নভেম্বর ৪, ২০২৬, ০৭:১০ পিএম
যুক্তরাষ্ট্রের সাথে যেকোনো কূটনৈতিক সমঝোতার মাধ্যমে ওয়াশিংটনের দীর্ঘদিনের মধ্যপ্রাচ্য ও ইরানবিষয়ক নীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে—এমন আশা প্রকাশ করাকে সম্পূর্ণ ভুল ও অবাস্তব বলে মন্তব্য করেছেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ মুজতবা হোসেইনি খামেনি।
জাতীয় সাম্রাজ্যবাদবিরোধী দিবস উপলক্ষে প্রচারিত বিশেষ এক বার্তায় তিনি সর্বাত্মক প্রতিরোধ সক্ষমতা অর্জনের স্বার্থে জাতীয় রাজনৈতিক ঐক্য, টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও সার্বিক বস্তুগত-নৈতিক অগ্রগতির মাধ্যমে একটি ‘আরও শক্তিশালী ইরান’ গড়ে তোলার জোর আহ্বান জানান।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম আইআরআইবি-এর বিশেষ প্রতিবেদনের বরাতে প্রকাশিত এই বারতায় ৪ নভেম্বর (১৩ অবন) তারিখটিকে ‘সত্যের পক্ষের শক্তির সাথে অসত্যের পক্ষের শক্তির প্রত্যক্ষ মুখোমুখি অবস্থানের চিরন্তন প্রতীক’ হিসেবে চিহ্নিত করেন মুজতবা খামেনি।
তিনি উল্লেখ করেন, বিভিন্ন সময়ে ইরানের স্বাধীনতাকামী জনগণের বিরুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক দশকের প্রকাশ্য বৈরিতা ও শত্রুতার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দুই দেশের মূল বিরোধের প্রকৃত ধরণ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তাঁর মতে, শুধু ১৩ অবন নয়, বরং বর্তমান বাস্তবতায় প্রতিটি দিন ও প্রতিটি ঘণ্টাই ‘মহাশয়তান’ বলে অভিহিত মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে ইরানি জনগণের আপসহীন প্রতিরোধ ও সংগ্রামের সময়।
ঐতিহাসিক পে প্রেক্ষাপট বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ১৯৫৩ সালের ২৮ মোরদদ অভ্যুত্থান থেকে শুরু করে দেশে ইসলামি বিপ্লবের পূর্বাপর বিভিন্ন বিধ্বংসী ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের নেতিবাচক ভূমিকার তীব্র সমালোচনা করেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা।
তিনি অভিযোগ করেন, ইরানের তেলসহ মূল্যবান জাতীয় সম্পদের ওপর একচ্ছত্র কর্তৃত্ব বজায় রাখার হীন উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্র সেই সময় ষড়যন্ত্রমূলক অভ্যুত্থান ঘটিয়েছিল। পরবর্তীতে নিপীড়নমূলক সাভাক সংস্থা প্রতিষ্ঠা, স্বৈরশাসনকে পূর্ণ মদদ প্রদান এবং ইসলামি বিপ্লব নস্যাৎ করতে ওয়াশিংটন নানামুখী জটিল কৌশল অবলম্বন করে।
বার্তায় আরও দাবি করা হয়, ১৯৭৯ সালের সফল ইসলামি বিপ্লবের পরও মার্কিন প্রশাসন ক্ষান্ত না হয়ে বিভিন্ন বিচ্ছিন্নতাবাদী সশস্ত্র গোষ্ঠী, সামরিক অভ্যুত্থানকারী ও মোনাফেকিনদের প্রত্যক্ষ সমর্থন জুগিয়েছে। একই সাথে তৎকালীন ইরাকের বাথ সরকারকে সাময়িক সহযোগিতা প্রদান, ইরানের নিরীহ যাত্রীবাহী বিমান ধ্বংস করা, দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপ, ভেতরে গৃহদাহ ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিতে ইন্ধন এবং সিপাহে পাসদারানের জেনারেল কাসেম সোলায়মানিকে পরিকল্পিতভাবে হত্যার ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্র সরাসরি সম্পৃক্ত ছিল।
পরবর্তীকালে দ্বিতীয় ও তৃতীয় চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের সময় সরাসরি সামরিক আগ্রাসন চালানের মাধ্যমে মার্কিন বাহিনী ইরানের অনেক শীর্ষবিজ্ঞানী, চৌকস সামরিক কমান্ডার ও সাধারণ নাগরিককে হত্যা করেছে বলে অভিযোগ তোলেন মুজতবা খামেনি।
তবে মধ্যপ্রাচ্য ও আন্তর্জাতিক সামরিক ভারসাম্যের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, পারস্য উপসাগর এবং বিশেষ করে কৌশলগত হরমুজ প্রণালি অঞ্চলের বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত ‘অপরাজেয় শক্তি’র অসার ধারণাকে মিথ্যা ও ভুল প্রমাণ করেছে। একই সাথে বহিরাগত বৈশ্বিক শক্তির ওপর নির্ভরশীল মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য সরকারগুলোর মারাত্মক দুর্বলতাও বিশ্বের কাছে উন্মোচিত হয়েছে।
প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপের ফিরিস্তি দিয়ে তিনি জানান, তৃতীয় চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধে মার্কিন আগ্রাসন ও অপরাধের জবাবে কৌশলগত হরমুজ প্রণালিতে ইরান নিজের পূর্ণ সামরিক ও ভৌগোলিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে এবং মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে অবস্থিত বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে যদি নতুন করে কোনো সামরিক আগ্রাসন চালানো হয়, তবে সার্বিক সংঘাতের ভৌগোলিক পরিধি সমগ্র অঞ্চলে আরও ভয়াবহভাবে বিস্তৃত হতে পারে বলে তিনি স্পষ্ট সতর্কবার্তা দেন।
একই সাথে ফিলিস্তিন, লেবানন, ইরাক ও ইয়েমেনসহ সমগ্র অঞ্চলে গড়ে ওঠা স্বাধীনতাকামী প্রতিরোধ আন্দোলনগুলোর অভূতপূর্ব ঐক্যবদ্ধ সামরিক কার্যক্রমকে একটি নতুন ও ন্যায়ভিত্তিক বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার অত্যন্ত আশাব্যঞ্জক সূচনা হিসেবে অভিহিত করেন খামেনি।
যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক সদিচ্ছা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে মুজতবা খামেনি বলেন, যারা ভাবেন মার্কিন প্রশাসনের আচরণ স্বতঃস্ফূর্তভাবে পরিবর্তিত হতে পারে, কিংবা ওয়াশিংটনে দলীয় ক্ষমতার পালাবদলের মাধ্যমে দেশটির মূল পররাষ্ট্রনীতিতে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে, অথবা যুক্তরাষ্ট্রকে কৌশলগত কিছু ছাড় দিয়ে তাদের আগ্রাসী শত্রুতা চিরতরে বন্ধ করা সম্ভব—তারা চরম ভুলের মধ্যে বাস করছেন।
তিনি জোর দিয়ে বলেন, মার্কিন নীতিমালার মূল ও একমাত্র গোপন লক্ষ্য হলো ইরানের সার্বভৌম জনগণকে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণে বাধ্য করা। তবে শত্রুর কাছে সামান্যতম আত্মসমর্পণমূলক মনোভাব প্রদর্শনও শহীদদের পবিত্র রক্ত ও সাধারণ মানুষের সীমাহীন আত্মত্যাগে অর্জিত দেশের ঐতিহাসিক অর্জনগুলোকে চিরতরে ধ্বংস করে দিতে পারে।
পরিশেষে দেশের সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ‘আরও শক্তিশালী ইরান’ গড়ার রণকৌশল অব্যাহত রাখার ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন ইরানের সর্বোচ্চ নেতা।
তিনি বলেন, এই দূরদর্শী লক্ষ্য অর্জনে জাতীয় রাজনৈতিক ঐক্য, সামাজিক সংহতি ও প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয়ই সাফল্যের মূল ভিত্তি। সাধারণ মানুষের প্রতি সরকারের পূর্ণ সমর্থন অব্যাহত রাখার পাশাপাশি জনগণের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন, অর্থনৈতিক স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিতকরণ এবং দেশের জাতীয় মর্যাদা ও ভৌগোলিক স্বাধীনতা রক্ষায় প্রশাসনিক ভূমিকা আরও আন্তরিক হওয়া জরুরি।
ইরানের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ রূপায়ণে দেশের উঠতি তরুণ সমাজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও স্কুলপড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রীদের অগ্রণী ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়ে মুজতবা খামেনি বলেন, যেকোনো ধরনের মানসিক হতাশা ও অসম্ভবের ধারণাকে পুরোপুরি পরাজিত করে তরুণদের মধ্যে ‘আশা ও আমরাই পারব’—এই সুদৃঢ় বিশ্বাস প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। এজন্য জ্ঞান অর্জন, তাকওয়া, প্রযুক্তিগত দক্ষতা, উচ্চ নৈতিকতা, দৃঢ় সংকল্প ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজেদের যোগ্য করে গড়ে তুলতে হবে।
বার্তার শেষাংশে তিনি সুদৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করে বলেন, মহান আল্লাহর অশেষ কৃপায় ইরানের অকুতোভয় জনগণ অত্যন্ত দ্রুত পূর্ণাঙ্গ বিজয়, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও সর্বাত্মক সার্বিক উন্নয়ন অর্জন করবে এবং অচিরেই বিশ্বমঞ্চ থেকে ‘মহাশয়তান’ যুক্তরাষ্ট্রের সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যের পতন ত্বরান্বিত হবে।

দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন