সোমবার, ০২ নভেম্বর, ২০২৬,

মারাকানা ট্র্যাজেডি থেকে আমাজনের রহস্য: ব্রাজিলের অজানা ইতিহাস

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

জুন ১৪, ২০২৬, ১১:০৫ পিএম

মারাকানা ট্র্যাজেডি থেকে আমাজনের রহস্য: ব্রাজিলের অজানা ইতিহাস

১৯৫০ সালের ১৬ জুলাই রিও ডি জেনেইরোর মারাকানা স্টেডিয়ামে বসা প্রায় দুই লাখ মানুষকে স্তব্ধ করে উরুগুয়ে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে দেয় স্বাগতিক ব্রাজিলকে। নিজেদের মাটিতে নিশ্চিত বিশ্বকাপ জয়ের উৎসব রূপ নেয় এক জাতীয় ট্র্যাজেডিতে, যেখানে মাঠের ভেতরেই বহু মানুষ জ্ঞান হারান। এই পরাজয়ের পর দলের গোলরক্ষক মোয়াসির বারবোসাকে আজীবন জাতীয় শত্রু হিসেবে বিবেচনা করা হয়। 

২০০০ সালে মৃত্যুর আগপর্যন্ত তিনি সম্পূর্ণ একঘরে জীবন কাটাতে বাধ্য হন এবং সাধারণ মানুষ তাঁর হাঁটার রাস্তাও এড়িয়ে চলত।বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি ফুটবল ভক্ত থাকলেও লাতিন আমেরিকার এই বৃহত্তম দেশের ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিক সত্য অনেকেরই অজানা।আয়তনের দিক থেকে বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম এই দেশের মোট ভূখণ্ডের প্রায় ৬০ শতাংশ জুড়েই রয়েছে আমাজন রেইনফরেস্ট। প্রচলিত একটি ভুল ধারণা রয়েছে যে আমাজন বন পুরো বিশ্বের ২০ শতাংশ অক্সিজেন সরবরাহ করে, কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান প্রমাণ করেছে যে এই বনের উদ্ভিদ ও অণুজীব নিজেরাই উৎপাদিত অক্সিজেনের প্রায় সবটুকু ব্যবহার করে ফেলে। 

ফলে বায়ুমণ্ডলে এর নেট অক্সিজেন অবদান প্রায় শূন্যের কাছাকাছি হলেও বৈশ্বিক জলবায়ু ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এই বন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে বিগত জাইর বলসোনারো সরকারের সময় এই বনে অবৈধ নিধন ও অগ্নিকাণ্ড উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাওয়ায় তা বিশ্বজুড়ে তীব্র পরিবেশগত সমালোচনার মুখে পড়েছিল। বনের গহিনে এখনও এমন কিছু আদিবাসী গোষ্ঠী বাস করে যারা আধুনিক সভ্যতার ছোঁয়া পায়নি।

দক্ষিণ আমেরিকার অন্যান্য দেশ স্প্যানিশ ভাষায় কথা বললেও ব্রাজিলের রাষ্ট্রীয় ভাষা মূলত পর্তুগিজ। ১৫০০ সালের দিকে পর্তুগিজ নাবিক পেদ্রো আলভারেস ক্যাবরাল এই অঞ্চলে পৌঁছানোর পর পর্তুগাল পুরো ভূখণ্ড দখলের সিদ্ধান্ত নেয়। ইউরোপীয় উপনিবেশ স্থাপনের এই আগ্রাসী প্রক্রিয়ায় যুদ্ধ, নতুন রোগ এবং দাসত্বের কারণে বিপুল সংখ্যক আদিবাসী জনগোষ্ঠী পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়। পরবর্তীতে আফ্রিকা মহাদেশ থেকে প্রায় ৪৮ লাখ মানুষকে ক্রীতদাস হিসেবে এই দেশে ধরে আনা হয় এবং দীর্ঘ সংগ্রাম শেষে ১৮৮৮ সালে আমেরিকা মহাদেশের সর্বশেষ দেশ হিসেবে ব্রাজিল এই অমানবিক দাসপ্রথার বিলুপ্তি ঘটায়।

১৮০৭ সালে ফ্রান্সের  নেপোলিয়ন বোনাপার্ট পর্তুগাল আক্রমণ করলে প্রাণ বাঁচাতে পর্তুগিজ রাজপরিবার, উচ্চপদস্থ অভিজাত ও সরকারি কর্মকর্তাসহ প্রায় ১০ থেকে ১৫ হাজার মানুষ জাহাজে চড়ে ব্রাজিলে পালিয়ে আসেন। তাঁরা রিও ডি জেনেইরো শহরে আশ্রয় নেন এবং একে পর্তুগিজ সাম্রাজ্যের নতুন রাজধানী হিসেবে ঘোষণা করেন। নেপোলিয়নের পতনের পরও রাজপরিবারের একটি বড় অংশ ইউরোপে ফিরে যায়নি এবং পরবর্তীতে ১৮২২ সালে যুবরাজ দম্পেদ্রো ব্রাজিলকে এক স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করেন।

ব্রাজিলে ফুটবলের যাত্রা শুরু হয়েছিল চার্লস মিলার নামের এক ব্রিটিশ বংশোদ্ভূত নাগরিকের হাত ধরে। ইংল্যান্ডে পড়াশোনা শেষ করে দেশে ফেরার সময় তিনি নিজের লাগেজে দুটি ফুটবল, একটি পাম্প ও নিয়মবই নিয়ে এসেছিলেন। শুরুতে এই খেলাটি কেবল স্থানীয় ধনী ও অভিজাত শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও দ্রুতই তা গরিব ও সাধারণ মেহনতি মানুষের মাঝে ছড়িয়ে পড়ে। শৈশবের চরম দারিদ্র্যের কারণে কিংবদন্তি পেলে ও তাঁর বন্ধুরা অনেক সময় মোজা ও খবরের কাগজ দিয়ে অস্থায়ী বল বানিয়ে খেলতেন এবং পরবর্তীতে এই রাস্তার খেলার নাম হয়ে যায় ‍‍`জোগো বোনিতো‍‍` বা সুন্দর খেলা।

১৯৬৪ সাল থেকে টানা ২১ বছর এই দেশে একনায়কতন্ত্র চালু ছিল যা ১৯৭০ সালের বিশ্বকাপ জয়কে নিজেদের রাজনৈতিক প্রচারণায় ব্যবহার করেছিল। বর্তমান যুগেও দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর ভেতরে দুর্নীতি ও বৈষম্যের তীব্র লড়াই রয়ে গেছে। এত প্রতিকূলতার মাঝেও সাধারণ মানুষের হাসিখুশি থাকার নেপথ্যে রয়েছে দাসপ্রথার ঐতিহাসিক টিকে থাকার এক অনন্য সংগ্রাম। আফ্রিকান দাসদের আত্মরক্ষার গোপন কৌশল ও নৃত্যের সমন্বয় থেকে তৈরি হয়েছিল ‍‍`ক্যাপোয়েরা‍‍` নামের একটি বিখ্যাত মার্শাল আর্ট, আর আফ্রিকান-ব্রাজিলীয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য থেকে বিকশিত হয়েছে বিখ্যাত ‍‍`সাম্বা‍‍` নাচ। পর্তুগিজ ভাষায় ‍‍`সাওদাদে‍‍` নামের একটি বিশেষ শব্দ আছে যার অর্থ চরম কষ্টের মাঝেও এক ধরণের সুখ অনুভব করা, যা মূলত ব্রাজিলীয় জীবনের মূল দর্শন।