অক্টোবর ১৪, ২০২৬, ০৩:৫৭ পিএম
আজারবাইজানের সরকারি বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীদের হিজাব পরা নিয়ে নতুন করে তৈরি হওয়া পোশাক বিতর্ক এখন ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে ভূরাজনীতি পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে। রাজধানী বাকুর বিদ্যালয়গুলোতে মাথায় হিজাব পরিহিত শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের প্রবেশে বাধা দেওয়ার ঘটনায় দেশজুড়ে তীব্র আলোচনা ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
২৩ বছর ধরে শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত ইংরেজি শিক্ষিকা গুলশান আলিয়েভা জানান, চলতি সপ্তাহে মাথায় হিজাব পরে বিদ্যালয়ে গেলে তাকে ভেতরে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। একই সঙ্গে বাকুতে অধ্যয়নরত তার মেয়েকেও বিদ্যালয়ে প্রবেশ করতে বাধা দেওয়া হয়েছে।
নিজের পেশাগত ও ব্যক্তিজীবনের এই সংকট নিয়ে আলিয়েভা বলেন, তিনি নিষ্ঠার সাথে দায়িত্ব পালন করে শিক্ষার্থীদের পাঠদান চালিয়ে যেতে চান এবং ধর্মীয় বিশ্বাস যাতে চাকরির পথে অন্তরায় না হয়, সেই অধিকারটুকু চান।
তিনি দেশটির শ্রম আইনের ১৬ নম্বর অনুচ্ছেদের উদ্ধৃতি দিয়ে যুক্তি দেখান, কর্মক্ষেত্রে যেকোনো ধরনের বৈষম্য সৃষ্টি করা আইনের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
গত মাসে দেশটির সরকারের জারি করা নতুন নির্দেশনায় সরাসরি হিজাব নিষিদ্ধ করার কথা স্পষ্টভাবে বলা না হলেও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মনিরপেক্ষতার নীতির সাথে সাংঘর্ষিক পোশাকের ওপর আনুষ্ঠানিক বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে।
শতকরা ৯০ ভাগের বেশি মুসলিম জনসংখ্যার এই দেশটিতে এমন নির্দেশনার পর বিভিন্ন স্থানে প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ে।
নতুন বিধিমালা লঙ্ঘন ও জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত করার অভিযোগে সোমবার দেশটির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ৩৭ জনকে আটক করেছে বলে সরকারিভাবে নিশ্চিত করা হয়েছে।
বিদ্যালয়ে যেতে বাধা পাওয়া শিক্ষিকা গুলশান আলিয়েভা আরও বলেন, কোনো ধরনের প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই কর্মক্ষেত্রে কাজ করার এবং শিক্ষা গ্রহণের সাংবিধানিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। প্রতিকার চেয়ে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ জানানোর কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সমাধান না হওয়া পর্যন্ত তিনি নিয়মিত কর্মস্থলে যাওয়ার চেষ্টা অব্যাহত রাখবেন।
এদিকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে বাকু সিটি শিক্ষা বিভাগ জানিয়েছে, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে নতুন পোশাকবিধি যথাযথভাবে মানা হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত মনিটরিং করা হবে।
বিতর্কিত এই ইস্যুতে ককেশাস মুসলিম বোর্ডের (সিএমবি) চেয়ারম্যান শেখ-উল-ইসলাম আল্লাহশুকুর পাশাজাদে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, হিজাব ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিধান।
তিনি উল্লেখ করেন, নাগরিক হিসেবে সাধারণ মানুষ মতামত প্রকাশ করতে পারলেও বিদ্যালয়ের স্বাভাবিক পরিবেশ বিনষ্ট বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা সমীচীন নয়। বিষয়টি নিয়ে কোনো রাজনৈতিক উদ্দেশ্য খোঁজার সমালোচনা করে তিনি সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সাথে আলোচনার পরামর্শ দেন।
পোশাকবিধি নিয়ে ভিন্নমত
হিজাব সংক্রান্ত সরকারি এই বিধিনিষেধকে সাধারণ নাগরিক ও বিশ্লেষকদের সবাই ব্যক্তিস্বাধীনতার ওপর আঘাত হিসেবে দেখছেন না।
বাকুর স্থানীয় বাসিন্দা তিমুর রাজায়েভের মতে, শিক্ষাঙ্গনে পোশাকের এই ইস্যুটিকে অযথা রাজনৈতিক রূপ দেওয়া হচ্ছে। বিতর্ক না বাড়িয়ে সরকারের নির্ধারিত প্রাতিষ্ঠানিক ইউনিফর্ম ও পোশাকবিধি মেনে চলা উচিত।
তিনি ১৮ বছরের কম বয়সী ছাত্রীদের হিজাব পরার বিরোধিতা করে যুক্তি দেন, অনেক ক্ষেত্রে এটি শিশুদের নিজস্ব সিদ্ধান্তের চেয়ে তাদের অভিভাবকদের পছন্দের প্রতিফলন হয়ে দাঁড়ায়।
আজারবাইজানের ধর্মনিরপেক্ষ নীতিতে বিশ্বাসী নাগরিকদের অনেকের অভিমত, সরকারি আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার সাথে ধর্মীয় রীতিনীতির সংমিশ্রণ ঘটানো ঠিক নয়। তারা মনে করিয়ে দেন, এটি একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হলেও এখানে ধর্মপ্রাণ নাগরিকদের অধিকারকে যথাযথ সম্মান প্রদর্শন করা হয়।
সোভিয়েত আমলে দেশটিতে রাষ্ট্রীয়ভাবে ধর্মীয় অনুশীলনের ওপর কঠোর বিধিনিষেধ জারি ছিল। পরবর্তীতে স্বাধীনতা অর্জনের পর সেই বিধিনিষেধ শিথিল করে ধর্ম পালনের সার্বিক সুযোগ সম্প্রসারিত করা হয়।
দেশটির বিরোধী রাজনৈতিক দল রিয়েল পার্টির প্রধান নাতিগ জাফারলির মতে, শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে একটি বাস্তবসম্মত ও সমঝোতামূলক সমাধান খুঁজে বের করা দরকার।
তিনি মন্তব্য করেন, ছাত্রীদের হিজাবের বিষয়ে খোলামেলা আলোচনার মাধ্যমে বিশেষ করে প্রাথমিক স্তরে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। তবে শিক্ষকেরা প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় তাদের পোশাকের ওপর এমন বিধিনিষেধ চাপানো সঠিক পদক্ষেপ নয়।
তুরস্কের সঙ্গে সম্পর্কে কূটনৈতিক টানাপোড়েন
বিদ্যালয়ের পোশাকবিধি নিয়ে শুরু হওয়া এই অভ্যন্তরীণ বিতর্ক আজারবাইজানের দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ মিত্র তুরস্কের সাথে সম্পর্কেও এক ধরনের কূটনৈতিক অস্বস্তি সৃষ্টি করেছে।
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রজব তাইয়েব এরদোয়ানের সিনিয়র উপদেষ্টা ওকতাই সারাল আজারবাইজানের নেওয়া এই পদক্ষেপকে অগ্রহণযোগ্য বলে আখ্যায়িত করেছেন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় তিনি প্রশ্ন তোলেন, ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে মাথা ঢেকে রাখা একজন শিক্ষার্থীকে বিদ্যালয়ের ফটকে আটকে রাখা কোনোভাবেই ন্যায়বিচার কিংবা মানবিক বিবেকের সাথে সংগতিপূর্ণ হতে পারে না।
এর তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে আজারবাইজানের ক্ষমতাসীন দল নিউ আজারবাইজান পার্টি (ওয়াইএপি) সারালের বক্তব্যকে দায়িত্বজ্ঞানহীন বলে মন্তব্য করেছে। দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়, এমন অনাকাঙ্ক্ষিত মন্তব্য দুই ঐতিহাসিক বন্ধুভাবাপন্ন দেশের কৌশলগত সম্পর্কের ক্ষতি করতে পারে।
আজারবাইজানের পার্লামেন্ট জাতীয় পরিষদের মানবাধিকার বিষয়ক কমিটির চেয়ারম্যান জাহিদ ওরুজ দাবি করেন, এই পদক্ষেপ কোনোভাবেই ধর্মীয় বৈষম্য বা নাগরিকের মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আঘাত নয়।
তিনি উল্লেখ করেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের গণ্ডির বাইরে সাধারণ জীবনে মাথায় স্কার্ফ বা হিজাব পরার ওপর কোনো রাষ্ট্রীয় বাধা নেই। বিদ্যালয়ের ভেতরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটি অভিন্ন শৃঙ্খলা ও পোশাকবিধি বজায় রাখাই মূল উদ্দেশ্য।
তিনি আরও যোগ করেন, দেশটির অনেকেই হয়তো হিজাব পরেন না, তবে তারা ধর্মগ্রন্থ পবিত্র কোরআনকে পরম শ্রদ্ধা করেন এবং সৃষ্টিকর্তায় বিশ্বাস রাখেন। তাই বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক পোশাকবিধিকে ধর্মের প্রতি বৈরিতা হিসেবে উপস্থাপন করা একেবারেই অযৌক্তিক।
এদিকে আজারবাইজানের ন্যাশনাল এনজিও ফোরামও এই বিতর্ককে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার না করার আহ্বান জানিয়েছে।
সংবিধানে ধর্মনিরপেক্ষতা ও ধর্মীয় অধিকারের দ্বন্দ্ব
আজারবাইজানের সংবিধান রাষ্ট্রের চরিত্রকে সম্পূর্ণ ধর্মনিরপেক্ষ হিসেবে নির্ধারণ করেছে।
সংবিধানের ৭ নম্বর অনুচ্ছেদে দেশটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। একইসঙ্গে ১৮ নম্বর অনুচ্ছেদে রাষ্ট্র ও ধর্মকে পৃথক রাখার পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় শিক্ষাব্যবস্থার ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র নিশ্চিতের কথা বলা হয়েছে। অন্যদিকে সংবিধানের ৪৮ নম্বর অনুচ্ছেদে প্রত্যেক নাগরিকের বিবেক ও ধর্মীয় স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে।
একই সাংবিধানিক কাঠামোর অধীনে ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা ও ব্যক্তিস্বাধীনতার এই দুই স্বীকৃত নীতির মধ্যকার সমন্বয় কীভাবে কার্যকর হবে, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
আজারবাইজানভিত্তিক অধিকার সংস্থা টলারেন্স পাবলিক অ্যাসোসিয়েশন ফর সোশ্যাল রিসার্চের চেয়ারম্যান আজার রাশিদোগলুর মতে, নতুন এই প্রশাসনিক বিধিমালা সংবিধানের মূল চেতনার সাথে সংগতিপূর্ণ নয়।
তিনি ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের এই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, অধিকার ক্ষুণ্ন হওয়া ব্যক্তিদের আইনসম্মতভাবে আদালতের মাধ্যমে প্রতিকার চাওয়া উচিত এবং একই সাথে শান্তিপূর্ণ উপায়ে নিজেদের ন্যায্য দাবি জানিয়ে যেতে হবে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন