সেপ্টেম্বর ২৯, ২০২৬, ০৪:০০ পিএম
মিয়ানমারের প্রায় পাঁচ হাজার রোহিঙ্গা আশ্রয়প্রার্থীকে স্বদেশে ফেরত পাঠানোর আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া শুরু করেছে মালয়েশিয়া সরকার। মিয়ানমারের সামরিক জান্তা প্রধান মিন অং হ্লাইংয়ের প্রশাসনের সঙ্গে স্বাক্ষরিত একটি বিতর্কিত দ্বিপক্ষীয় চুক্তির আওতায় এই বিতর্কিত প্রত্যাবাসন কার্যক্রম শুরু হয়েছে। প্রথম দফায় এক হাজার ৪৭৬ জন রোহিঙ্গাকে নিয়ে মিয়ানমারের নৌবাহিনীর তিনটি বিশেষ জাহাজ মালয়েশিয়ার উপকূল ত্যাগ করার প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো এই প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নিয়ে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।
আন্তর্জাতিক অধিকারকর্মীদের গভীর আশঙ্কা যুদ্ধবিধ্বস্ত মিয়ানমারে ফিরে গেলে এসব রোহিঙ্গা তীব্র মানবিক সহিংসতা, প্রাতিষ্ঠানিক জাতিগত নিপীড়ন এবং দেশটির সামরিক বাহিনীতে বাধ্যতামূলকভাবে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার চরম ঝুঁকির মুখে পড়বেন। মালয়েশিয়ার অভিবাসন কর্তৃপক্ষ এই উদ্যোগকে সম্পূর্ণ স্বেচ্ছামূলক প্রত্যাবাসন বলে দাবি করলেও জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক সংস্থাকে আটককেন্দ্রে থাকা এসব ব্যক্তির সঙ্গে সরাসরি দেখা করা কিংবা তাদের ব্যক্তিগত মতামত নিরপেক্ষভাবে যাচাই করার কোনো ধরনের সুযোগ দেওয়া হয়নি।
আবাসহীন এসব মানুষকে দীর্ঘ সময় ধরে মালয়েশিয়ার বিভিন্ন বন্দিশিবিরে আটক করে রাখা হয়েছিল। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম নিশ্চিত করেছেন যে ফেরত পাঠানো ব্যক্তিদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। মিয়ানমারে নাগরিকত্ব ও মৌলিক অধিকারবঞ্চিত মুসলিম এই সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর বিপুলসংখ্যক মানুষ দেশটির সামরিক জুলুম থেকে আত্মরক্ষায় সাগর পাড়ি দিয়ে মালয়েশিয়ায় আশ্রয় নিয়েছিল। তবে সাম্প্রতিক মাসগুলোতে মালয়েশিয়ার সাধারণ ভোটার ও স্থানীয় জনগণের মধ্যে বিপুল রোহিঙ্গা শরণার্থীর দীর্ঘ উপস্থিতির বিরুদ্ধে তীব্র বিরূপ মনোভাব ও সামাজিক অসন্তোষ গড়ে উঠেছে।
এই অভ্যন্তরীণ চাপ সামাল দিতে গিয়ে মিয়ানমারের জান্তা সরকারের সঙ্গে সরাসরি বোঝাপড়া করা ছাড়া প্রশাসনের সামনে অন্য কোনো বাস্তবসম্মত বিকল্প ছিল না বলে আত্মপক্ষ সমর্থন করেছেন তিনি। আনোয়ার ইব্রাহিমের এই কঠোর অবস্থান তার অতীত রাজনৈতিক দর্শনের ক্ষেত্রে একটি উল্লেখযোগ্য বিপরীতমুখী পরিবর্তনের স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়। সাবেক এই রাজনৈতিক বন্দি আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দীর্ঘদিন নিজেকে সার্বজনীন মানবাধিকার, উদারনৈতিক গণতন্ত্র ও ব্যক্তি স্বাধীনতার একনিষ্ঠ কণ্ঠস্বর হিসেবে তুলে ধরেছেন এবং অতীতে নিপীড়িত রোহিঙ্গাদের পাশে দাঁড়াতে আন্তর্জাতিক মহলে একাধিকবার আহ্বান জানিয়েছিলেন।
এমনকি তার নেতৃত্বাধীন প্রশাসনের সময়ও মালয়েশিয়া মিন অং হ্লাইংয়ের সামরিক শাসনকে প্রকাশ্য রাজনৈতিক স্বীকৃতি দেয়নি এবং মিয়ানমারের দীর্ঘস্থায়ী গৃহযুদ্ধ আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের দাবিতে দক্ষিণ-পূর্ব এশীয় দেশগুলোর জোটের ভেতরে অন্যতম সোচ্চার রাষ্ট্র হিসেবে ভূমিকা পালন করে আসছিল। বর্তমান নীতিনির্ধারণী এই পরিবর্তনের পেছনে দুটি প্রধান অভ্যন্তরীণ কারণ সক্রিয়ভাবে প্রভাব ফেলেছে। প্রথমত বৈশ্বিক মহামারি করোনাভাইরাস পরবর্তী সময়ে মালয়েশিয়ার নিম্ন ও মধ্যম আয়ের সাধারণ নাগরিকদের জীবনে তীব্র অর্থনৈতিক চাপ তৈরি হয়েছে। কর্মসংস্থান ও বাজারদরের এই সংকট সাধারণ মালয়েশীয়দের মধ্যে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর প্রতি বিদ্যমান সহানুভূতি কমিয়ে এনে গভীর অসন্তোষে রূপ দিয়েছে।
দ্বিতীয়ত ২০১৮ সালের ঐতিহাসিক সংসদীয় নির্বাচনের পর থেকেই দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে গভীর মেরুকরণ ও বহুমুখী অস্থিরতা শুরু হয়। ওই নির্বাচনের মাধ্যমে দেশটির স্বাধীনতার পর টানা ছয় দশক শাসন করা দল ইউনাইটেড মালয়স ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন বা ইউএমএনও ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর থেকে কুয়ালালামপুরে একের পর এক ভঙ্গুর জোট সরকার গঠিত হতে থাকে। বহু বছর ধরে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনীর হাতে নির্যাতিত মুসলিমদের প্রতি মালয়েশিয়ার নাগরিকদের মধ্যে ব্যাপক ভ্রাতৃত্ববোধ ও সহানুভূতি ছিল।
বিশেষ করে ২০১৭ সালের আগস্টে রাখাইন রাজ্যে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর পরিকল্পিত নৃশংস অভিযানের মুখে প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা প্রাণভয়ে পালিয়ে প্রতিবেশী বাংলাদেশে শরণার্থী হিসেবে আশ্রয় গ্রহণ করে। পরবর্তীতে কক্সবাজারের শরণার্থী শিবিরের মানবেতর বাস্তবতা ও অনিশ্চিত ভবিষ্যতের কারণে যাদের আর্থিক সামর্থ্য ছিল তাদের একাংশ মানবপাচারকারীদের মাধ্যমে উত্তাল সাগর পাড়ি দিয়ে মালয়েশিয়ায় প্রবেশ করে। উপকূলীয় নজরদারির মাধ্যমে মালয়েশিয়ার নৌবাহিনী ও কোস্টগার্ড শুরুতে অনেক বোট ফিরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলেও শেষ পর্যন্ত প্রায় দুই লাখের বেশি রোহিঙ্গা দেশটিতে বিভিন্নভাবে প্রবেশ করে দীর্ঘ বছর ধরে বসবাস করে আসছে।
