রবিবার, ১১ অক্টোবর, ২০২৬,

সালমান-আনিসুলের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে যা বললেন শহীদ শাহরিয়ারের বাবা

দিনাজপুর টিভি ডেস্ক

এপ্রিল ৫, ২০২৬, ০৬:৫৭ পিএম

সালমান-আনিসুলের বিরুদ্ধে ট্রাইব্যুনালে যা বললেন শহীদ শাহরিয়ারের বাবা

ট্রাইব্যুনালে স্বজনদের সাক্ষ্য

জুলাই গণঅভ্যুত্থানে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান ও সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের বিরুদ্ধে জবানবন্দি দিয়েছেন দুই শহীদ পরিবারের সদস্য। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ আজ ষষ্ঠ ও সপ্তম সাক্ষী হিসেবে তারা তাদের প্রিয়জন হারানোর মর্মস্পর্শী বর্ণনা তুলে ধরেন। 

ট্রাইব্যুনালের চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেলে এই সাক্ষ্য গ্রহণ সম্পন্ন হয়। সাক্ষ্য দেওয়ার সময় কান্নায় ভেঙে পড়েন শহীদদের স্বজনরা, যা আদালত কক্ষের পরিবেশকে ভারী করে তোলে।

আদালতে আজ ষষ্ঠ সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন শহীদ শেখ শাহরিয়ারের বাবা আব্দুল মতিন। তিনি বলেন, শাহরিয়ার ছিল তার একমাত্র ছেলে। মাত্র ১৮ বছর ৮ মাস বয়সে এইচএসসি পরীক্ষা চলাকালীন গত বছরের ১৮ জুলাই মিরপুর-১০ গোল চত্বরে আন্দোলনে অংশ নিয়ে সে গুলিবিদ্ধ হয়।

 আব্দুল মতিন জানান, কপালে গুলি লেগে শাহরিয়ারের মগজের ভেতরে ঢুকে গিয়েছিল। মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের আইসিইউতে রাখা হলেও চিকিৎসকরা অপারেশন করার সাহস পাননি। শেষ পর্যন্ত ২০ জুলাই দুপুরে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। আসামিপক্ষের আইনজীবীর জেরার মুখে অত্যন্ত আক্ষেপের সঙ্গে এই বাবা বলেন, তার পরিবারকে ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছে এবং এখন আর তার বেঁচে থাকার কোনো আগ্রহ নেই।

শহীদ শাহরিয়ারের বাবা তার জবানবন্দিতে অভিযোগ করেন যে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং তার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান ও আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের কুপরামর্শেই সারাদেশে প্রায় ১৪০০ আন্দোলনকারীকে হত্যা করা হয়েছে। তিনি তার একমাত্র সন্তান হত্যার সঙ্গে জড়িত সবার সর্বোচ্চ শাস্তি হিসেবে ফাঁসির দাবি জানান। আব্দুল মতিন যখন তার ছেলের গুলিবিদ্ধ হওয়া এবং হাসপাতালের করুণ পরিস্থিতির বর্ণনা দিচ্ছিলেন, তখন আদালতের উপস্থিত সবার মধ্যে বিষণ্ণতা ছড়িয়ে পড়ে।

একই দিনে সপ্তম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন শহীদ আক্তারুজ্জামানের স্ত্রী সুমি আক্তার। তিনি জানান, তার স্বামী একজন খুচরা কাপড় ব্যবসায়ী ছিলেন। গত ২৮ জুলাই আন্দোলনে অংশ নিতে বাসা থেকে বের হওয়ার পর তিনি আর ফিরে আসেননি। সন্ধ্যায় একটি অপরিচিত নম্বর থেকে ফোন পেয়ে তিনি ঢাকা মেডিকেলে গিয়ে জানতে পারেন তার স্বামী মাথায় গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা গেছেন। সেই সময়কার ভীতিকর পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, পটুয়াখালীতে গ্রামের বাড়িতে তার স্বামীর মরদেহ দাফন করা হয়েছে। সুমি আক্তার তার সাত বছরের এতিম সন্তানের ভবিষ্যতের কথা ভেবে অশ্রুসিক্ত কণ্ঠে সকল অপরাধীর দৃষ্টান্তমূলক বিচার প্রার্থনা করেন।

সুমি আক্তার তার জবানবন্দিতে আরও উল্লেখ করেন যে, ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও সংবাদের মাধ্যমে তিনি জানতে পেরেছেন যে, সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হকসহ শীর্ষ পর্যায়ের নেতাদের সুপরিকল্পিত সিদ্ধান্তেই এই হত্যাকাণ্ডগুলো ঘটানো হয়েছে। সাক্ষ্য চলাকালীন দুই সাক্ষীই শেখ হাসিনা ও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের এই অপরাধের মূল হোতা হিসেবে চিহ্নিত করেন। 

ট্রাইব্যুনালে এদিনের সাক্ষ্য গ্রহণ শেষে পরবর্তী কার্যক্রমের জন্য নতুন দিন ধার্য করা হয়েছে। জুলাই বিপ্লবের পর গঠিত এই বিশেষ আদালতে গত দেড় বছরে ধারাবাহিকভাবে অসংখ্য সাক্ষীর জবানবন্দি গ্রহণ করা হয়েছে, যার মাধ্যমে সে সময়ের নৃশংসতার চিত্র একে একে উঠে আসছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়, এই বিচার প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ন্যায়বিচার পাবে বলে আশা করছে।