অক্টোবর ২৩, ২০২৫, ০৬:০৬ পিএম
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর রাষ্ট্রের বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সংঘাত সৃষ্টি এবং সেনাবাহিনীকে বিচার প্রক্রিয়ার বিরুদ্ধে উসকে দেওয়ার মতো গুরুতর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়েছিলেন বলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে (আইসিটি) দাবি করেছেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। বৃহস্পতিবার, ২৩ অক্টোবর, ট্রাইব্যুনাল-১ এ শেখ হাসিনাসহ তিন আসামির বিরুদ্ধে দায়েরকৃত মামলার যুক্তিতর্ক উপস্থাপনের শেষ দিনে তিনি এই বিস্ফোরক অভিযোগ আনেন।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, শেখ হাসিনা ক্ষমতা হারানোর পর রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে একে অপরের বিরুদ্ধে দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছিলেন এবং বিশেষ করে সেনাবাহিনীকে বলতে চেয়েছিলেন যে, ‘তোমাদের অফিসারদের বিচার করা হচ্ছে, তোমরা কেন রুখে দাঁড়াচ্ছ না?’ তাজুল ইসলামের মতে, এর মাধ্যমে শেখ হাসিনা মূলত দেশে একটি গৃহযুদ্ধ বা ‘সিভিল ওয়ার’ পরিস্থিতি তৈরি করার অপচেষ্টা করেছিলেন।
চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম তার যুক্তিতর্কে আরও বলেন, শেখ হাসিনার এই ষড়যন্ত্র সফল হয়নি কারণ বাংলাদেশের দেশপ্রেমিক সেনাবাহিনী সেই পাতা ফাঁদে পা দেয়নি এবং দেশের জনগণও সেই উসকানিতে সাড়া দেয়নি। তিনি বলেন, যারা অপরাধী ছিল, তাদের বিচারের মুখোমুখি করার যে অঙ্গীকার অন্তর্বর্তী সরকার এবং সংশ্লিষ্টরা করেছিলেন, তারা সেই অঙ্গীকারের প্রতি দৃঢ় আছেন।
অভিযুক্তদের আদালতে নিয়ে আসা হয়েছে এবং বিচার প্রক্রিয়া অত্যন্ত মসৃণভাবে সামনের দিকে এগিয়ে চলছে। তাজুল ইসলাম বলেন, বাংলাদেশ এখন সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে এবং কোনো উসকানিতেই কেউ পা দেয়নি, যা দেশের স্থিতিশীলতার জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক। তিনি ট্রাইব্যুনালের প্রতি আহ্বান জানান যেন ষড়যন্ত্রকারী এবং মানবতাবিরোধী অপরাধের হোতাদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হয়।
এই মামলায় শেখ হাসিনার পাশাপাশি অপর দুই আসামি হলেন তার সরকারের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল এবং পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন। তবে মামলার বিচার চলাকালে সাবেক আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন নিজের দোষ স্বীকার করে আদালতের কাছে ‘অ্যাপ্রুভার’ বা রাজসাক্ষী হওয়ার আবেদন করেন এবং আদালত তা মঞ্জুর করেন। ফলে বর্তমানে মামলার প্রধান দুই আসামি হলেন শেখ হাসিনা এবং আসাদুজ্জামান খান কামাল। বৃহস্পতিবারের যুক্তিতর্কে চিফ প্রসিকিউটর এই দুই আসামির আচরণের তীব্র সমালোচনা করেন।
তাজুল ইসলাম বলেন, যারা এখানে আসামি হয়েছেন, বিশেষ করে শেখ হাসিনা এবং আসাদুজ্জামান খান, তাদের মধ্যে কৃত অপরাধের জন্য কোনো ধরনের অনুশোচনা নেই। তিনি বলেন, ‘এত বড় অপরাধ করেছেন, দুনিয়ার সবাই জানে এই অপরাধ সংঘটিত হয়েছে, তিনিও (শেখ হাসিনা) জানেন; কিন্তু কখনোই তার মধ্যে কোনো ধরনের অনুশোচনা পরিলক্ষিত হয়নি।’
চিফ প্রসিকিউটর আরও ভয়াবহ অভিযোগ এনে বলেন, অনুশোচনা তো দূরের কথা, উল্টো শেখ হাসিনা কারাগারে বসেই যারা তার বিরুদ্ধে মামলা করেছেন, যারা সাক্ষ্য দিচ্ছেন, তাদের প্রকাশ্যে হত্যা করার হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন। তিনি বলেন, শেখ হাসিনা তাদের বাড়িঘর ধ্বংস করে দেওয়ার কথা বলছেন এবং তাদের লাশগুলো বঙ্গোপসাগরে ফেলে দেওয়ার মতো ভয়ংকর হুমকি দিচ্ছেন।
চিফ প্রসিকিউটর তাজুল ইসলাম জুলাই-আগস্ট সময়ের ঘটনাবলী এবং পূর্ববর্তী শাসনামলের দমন-পীড়নের চিত্র তুলে ধরে বলেন, ‘এ রকম নিষ্ঠুর হত্যাযজ্ঞ, পুরো প্রজন্মকে হত্যা করে ফেলার চেষ্টা, পঁয়ত্রিশ হাজার মানুষকে আহত করা, বহু মানুষের অঙ্গহানি করা—এই ভয়াবহ অপরাধগুলো সংঘটিত করার পরও তার (শেখ হাসিনার) মধ্যে সামান্যতম রিমোর্স বা অনুশোচনা নেই।’ তিনি বলেন, সেই সময়ে নিহতদের মধ্যে শিশু ছিল, নারী ছিল, সাধারণ মজুর ছিল, ছাত্ররা ছিল; তাদের হত্যা করতে তার বুক এক বিন্দুও কাঁপেনি। আর আজও তার মধ্যে সেই কৃতকর্মের জন্য কোনো অনুশোচনা দেখা যাচ্ছে না।
চিফ প্রসিকিউটর ট্রাইব্যুনালের কাছে যুক্তি তুলে ধরে বলেন, এই চরম নিষ্ঠুরতা এবং অনুশোচনাহীনতার কারণেই শেখ হাসিনার সর্বোচ্চ শাস্তিটা অবশ্যই প্রাপ্য। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ট্রাইব্যুনাল সকল সাক্ষ্যপ্রমাণ এবং যুক্তিতর্ক বিবেচনা করে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করবেন এবং অপরাধীদের উপযুক্ত শাস্তি প্রদান করবেন। যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হওয়ায় এখন এই মামলার রায়ের জন্য অপেক্ষা করবে পুরো দেশ।



দিনাজপুর টিভির সর্বশেষ খবর পেতে Google News ফিডটি অনুসরণ করুন