এই মানুষদের একটি বড় অংশ সেখানে অনিবন্ধিত অবস্থায় নির্মাণ খাত ও দৈনন্দিন কায়িক শ্রমের কাজে অতি কষ্টে দিনাতিপাত করছে। মহামারির ধাক্কায় মালয়েশিয়ার জনমত হঠাৎ নাটকীয়ভাবে অভিবাসীবিরোধী রূপ নিতে শুরু করে। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ বৃদ্ধির তীব্র ভীতির সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রোহিঙ্গা অভিবাসীদের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত গুজব ও অপপ্রচার ছড়ানো হয় এবং তাদের বিতাড়নের জোরালো দাবি ওঠে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে তৎকালীন সরকারও সুর পাল্টে নতুন কোনো শরণার্থী গ্রহণ না করার কঠোর অবস্থান নেয় এবং অভিবাসী অধ্যুষিত এলাকাগুলোতে ধারাবাহিক অভিযান চালায়।
২০২৬ সালের মে মাসে ঈদুল আজহার কোরবানির পশুর বর্জ্য পরিষ্কার না করার একটি স্থানীয় অভিযোগ তুলে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে অনলাইনে ব্যাপক বিদ্বেষ ছড়ানো হয়। এমনকি তাদের বিরুদ্ধে মালয়েশিয়ার ভূমি ও নাগরিকত্ব দাবি করার মিথ্যা অপবাদ প্রচার করে বহুল ব্যবহৃত পিটিশন ওয়েবসাইটে রোহিঙ্গাদের বহিষ্কারের দাবিতে চার লাখের বেশি মানুষের স্বাক্ষর সংগ্রহ করা হয়েছিল। এমন প্রবল রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপের মুখে নিজের উদারনৈতিক মূল্যবোধ বজায় রাখতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিম।
সম্প্রতি এক দীর্ঘ পডকাস্ট সাক্ষাৎকারে তিনি মন্তব্য করেন যে তাদের আইনগতভাবে গ্রেপ্তার করা যেতে পারে কিন্তু নির্যাতন করা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। তবে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর আনুষ্ঠানিক অভিযোগ মালয়েশিয়ার অভিবাসন বন্দিশিবিরগুলোতে সরকারি কর্মকর্তারা নিয়মিত রোহিঙ্গাদের শারীরিক নির্যাতন ও চরম অবমাননাকর পরিস্থিতির মধ্যে রাখছেন। একই সাক্ষাৎকারে অনমনীয় সুরে আনোয়ার দাবি করেন রোহিঙ্গারা বর্তমানে মালয়েশিয়ার জন্য জাতীয় নিরাপত্তার ঝুঁকি, অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির তীব্র চাপ এবং নাগরিকদের মধ্যে সামাজিক সংঘাতের প্রধান উৎস হিসেবে পরিণত হয়েছে।
তার এই ভূমিকায় একসময়ের রাজনৈতিক সহযোগী ও মানবাধিকারকর্মীরা তীব্র হতাশা প্রকাশ করেছেন। মালয়েশিয়ার দুর্নীতি দমন কমিশনের সাবেক শীর্ষ কর্মকর্তা লতিফা কোয়া এই সিদ্ধান্তকে চরম লজ্জাজনক ও নীতিহীন আখ্যা দিয়ে মন্তব্য করেছেন যে এর মাধ্যমে আন্তর্জাতিক মহলে দেশটির ভাবমূর্তি ধূলিসাৎ হয়ে গেছে। মূলত ২০২২ সালে চরম রাজনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে দীর্ঘকালের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ইউএমএনওকে সঙ্গে নিয়ে একটি নড়বড়ে জোট সরকারের প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন আনোয়ার। এরপর থেকে তার সরকারের জনপ্রিয়তা ধসে পড়েছে এবং সাম্প্রতিক স্থানীয় উপনির্বাচনগুলোতে তার দল শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়েছে। ২০২৮ সালের আসন্ন সাধারণ নির্বাচনকে সামনে রেখে মালয়েশিয়ার সংখ্যাগরিষ্ঠ মালয় ভোটারদের সমর্থন ফিরে পেতেই তিনি এই অভিবাসীবিরোধী নীতি বেছে নিয়েছেন।
নটিংহাম বিশ্ববিদ্যালয় মালয়েশিয়ার এশিয়ান ইনস্টিটিউট ফর পলিসি অ্যান্ড এনগেজমেন্টের পরিচালক ত্রিশিয়া ইয়োহ মনে করেন আনোয়ার ইব্রাহিম বর্তমানে রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে দুর্বল অবস্থায় রয়েছেন। তার বিশ্লেষণ অনুসারে জোটের শরিকদের একের পর এক অন্যায্য দাবি মেনে নেওয়া, একাধিক দুর্নীতির কেলেঙ্কারি এবং নিজের দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে সাধারণ ভোটাররা সরকারের ওপর গভীর আস্থা হারিয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মালয় জনগোষ্ঠী অর্থনৈতিক সংকটের জন্য অভিবাসীদের দায়ী করার যে চরম জাতিগত রাজনীতি সেখানে তৈরি হয়েছে, আনোয়ার ইব্রাহিম কার্যত সেই অন্ধ জনতুষ্টিবাদের রাজনীতির কাছে মাথা নত করেছেন।
কিন্তু রাখাইন রাজ্যের বর্তমান যুদ্ধাবস্থায় মিয়ানমারের ভেতরে রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসন প্রক্রিয়া কীভাবে বাস্তবায়িত হবে তা নিয়ে চরম ধোঁয়াশা রয়ে গেছে। মিয়ানমারের সংবিধান রোহিঙ্গাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দেয় না এবং তাদের নিজ দেশের ভেতরে অবাধ চলাচলের কোনো সাংবিধানিক স্বাধীনতা নেই। বর্তমানে রাখাইন রাজ্যের সিংহভাগ ভৌগোলিক অঞ্চল সেনাবিরোধী সশস্ত্র গোষ্ঠী আরাকান আর্মির সামরিক নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং জান্তা বিমানবাহিনী সেখানে নির্বিচারে বোমাবর্ষণ চালাচ্ছে। এই প্রত্যাবাসন শুরুর মাত্র একদিন আগে কিয়াউকতাও শহরের এক ব্যস্ত বাজারে সামরিক জান্তার বিমান হামলায় ৪৯ জন নিরীহ মানুষ নিহত হয়েছেন। রাখাইনের রাজধানী সিত্তে শহরটি এখনো জান্তা নিয়ন্ত্রণে থাকলেও তা পুরোপুরি অবরুদ্ধ ও যুদ্ধকবলিত, যেখানে রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে পর্যাপ্ত খাবার ও জীবনরক্ষাকারী ওষুধের চরম হাহাকার চলছে।
মানবাধিকার কর্মীদের মূল ভয় মিয়ানমারে পা রাখার সাথে সাথেই রোহিঙ্গা তরুণদের জোরপূর্বক জান্তা সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করে চলমান গৃহযুদ্ধে মানবঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হবে। এমন ভয়াবহ বাস্তবতার সামনে মালয়েশিয়া বা মিয়ানমার কোনো পক্ষই স্পষ্ট করেনি যে তারা কোন নিরাপদ প্রক্রিয়ায় এই প্রত্যাবাসন চালাবে। রোহিঙ্গা শরণার্থী অধিকারকর্মী নুর সাদেক এই অমানবিক সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলেন যে নিজের জন্মভূমিতে সম্মান নিয়ে ফিরে যাওয়ার স্বপ্ন প্রতিটি রোহিঙ্গার রয়েছে, তবে তা হতে হবে নিরাপদ পরিবেশে এবং তাদের নিজস্ব স্বাধীন সম্মতিতে। কোনোভাবেই জোরপূর্বক ঠেলে দিয়ে একটি জনগোষ্ঠীর জীবনকে পুনরায় মৃত্যুর মুখে ফেলে দেওয়া আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের চরম লঙ্ঘন।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন