নভেম্বর ৪, ২০২৬, ০৭:০১ পিএম
চীনা রাজনীতিতে দেশটির শীর্ষ নেতা শি জিনপিংয়ের ক্ষমতার অভূতপূর্ব উত্থান কেবল একজন রাজনেতার দীর্ঘদিন ক্ষমতায় টিকে থাকার সাধারণ ঘটনা নয়। এটি বস্তুত চীনের পুরো রাজনৈতিক, সামাজিক ও প্রশাসনিক কাঠামোর এক বিশাল কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রতিফলন ঘটায়। গত ২০১২ সালে চীনের কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক মনোনীত হওয়ার পর থেকে শি জিনপিং অত্যন্ত সুচিন্তিতভাবে পার্টি, রাষ্ট্রযন্ত্র, সশস্ত্র সামরিক বাহিনী, অর্থনৈতিক খাত ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তাব্যবস্থার ওপর নিজের একক কর্তৃত্ব সম্প্রসারিত করেছেন।
ক্ষমতার এই একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পথে কয়েকটি ঐতিহাসিক সিদ্ধান্ত মূল মাইলফলক হিসেবে কাজ করেছে। এর মধ্যে ২০১৮ সালে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতার মেয়াদসীমা সম্পর্কিত সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা বিলুপ্ত করা, ২০২২ সালে অভূতপূর্ব তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় বহাল থাকা এবং পার্টির সংবিধানে তাঁর রাজনৈতিক দর্শন অন্তর্ভুক্তিকরণ অন্যতম।
তবে আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের মতে, শি জিনপিংয়ের এই অপরিসীম শক্তি কেবল তাঁর ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা বা কঠোর শাসনরীতির ওপর দাঁড়িয়ে নেই। এর পেছনে রয়েছে রাষ্ট্র ও পার্টি কাঠামোর আমূল পুনর্গঠন, আমলাতান্ত্রিক প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ, ব্যপক দুর্নীতিবিরোধী অভিযান, প্রযুক্তিনির্ভর সর্বাত্মক নজরদারি, সামরিক বাহিনীর সংস্কার এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে চীনের প্রভাব বিস্তারের এক সমন্বিত রূপরেখা। পার্টিকে রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণব্যবস্থায় রূপান্তর
শি জিনপিংয়ের প্রথম ও প্রধান কৌশল হলো রাষ্ট্রীয় সকল প্রতিষ্ঠানের ওপর কমিউনিস্ট পার্টির পূর্ণ রাজনৈতিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। চীনে ঐতিহ্যগতভাবেই দল ও সরকারের মধ্যে নিবিড় সম্পর্ক বিদ্যমান ছিল। তবে শি সেই সম্পর্ককে একক কেন্দ্রের অধীনে নিয়ে এসেছেন। অর্থনীতি, জাতীয় নিরাপত্তা, প্রযুক্তি খাত, শিক্ষা, প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা এবং সামাজিক নীতি নির্ধারণে এখন পার্টির প্রত্যক্ষ দিকনির্দেশনা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
এর ফলে নীতিগত বা সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে স্বায়ত্তশাসিত মন্ত্রণালয় বা সরকারি প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানের চেয়ে পার্টি নেতৃত্বের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। গবেষণা প্রতিষ্ঠান কার্নেগি এনডাউমেন্টের ২০২৫ সালের এক প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, শি আমলে পার্টি-রাষ্ট্রব্যবস্থার এই পুনর্গঠন এবং জাতীয় নিরাপত্তা কাঠামোর অভূতপূর্ব সম্প্রসারণের মাধ্যমে বেইজিংয়ের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব হয়েছে। দুর্নীতিবিরোধী অভিযানকে শৃঙ্খলার হাতিয়ারে পরিণত করা
দায়িত্ব গ্রহণের পর ২০১২ সাল থেকে শি জিনপিং দুর্নীতিবিরোধী অভিযানকে তাঁর শাসনের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আসছেন। উচ্চপর্যায়ের প্রভাবশালী সামরিক ও রাজনৈতিক কর্মকর্তা থেকে শুরু করে স্থানীয় প্রশাসনের তৃণমূল কর্মী পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকায় ব্যাপক তদন্ত ও শাস্তিমূলক আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে যেমন প্রকৃত দুর্নীতি দমন হয়েছে, তেমনি পার্টির ভেতরে শি-বিরোধী অনুসারীদের অপসারণ করে কঠোর রাজনৈতিক শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়েছে।
২০২৬ সালের অক্টোবরের শেষ ভাগে অনুষ্ঠিত কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির বিশেষ বৈঠকেও দুর্নীতিবিরোধী এই অভিযান অব্যাহত রাখার দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়। আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের (এপি) প্রকাশিত এক প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, শি জিনপিং ক্ষমতায় আসার পর থেকে পার্টির বিশেষ শৃঙ্খলা বিষয়ক শক্তিশালী সংস্থাগুলো ৮১ লাখের বেশি পৃথক তদন্ত পরিচালনা করেছে। এসব তদন্তের ভিত্তিতে ৭৯ লাখের বেশি কর্মকর্তা ও ব্যক্তির বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনি শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। ফলে দুর্নীতি মোকাবিলার পাশাপাশি শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতি শতভাগ আনুগত্য নিশ্চিত হয়েছে। প্রশাসনে ব্যক্তিগত আনুগত্যকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার প্রদান
আমলাতন্ত্র ও প্রশাসনে শি জিনপিংয়ের ক্ষমতা সুসংহত করার অন্যতম মূল উপায় হলো গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ও পার্টি পদে নিজস্ব বিশ্বস্ত ব্যক্তিদের বসানো। কেন্দ্রীয় পলিটবুরো থেকে শুরু করে প্রাদেশিক পর্যায়ের প্রশাসন পর্যন্ত পেশাগত দক্ষতার চেয়ে রাজনৈতিক আনুগত্য ও পার্টি শৃঙ্খলাকে পদোন্নতির মূল মাপকাঠি করা হয়েছে। এর ফলে কেন্দ্র থেকে প্রেরিত যেকোনো আদেশ দ্রুত বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে।
তবে এই চরম আনুগত্যের নীতির একটি গভীর প্রশাসনিক ঝুঁকিও রয়েছে। স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও পেশাদার দক্ষতার চেয়ে কেবল রাজনৈতিক আনুগত্য বেশি প্রাধান্য পেলে আমলাতন্ত্রে সৃজনশীল উদ্যোগ ও স্বাধীন জবাবদিহিতার মারাত্মক ঘাটতি দেখা দিতে পারে। মার্কিন গবেষণা প্রতিষ্ঠান ব্রুকিংসের ২০২৬ সালের অক্টোবরের এক পর্যালোচনায় শীর্ষ প্রশাসনে ধারাবাহিক রদবদল এবং আস্থাভিত্তিক এই নিয়োগ ব্যবস্থার জটিল রূপটি স্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে। রাষ্ট্রপতির মেয়াদসীমা বিলুপ্ত ও দীর্ঘমেয়াদি শাসনের ভিত্তি
২০১৮ সালে চীনের জাতীয় সংসদে সংবিধান সংশোধনের মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির টানা দুই মেয়াদে দায়িত্ব পালনের সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা আনুষ্ঠানিকভাবে বাতিল করা হয়। এই আইনি পরিবর্তনের ফলে শি জিনপিংয়ের তৃতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার পথ উন্মুক্ত হয়। পরবর্তীতে ২০২২ সালের ২০তম পার্টি কংগ্রেসে তিনি তৃতীয়বারের মতো কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। মাও সে তুং-পরবর্তী চীনা রাজনৈতিক ইতিহাসে শি জিনপিং ছাড়া অন্য কোনো নেতা এভাবে টানা তিন মেয়াদে দলের সর্বময় প্রধানের দায়িত্বে আসতে পারেননি।
চীনে রাষ্ট্রপতির মেয়াদসীমা তুলে দেওয়া মূলত পার্টির সাধারণ সম্পাদক পদের নিয়ন্ত্রণকে সুনির্দিষ্ট করে। কারণ চীনেই কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক পদই হলো রাজনৈতিক ক্ষমতার আসল কেন্দ্রবিন্দু। পার্টির ভেতরে তাঁর অবস্থান এবং ক্ষমতার কোনো যোগ্য উত্তরসূরি নির্ধারণ না করায় শি জিনপিংয়ের অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্ষমতায় থাকার পরিবেশ তৈরি হয়েছে। পিপলস লিবারেশন আর্মির ওপর সরাসরি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা
চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ) কোনো সাধারণ রাষ্ট্রের প্রচলিত প্রতিরক্ষা বাহিনী নয়; এটি সরাসরি কমিউনিস্ট পার্টির সশস্ত্র শাখা। শি জিনপিং কেন্দ্রীয় সামরিক কমিশনের (সিএমসি) চেয়ারম্যান হিসেবে এই বাহিনীর সর্বাধিনায়কের পদে অধিষ্ঠিত। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই তিনি সামরিক সংস্কার, আধুনিক অস্ত্রায়ন, কমান্ড কাঠামোর পরিবর্তন এবং বাহিনীর ভেতরে রাজনৈতিক আনুগত্য নিশ্চিত করাকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়েছেন।
এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে চীনের সামরিক বাহিনীর অন্যতম দুই শীর্ষ কর্মকর্তা ঝাং ইউশিয়া এবং লিউ ঝেনলিকে দুর্নীতি ও শৃঙ্খলা ভঙ্গের তদন্তের আওতায় আনা হয়। আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা সিএসআইএসের ২০২৬ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারির এক গবেষণা অনুযায়ী, ২০২২ সালের পর থেকে দেশটির শতাধিক জ্যেষ্ঠ সামরিক কর্মকর্তা পদে অপসারিত হয়েছেন কিংবা হঠাৎ রাজনৈতিক পরিমণ্ডল থেকে দৃশ্যপটের আড়ালে চলে গেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, বাহিনীর ভেতর থেকে দুর্নীতি দূর করা এবং রাষ্ট্রপ্রধানের প্রতি শতভাগ রাজনৈতিক আনুগত্য নিশ্চিত করাই এসব কঠোর পদক্ষেপের আসল উদ্দেশ্য। তবে লাগাতার এই ছাঁটাইয়ের ফলে সামরিক নেতৃত্বের রণকৌশলগত অভিজ্ঞতা ও যুদ্ধপ্রস্তুতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। প্রযুক্তিনির্ভর ডিজিটাল নজরদারি ও তথ্যপ্রবাহ রোধ
আধুনিক বেইজিংয়ের শাসন পরিচালনায় প্রযুক্তি এখন সামাজিক ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণের প্রধানতম হাতিয়ার। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও ডিজিটালাইজেশনের সমন্বয়ে মুখ সনাক্তকরণ প্রযুক্তি (ফেসিয়াল রিকগনিশন), কঠোর ইন্টারনেট সেন্সরশিপ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নিবিড় পর্যবেক্ষণ এবং নাগরিকদের জন্য প্রস্তাবিত ডিজিটাল পরিচয় ব্যবস্থার মাধ্যমে রাষ্ট্রের নজরদারি ক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি করা হয়েছে।
জার্মানিভিত্তিক গবেষণা সংস্থা মেরকেটর ইনস্টিটিউট ফর চায়না স্টাডিজের (মেরিকস) ২০২৫ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, পার্টি কেবল কেন্দ্রীয় প্রশাসনেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং গ্রামের স্থানীয় সম্প্রদায়, উদীয়মান শহর এবং বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানেও নিজেদের রাজনৈতিক উপস্থিতি সম্প্রসারিত করেছে। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে বেইজিং কর্তৃক জাতীয় ডিজিটাল পরিচয়ব্যবস্থা চালুর বৃহৎ উদ্যোগ মূলত এই ব্যাপক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থারই অংশ, যার ফলে যেকোনো নাগরিকের দৈনন্দিন অর্থনৈতিক ও সামাজিক কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করা রাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত সহজ হয়ে পড়েছে। জাতীয় নিরাপত্তাকে রাষ্ট্র পরিচালনার মূল দর্শনে রূপান্তর
শি জিনপিংয়ের নীতিতে `জাতীয় নিরাপত্তা` ধারণাটি কেবল সীমান্ত রক্ষা বা সামরিক গোয়েন্দা তৎপরতায় সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি। বর্তমানে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, খাদ্য নিরাপত্তা, জ্বালানি সরবরাহ, প্রযুক্তি উদ্ভাবন, সাইবার নিরাপত্তা, শিক্ষা ব্যবস্থা এবং সার্বিক সামাজিক স্থিতিশীলতাকেও জাতীয় নিরাপত্তার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
এই লক্ষ্য বাস্তবায়নে ২০১৫ সালের জাতীয় নিরাপত্তা আইন, ২০১৬ সালের সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০১৭ সালের জাতীয় গোয়েন্দা আইন, ২০২১ সালের উপাত্ত নিরাপত্তা আইন এবং ২০২৩ সালের পরিবর্তিত ড্রাফটে গুপ্তচরবৃত্তি বিরোধী আইনের সংশোধন করা হয়। কার্নেগির আন্তর্জাতিক গবেষণায় বলা হয়েছে, শি আমলে অর্থনীতির প্রবৃদ্ধির মতোই জাতীয় নিরাপত্তাকে সমপরিমাণ গুরুত্ব দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করা হচ্ছে। এর ফলে রাষ্ট্রের ওপর কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি পেলেও সাধারণ নাগরিকের স্বাধীন মতপ্রকাশ ও মুক্ত ব্যবসায়িক পরিবেশ নিয়ে আন্তর্জাতিক স্তরে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। বেসরকারি খাত ও বৃহৎ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানকে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণে আনা
গত কয়েক দশকে চীনের অভূতপূর্ব অর্থনৈতিক সাফল্যের পেছনে দেশটির বেসরকারি উদ্যোক্তা ও বিশ্বখ্যাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাপক অবদান ছিল। কিন্তু শি জিনপিংয়ের শাসনামলে এসব মুক্ত ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের ওপর কমিউনিস্ট পার্টির কৌশলগত প্রভাব ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করা হয়েছে। বর্তমানে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স, সেমিকন্ডাক্টর, আধুনিক শক্তি উৎপাদন ও সামরিক প্রযুক্তির সংবেদনশীল বেসরকারি ক্ষেত্রগুলোকে রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার সাথে যুক্ত হতে বাধ্য করা হচ্ছে।
২০২৫ সালের মার্চে অনুষ্ঠিত চীনের বার্ষিক দুই অধিবেশন নিয়ে প্রকাশিত সাউথ এশিয়ান ইনস্টিটিউট `অবজারভার রিসার্চ ফাউন্ডেশন`-এর এক গবেষণায় সরকারের এই সর্বাত্মক নিয়ন্ত্রণ নীতিকে `জিনট্রালাইজেশন` (Xentralization) নামে অভিহিত করা হয়েছে। এর সহজ অর্থ হলো বাণিজ্য ও প্রযুক্তির যাবতীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্বান্ত সরাসরি শীর্ষ নেতৃত্বের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসা। একইভাবে মেরিকসের ২০২৬ সালের গবেষণাতেও দেখানো হয়েছে যে, দেশি-বিদেশি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে এখন থেকে পার্টি নির্ধারিত জাতীয় কৌশলগত লক্ষ্যের সাথে সামঞ্জস্য রেখে ব্যবসা পরিচালনা করতে হচ্ছে। জাতীয়তাবাদ, ‘চীনা স্বপ্ন’ ও ভৌগোলিক সার্বভৌমত্বের রাজনীতি
শি জিনপিং তাঁর শাসনের রাজনৈতিক আদর্শের কেন্দ্রে স্থাপন করেছেন ‘চীনা স্বপ্ন’ (Chinese Dream) এবং জাতীয় পুনর্জাগরণের চেতনাকে। তাঁর জনসমাবেশের বিভিন্ন বক্তব্যে চীনের প্রাচীন ঐতিহাসিক মর্যাদা পুনরুদ্ধার, জাতীয় ঐক্যসুদৃঢ়করণ, প্রযুক্তিগত আত্মনির্ভরশীলতা অর্জন এবং বিশ্বমঞ্চে বিশ্বশক্তি হিসেবে বেইজিংকে প্রতিষ্ঠার আহ্বান বারবার উচ্চারিত হয়।
এই জাতীয়তাবাদী রাজনীতির মাধ্যমে দেশের সামগ্রিক জনগোষ্ঠীকে একটি একক রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের অধীনে ঐক্যবদ্ধ করা সম্ভব হয়েছে। তাইওয়ান ইস্যু, বিতর্কিত দক্ষিণ চীন সাগরে আধিপত্য বিস্তার, এবং যুক্তরাষ্ট্রের সাথে বৈশ্বিক কৌশলগত প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে চীনের আক্রমণাত্মক অবস্থানও এই জাতীয়তাবাদী চেতনার ওপর ভিত্তি করেই পরিচালিত হচ্ছে। তবে অতিরিক্ত জাতীয়তাবাদী আবেগের রাজনৈতিক ব্যবহারের ফলে অভ্যন্তরীণ ভিন্নমত দমিত হওয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক পরাশক্তিগুলোর সাথে সমঝোতার সুযোগ দিন দিন সংকুচিত হয়ে পড়ছে। অস্ট্রেলিয়ার লোই ইনস্টিটিউটের ২০২৫ সালের এক বিশ্লেষণে দেখা যায়, শি-র বৈশ্বিক কৌশলের সাথে দেশটির সামরিক শক্তি অর্জন ও জাতীয় পুনর্জাগরণের সুগভীর যোগসূত্র রয়েছে। বিকল্প বৈশ্বিক নেতৃত্ব ও আন্তর্জাতিক প্রভাব বিস্তার
শি জিনপিংয়ের ক্ষমতা সংহত করার কৌশল আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতেও দৃশ্যমান। বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই), অবকাঠামো খাতে বিশাল বিনিযোগ, দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যিক চুক্তি, প্রযুক্তি রপ্তানি এবং এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার উন্নয়নশীল দেশগুলোর সাথে সুসম্পর্ক গড়ে তোলার মাধ্যমে চীন বিশ্বমঞ্চে নিজের প্রভাব ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করেছে।
একই সাথে ব্রিকস (BRICS) জোট এবং সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার (SCO) মতো উদীয়মান আন্তর্জাতিক মঞ্চগুলোতে সক্রিয় ভূমিকা রেখে বেইজিং পশ্চিমা বিশ্ব পরিচালিত আন্তর্জাতিক কাঠামোর বিপরীতে একটি বিকল্প বিশ্বব্যবস্থার নেতৃত্ব দেওয়ার চেষ্টা করছে। চীনের এই ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও সামরিক সক্ষমতা শি জিনপিংকে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে আরও বেশি দৃঢ় ও আত্মবিশ্বাসী ভূমিকা পালনের সুযোগ দিয়েছে। ক্ষমতার এই কেন্দ্রীভূতকরণের আড়ালে তৈরি হওয়া বড় ঝুঁকিগুলো
শি জিনপিংয়ের হাতে ক্ষমতার এই অভূতপূর্ব কেন্দ্রীভূতকরণের অর্থ এই নয় যে চীন সকল ক্ষেত্রে ভেতর থেকে সমান শক্তিশালী হচ্ছে। বরং বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সব ক্ষমতা একক ব্যক্তির হাতে আসার ফলে চীনের শাসনব্যবস্থায় অন্তত ৪টি বড় ধরনের নতুন কাঠামোগত ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
প্রথমত, প্রশাসনে অতিরিক্ত আনুগত্যের সংস্কৃতি তৈরি হওয়ায় অধস্তন আমলা ও কর্মকর্তারা যেকোনো প্রশাসনিক ভুলের দায়ভার নিজের কাঁধে নিতে ভয় পাচ্ছেন, যার ফলে আমলাতান্ত্রিক স্থবিরতা দেখা দিচ্ছে।
দ্বিতীয়ত, সামরিক বাহিনীতে লাগাতার ছাঁটাই ও তদন্তের ফলে অভিজ্ঞ এবং দক্ষ নেতৃত্বের বড় ধরনের শূন্যতা তৈরি হচ্ছে।
তৃতীয়ত, বেসরকারি খাতে সরকারের অতিরিক্ত হস্তক্ষেপ মুক্ত বাজার ও নতুন উদ্যোক্তাদের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের পথ রুদ্ধ করে দিচ্ছে।
চতুর্থত, সর্বাত্মক প্রযুক্তিগত নজরদারি এবং সাধারণ মতপ্রকাশের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ভেতরে ভেতরে সামাজিক অসন্তোষ দানা বাঁধার ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে।
মার্কিন চিন্তাবিদ প্রতিষ্ঠান ব্রুকিংসের ২০২৬ সালের ২৩ অক্টোবরের পর্যালোচনায় উল্লেখ করা হয়েছে, সামরিক বাহিনী ও পার্টি নেতৃত্বের উচ্চপর্যায়ে ক্রমাগত অপসারণ অভিযানের মাধ্যমে শি নিজের একক কর্তৃত্ব সাময়িকভাবে প্রতিষ্ঠা করলেও, শাসন পরিচালনার জন্য একটি নতুন নির্ভরযোগ্য বিশ্বস্ত টিম গড়ে তুলতে তিনি বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছেন। বিশ্লেষকদের মতে, লাগাতার শুদ্ধি অভিযান একসময় খোদ শীর্ষ নেতৃত্বের ভেতরে চরম আস্থার সংকট তৈরি করতে পারে।
শি জিনপিংয়ের ক্ষমতার এই অভূতপূর্ব বৃদ্ধির মূল দিকটি হলো—তিনি কেবল রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পদে বসে নেই, বরং সামরিক বাহিনী, অর্থনীতি, আধুনিক প্রযুক্তি, জাতীয় নিরাপত্তা এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতির প্রতিটি ক্ষেত্রকে সরাসরি পার্টির কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণে নিয়ে এসেছেন।
তবে শি-র এই ব্যক্তিগত ক্ষমতা বৃদ্ধিকে চীনের অর্থনৈতিক বা সামাজিক সক্ষমতা বৃদ্ধির সমার্থক হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ইতিহাস বলে, ব্যক্তিকেন্দ্রিক শাসনব্যবস্থা যত শক্তিশালী হয়, ভুল রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত সংশোধনের প্রাতিষ্ঠানিক পথ তত বেশি সংকুচিত হয়ে পড়ে।
এখন বিশ্ব রাজনীতির সামনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—শি জিনপিং কি একটি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে শক্তিশালী আধুনিক চীন গড়ে তুলছেন যা তাঁর ক্ষমতার পরেও স্থায়ী থাকবে, নাকি এমন একটি ভঙ্গুর ক্ষমতাকাঠামো তৈরি করছেন যার ভবিষ্যৎ স্থায়িত্ব সম্পূর্ণরূপে কেবল একজন ব্যক্তির উপস্থিতির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে? আগামী দিনে বেইজিংয়ের রাজনীতির সবচেয়ে বড় কৌতূহল হয়ে থাকবে এটিই।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন