ থাকা তেল থেকে বাজার পরিস্থিতি কিছুটা সামাল দেওয়া হচ্ছে, তবে এই মজুদ ফুরিয়ে এলে সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়বে। লার্স জেনসেনের মতে, যদি অলৌকিকভাবে আগামীকালও এই প্রণালি খুলে দেওয়া হয়, তবুও এর নেতিবাচক প্রভাব বাজারে আগামী ছয় মাস থেকে এক বছর পর্যন্ত স্থায়ী হবে।

সংকট দীর্ঘায়িত হলে এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়বে উন্নয়নশীল দেশগুলোর ওপর। এসব দেশের অর্থনৈতিক সক্ষমতা কম হওয়ায় তারা দীর্ঘমেয়াদি মুদ্রাস্ফীতি মোকাবিলায় হিমশিম খাবে। যদিও বর্তমান বিশ্ববাজার সত্তরের দশকের তুলনায় কিছুটা বেশি বৈচিত্র্যময় এবং অনেক দেশ তেলের বিকল্প উৎস গড়ে তুলেছে, তবুও হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকাটা একটি বড় ধাক্কা হিসেবেই দেখছেন বিশ্লেষকরা। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে দ্রুত যুদ্ধাবস্থার অবসান এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার কোনো বিকল্প নেই বলে মনে করছেন জ্বালানি খাতের পরামর্শকরা। অন্যথায় খাদ্য, পরিবহন এবং শিল্পসহ বিশ্ব অর্থনীতির প্রতিটি খাত ধসে পড়ার এক গভীর অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে।