বুধবার, ০৪ নভেম্বর, ২০২৬,

প্রাথমিক শিক্ষায় নতুন মনিটরিং ও কারিকুলাম পরিমার্জন, বললেন প্রতিমন্ত্রী

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

নভেম্বর ৪, ২০২৬, ০৭:৩৪ পিএম

প্রাথমিক শিক্ষায় নতুন মনিটরিং ও কারিকুলাম পরিমার্জন, বললেন প্রতিমন্ত্রী

দেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় গুণগত ও দৃশ্যমান ইতিবাচক পরিবর্তন আনার লক্ষ্যে নতুন মনিটরিং নীতিমালা প্রণয়ন এবং পরিমার্জিত কারিকুলাম চালু করার সর্বাত্মক উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।

বুধবার (৪ নভেম্বর) হবিগঞ্জ জেলার মাধবপুর উপজেলার একাধিক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সরেজমিনে পরিদর্শনকালে এসব পরিকল্পনার কথা জানান প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ।

বিদ্যালয় পরিদর্শনের সময় প্রতিমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন, শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের কেবল উপস্থিতি নিশ্চিত করাই শেষ কথা নয়; প্রতিটি শিশু প্রকৃতপক্ষে কতটা শিখতে পারছে, শিক্ষকদের পাঠদানের গুণগত মান কেমন এবং প্রতিটি বিদ্যালয়ের সার্বিক প্রশাসনিক ও শিক্ষাদানের কার্যক্রম কতটা কার্যকরের সাথে পরিচালিত হচ্ছে—এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নতুন আধুনিক মনিটরিং ব্যবস্থার আওতায় এনে অত্যন্ত নিবিড়ভাবে তদারকি করা হবে। একই সাথে শিশুদের বয়স ও মানসিক সক্ষমতার সাথে সামঞ্জস্য রেখে বিজ্ঞানসম্মত ও আনন্দময় শিখন নিশ্চিত করতে বর্তমান কারিকুলাম পরিমার্জনের কাজ দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে।

পরিদর্শনকালে বিদ্যালয়ের সম্মানিত প্রতিষ্ঠাতা, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, স্কুল ম্যানেজমেন্ট কমিটির (এসএমসি) সক্রিয় সদস্য, প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের দায়িত্বশীল ও আন্তরিক ভূমিকার ভূয়সী প্রশংসা করেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি মন্তব্য করেন যে, শিক্ষার্থীদের প্রতি শিক্ষকদের নিবিড় পরিচর্যা, ব্যবস্থাপনা কমিটির সজাগ উপস্থিতি ও স্থানীয় বাসিন্দাদের যৌথ প্রচেষ্টা যেকোনো প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার সার্বিক পরিবেশ আমূল বদলে দিতে পারে। এ সময় তিনি সংশ্লিষ্ট সকলকে আন্তরিক ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।

পরিদর্শনের একপর্যায়ে প্রতিমন্ত্রী দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র-ছাত্রীদের মাঝে সরকার নির্ধারিত মিড-ডে মিলের খাবার সরাসরি বিতরণ করেন এবং রান্না করা খাবার সংরক্ষণ ও পরিচ্ছন্নভাবে বিতরণ কার্যক্রম পরীক্ষা করেন। এর পাশাপাশি তিনি বিদ্যালয়ের মা সমিতির সদস্যদের সাথে বিশেষ মতবিনিময় সভায় অংশ নেন, শ্রেণিকক্ষের নিজস্ব লাইব্রেরি কার্যক্রম ঘুরে দেখেন, মনোনীত বুক ক্যাপ্টেনদের সাথে কথা বলেন এবং বিদ্যালয়ের নিজস্ব বাগান ও ‍‍`লিটল এগ্রিকালচারিস্ট ক্লাব‍‍`-এর শিশু সদস্যদের সাথে ভাববিনিময় করেন। কোমলমতি শিশুদের মাঝে নিয়মিত পাঠাভ্যাস, শারীরিক পুষ্টি, পরিবেশ সচেতনতা এবং বাস্তবভিত্তিক ব্যবহারিক শিক্ষার প্রসারে এই রূপ উদ্যোগের অপরিসীম গুরুত্ব তুলে ধরেন তিনি।

দেশের স্কুল ফিডিং কর্মসূচির সার্বিক অগ্রগতি সম্পর্কে ববি হাজ্জাজ জানান, সরকার ইতোমধ্যে দেশের ১০০টি নির্বাচিত উপজেলায় রাষ্ট্রীয় অর্থায়নে স্কুল ফিডিং কর্মসূচি আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করেছে। আগামী বছরের মধ্যে পর্যায়ক্রমে দেশের সবকটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এই খাদ্য সহায়তা সম্প্রসারণের স্পষ্ট রূপরেখা ও পরিকল্পনা রয়েছে। মাধবপুর উপজেলায় বর্তমানে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) শতাধিক প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বিশেষ স্কুল ফিডিং কার্যক্রম চালনা করছে। সরকারের চলমান কর্মসূচির সাথে আন্তর্জাতিক এই সংস্থার অর্জিত অভিজ্ঞতা ও মাঠপর্যায়ের কাজের পার্থক্য সরাসরি পর্যালোচনা করাই এই জেলা সফরের মূল লক্ষ্য।

প্রতিমন্ত্রী আরও বলেন, কোথায় কী ধরনের দৃষ্টান্তমূলক ভালো উদ্যোগ বাস্তবায়িত হচ্ছে, কোন সুনির্দিষ্ট পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীদের জন্য বেশি সুফল আনা যাচ্ছে এবং কোথায় প্রশাসনিক উন্নতির অবকাশ রয়ে গেছে—তা সরাসরি পর্যবেক্ষণ করে শেখার সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ডব্লিউএফপির মাঠপর্যায়ের অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করে যেসব উদ্যোগ বাংলাদেশের সমাজ ও অর্থনীতির বাস্তবতায় কার্যকর প্রমাণিত হবে, সেগুলোকে পরবর্তীতে সরকারের নিজস্ব জাতীয় কর্মসূচিতে আনুষ্ঠানিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করা হবে।

পরবর্তীতে তিনি স্থানীয় জগদীশপুর চা-বাগান সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় সরেজমিনে পরিদর্শন করেন। সেখানে তিনি উপস্থিত কোমলমতি শিক্ষার্থীদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা কার্যক্রম গভীর মনোযোগের সাথে পর্যবেক্ষণ করেন এবং শিশুদের প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি ও সার্বিক সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে পরিচালিত কর্মসূচিগুলোর সার্বিক খোঁজখবর নেন। উল্লেখ্য, মাধবপুর উপজেলার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের কৃষি বিভাগের (ইউএসডিএ) আর্থিক সহায়তায় পরিচালিত ‍‍`ম্যাকগভার্ন-ডোল ফুড ফর এডুকেশন‍‍` কর্মসূচির আওতায় বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি এই ফিডিং কার্যক্রম বাস্তবায়ন করে আসছে। এই সমন্বিত উদ্যোগে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও), রুম টু রিড এবং সিএনআরএস অংশীদার প্রতিষ্ঠান হিসেবে কাজ করছে।

প্রাথমিক শিক্ষার নতুন কারিকুলাম রূপায়ন প্রসঙ্গে মন্ত্রী স্পষ্ট করেন যে, শিক্ষার্থীদের বয়স, অনুধাবন ক্ষমতা ও আধুনিক শিখন চাহিদার সাথে নিখুঁত সামঞ্জস্য রেখে একটি পরিমার্জিত ও আধুনিক কারিকুলাম তৈরির দায়িত্ব জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ডকে (এনসিটিবি) প্রদান করা হয়েছে। নতুন এই পরিমার্জিত কারিকুলামে বিভিন্ন বিদ্যালয়ের মধ্যে বিদ্যমান শিখন ঘণ্টার বৈষম্য পুরোপুরি দূর করা, বিষয়ভিত্তিক পাঠদান ও উপকরণগুলোকে অধিকতর বিজ্ঞানসম্মত ও সহজবোধ্য করা এবং শিক্ষার্থীদের স্রেফ মুখস্থবিদ্যার বদলে প্রকৃত অনুধাবন ও বাস্তব দক্ষতা অর্জনের ওপর সর্বোচ্চ জোর দেওয়া হচ্ছে। এর পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের নৈতিক শিক্ষা, শারীরিক খেলাধুলা ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক চর্চাকে পাঠ্যক্রমের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে।

প্রতিমন্ত্রী পরিশেষে পুনর্ব্যক্ত করেন, প্রাথমিক শিক্ষার সত্যিকারের উন্নয়ন কেবল নতুন একাডেমিক ভবন নির্মাণ বা খাতায় উপস্থিতি বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো প্রতিটি শিশু শ্রেণিকক্ষে এসে প্রকৃত জ্ঞান অর্জন করছে কি না। এই মূল লক্ষ্য অর্জনে অবকাঠামোগত ব্যবস্থাপনা, মানসম্মত পাঠদান, পুষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা, সহশিক্ষামূলক কর্মকাণ্ড এবং প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা—সবকটি ক্ষেত্রে একটি সমন্বিত ও শক্তিশালী রূপরেখা দরকার।

উক্ত পরিদর্শনকালে বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) বাংলাদেশের হেড অব প্রোগ্রাম জেসি উড এবং সংস্থাটির স্কুল ফিডিং বিষয়ক প্রোগ্রাম পলিসি অফিসার এমা লেফু উপস্থিত ছিলেন। এ ছাড়া স্থানীয় সংসদ সদস্য, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা, জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের কর্তাব্যক্তি, স্থানীয় শিক্ষা কর্মকর্তা, শিক্ষক, অভিভাবক ও এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ সেখানে উপস্থিত ছিলেন।