অক্টোবর ১৪, ২০২৬, ০৪:০৬ পিএম
রাশিয়ায় নির্মাণপ্রতিষ্ঠানে উচ্চ বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে ৩০ জন বাংলাদেশিকে পাচার করার পর দেশটির সেনাবাহিনীর হাতে তুলে দেওয়ার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে তিনটি রিক্রুটিং প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। সেখানে মাত্র ২১ দিনের সংক্ষিপ্ত সামরিক প্রশিক্ষণ শেষে তাদের বাধ্যতামূলকভাবে পাঠানো হয় রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের সম্মুখসারিতে।
যুদ্ধক্ষেত্রে ইউক্রেনীয় বাহিনীর ড্রোন হামলায় অন্তত ২০ জন বাংলাদেশি নিহত হয়েছেন বলে নিশ্চিত তথ্য পেয়েছে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)। বুধবার (১৪ অক্টোবর) রাজধানীর কারওয়ান বাজারে আয়োজিত এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরেন এসআরবি-১০ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক অতিরিক্ত উপমহাপরিদর্শক (ডিআইজি) মোহা. আসাদুজ্জামান।
এই জঘন্য মানবপাচার চক্রের অন্যতম হোতা জাবালে নূর ইন্টারন্যাশনালের প্রতিষ্ঠাতা ৫৫ বছর বয়সী মিজানুর রহমান এবং তার সহযোগী আবু তাহের ওরফে লেন্টুকে গ্রেপ্তার করেছে সংস্থাটি।
এসআরবি জানায়, চলতি বছরের ৭ মে জাবালে নূর, আরএস ইন্টারন্যাশনাল ও টিএস গ্রুপ নামের তিন প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ওই ৩০ জন বাংলাদেশি অভিবাসী রাশিয়ায় পাড়ি জমান। নির্মাণকাজে নিয়োগের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদের প্রত্যেকের কাছ থেকে গড়ে প্রায় ১০ লাখ টাকা করে হাতিয়ে নেয় দালাল চক্র। তবে রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর প্রতিশ্রুত নির্মাণকাজে না দিয়ে তাদের সরাসরি দেশটির সামরিক বাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়। সেখানে মাত্র ২১ দিনের লোকদেখানো প্রশিক্ষণ শেষে তাদের ঠেলে দেওয়া হয় যুদ্ধের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ ফ্রন্টলাইনে।
সংবাদ সম্মেলনে মোহা. আসাদুজ্জামান জানান, বাংলাদেশ থেকে যাদের নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, তারা কেউই যুদ্ধ করার মতো শারীরিক, মানসিক বা কৌশলগতভাবে যোগ্য ছিলেন না। এমনকি আধুনিক যুদ্ধের কোনো ধরনের বাস্তব প্রশিক্ষণ বা পূর্ব অভিজ্ঞতাও তাদের ছিল না।
তিনি উল্লেখ করেন, মূলত প্রতিপক্ষের শক্ত ঘাঁটি ও অবস্থান শনাক্তকরণের কাজে একধরনের টোপ বা মানবঢাল হিসেবে তাদের সম্মুখসারিতে নামানো হয়। যখন প্রতিপক্ষ বাহিনী তাদের ওপর ড্রোন হামলা চালায়, তখন সেই বিস্ফোরণ ও আক্রমণের সূত্র ধরে রাশিয়ার সেনারা শত্রুপক্ষের সঠিক অবস্থান চিহ্নিত করত।
তদন্তে জানা গেছে, যুদ্ধক্ষেত্রে প্রথম ভাগ, মধ্যভাগ ও শেষভাগ—এই তিনটি স্তরে বিভক্ত করে তাদের মোতায়েন করা হয়েছিল। যুদ্ধের প্রথম দিনেই ড্রোন হামলায় ১৭ জন বাংলাদেশি প্রাণ হারান। পরবর্তীতে বিভিন্ন সময়ে আরও তিনজনের মৃত্যুর তথ্য মেলে। ফলে পাচার হওয়া ৩০ জনের মধ্যে অন্তত ২০ জনের মৃত্যুর ব্যাপারে প্রাথমিকভাবে সম্পূর্ণ নিশ্চিত হয়েছে এসআরবি।
জীবিতদের মধ্যে দুই বাংলাদেশি ইতিমধ্যে গুরুতর আহত অবস্থায় দেশে ফিরে আসতে সক্ষম হয়েছেন। তাদের একজনের নাম রাজন।
ভয়াবহ অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে রাজন জানান, যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন হামলায় তার কোমর ভেঙে যায় এবং শরীরের নিচের অংশ পুরোপুরি অবশ হয়ে পড়েছিল। ওই অবস্থাতেই বরফ ও মাটির ওপর বুকের ভরে প্রায় চার কিলোমিটার পথ হামাগুড়ি দিয়ে তিনি পেছনের সেনা ক্যাম্পে পৌঁছান।
এছাড়া বেঁচে যাওয়া বাকি আটজনের মধ্যে দুজন বর্তমানে মস্কোর একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এবং অপর ছয়জন এখনো যুদ্ধক্ষেত্রের বিপদাপন্ন এলাকায় রয়েছেন।
এসআরবির অধিনায়ক জানান, আন্তর্জাতিক এই মানবপাচার নেটওয়ার্কের সঙ্গে স্থানীয় দালালদের পাশাপাশি রাশিয়ার নাগরিক ইগর এবং কিরগিজস্তানের নাগরিক জুলিয়া নামের এক নারী সরাসরি জড়িত রয়েছেন। তাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট তথ্য সংগ্রহ এবং শনাক্তকরণ তৎপরতা চলছে। পাশাপাশি দেশীয় চক্রের অন্যতম পলাতক সদস্য মোস্তাফিজুরকেও গ্রেপ্তারে সাঁড়াশি অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
প্রাথমিক অনুসন্ধানে এসআরবি জানতে পেরেছে, কেবল বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের আরও বেশ কয়েকটি দেশের দরিদ্র নাগরিকদের একইভাবে প্রতারণার মাধ্যমে রাশিয়ার পক্ষে যুদ্ধক্ষেত্রে টেনে নেওয়া হয়েছে। আর বাংলাদেশ থেকে বিশেষ করে গোপালগঞ্জ, ময়মনসিংহ, নারায়ণগঞ্জ, জামালপুর, পাবনা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, ফরিদপুর, রাজবাড়ী ও গাজীপুর জেলা থেকে বহু মানুষকে এ প্রক্রিয়ায় পাচার করা হয়েছে।
ভুক্তভোগীদের প্রায় সবাই প্রান্তিক ও হতদরিদ্র পরিবারের সদস্য। অনেকেই ভিটেমাটি বিক্রি করে কিংবা চড়া সুদে ঋণ নিয়ে উন্নত ভবিষ্যতের আশায় বিদেশে গিয়েছিলেন। স্বজনদের মৃত্যুর মর্মান্তিক খবর পেলেও পরিবারের সদস্যরা এখন মরদেহ দেখার কিংবা দেশে ফিরিয়ে আনার কোনো সুযোগ পাচ্ছেন না। এই পরিস্থিতিতে বিদেশে চাকরির প্রলোভনে অর্থ লেনদেন ও পাড়ি জমানোর আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সরকারি বৈধতা যাচাই করতে সবাইকে বিশেষভাবে সতর্ক থাকার অনুরোধ জানিয়েছে এসআরবি।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন